শনিবার, ২১ মার্চ, ২০১৫

‘ফতোয়া’ নেওয়ার ব্যপারে কিছু সতর্কতা

ফতোয়া নেওয়ার ব্যপারে কিছু সতর্কতাঃ
=> ফতোয়া নিতে হয় একজন মুফতির কাছ থেকে, কোন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারের কাছ থেকে নয়।
=> ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা সাধারণ মানুষেরা ক্বুরান ও হাদীস পড়বেন, ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করবেন, এবং যতটুকু নিশ্চিতভাবে জানেন, সেটা তারা প্রচারও করতে পারবেন। কিন্তু ইজতেহাদ বা ক্বুরান ও হাদীস গবেষণা করে ফতোয়া দেওয়ার যোগ্যতা ও এখতিয়ার শুধুমাত্র মুজতাহিদ আলেমগণের।  
=> কোন একজন মুজতাহিদ যদি ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হন, কোন সমস্যা নেই তিনিও ফতোয়া দেওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। বিংশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ ও হাদীস শাস্ত্রের ইমাম, মুহাম্মাদ নাসির উদ্দিন আলবানী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) দ্বীনি জ্ঞান প্রচার করার পাশাপাশি ঘড়ি মেরামত করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তবুও তিনি আরব-অনারব সবার কাছে শীর্ষস্থানীয় আলেম হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন, দ্বীনি বিষয়ে তাঁর পাহাড় সমান জ্ঞানের কারণে। ফতোয়া দেওয়ার শর্ত হচ্ছে কারো মাঝে ইজতেহাদ করার মতো যথেষ্ঠ জ্ঞান বিদ্যমান থাকা। একজন ডাক্তার মুখস্থ বিদ্যায় যতই পারদর্শী হন না কেনো, ইঞ্জিনিয়ার সাহেব যতই সুন্দর বিমানের নকশা বানান কেন, একজন তর্কবাগিশ যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনে যতই দক্ষ হয়ে থাকুন না কেনো, ফতোয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে এইগুলো কোন বিশেষত্ব বলে বিবেচিত হয়না।
=> বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এমন কিছু বড় আলেমদের নাম, যারা ইতিমধ্যেই আমাদেরকে থেকে বিদায় নিয়েছেনঃ
. ইমাম আব্দুল আজিজ বিন বাজ রহঃ, আকীদা ও ফিকহের ব্যপারে শীর্ষস্থানীয় আলেম (সৌদি আরাবিয়া)।
. ইমাম মুহাম্মাদ নাসির উদ্দিন আল-আলবানী রহঃ, আকীদা ও মানহাজ, হাদীস, জারহ ওয়া তাদীল শাস্ত্রের যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম (আলবেনিয়া)।
. ইমাম আব্দুর রহমান মুবারকপুরী রহঃ, প্রখ্যাত মুহাদ্দিস (ভারত)।
. ইমাম মুহাম্মদ আমি আল-শানকিতি রহঃ, স্বনামধন্য মুফাসসির (মৌরিতানিয়া)।
=> বর্তমানে বয়স ও জ্ঞানের থেকে এগিয়ে, এমন জীবিত বড় ওলামাদের মাঝে রয়েছেনঃ
১. শায়খ সালেহ আল-ফাওজান হাফিজাহুল্লাহ (সৌদি আরাবিয়া)।
২. শায়খ সালেহ বিন আব্দুল আজীজ আলে-শায়খ হাফিজাহুল্লাহ (সৌদি আরাবিয়া)।
৩. শায়খ আব্দুল মুহসিন আল-আব্বাদ হাফিজাহুল্লাহ (মদীনা)।
৪. শায়খ উয়াসী উল্লাহ আব্বাস হা'ফিজাহুল্লাহ (ভারত, বর্তমানে মক্কায় অবস্থানরত)।
=> উল্লেখ্যঃ আমাদের দেশে সর্ব বিষয়ে ইজতেহাদ করার যোগ্যতা রাখেন, এমন মানের কোন বড় আলেম নেই, না হানাফী, না আহলে হাদীস সম্প্রদায়ের মাঝে। তবে দ্বীনি জ্ঞান চর্চায় আমাদের পার্শবর্তী দেশ ভারত ও পাকিস্থান এগিয়ে থাকায় সেখানে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এর অনুসারী কিছু বড় আলেম রয়েছেন।

=> ইংরেজী ভাষাভাষী বিদেশী সেলেব্রিটি স্পিকার বা বক্তা যাদেরকে বলা হচ্ছে, এরা এই সমস্ত আলেমদের ছাত্র হওয়ার মতো যোগ্যতা আছে কিনা সন্দেহ, যদিও লোকে তাদেরকে যত বড় আলেমই মনে করে থাকুক না কেনো। 

ওযু ছাড়া ক্বুরানুল কারীম স্পর্শ করা যাবে?

প্রশ্নঃ ওযু ছাড়া ক্বুরানুল কারীম স্পর্শ করা যাবে?
উত্তরঃ না, ওযু ছাড়া ক্বুরানুল কারীম স্পর্শ করা যাবেনা, কারণ রাসুল সাঃ এই কাজটা করতে নিষেধ করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,
পবিত্রতা ছাড়া কেউ কুরআন স্পর্শ করবেনা।
সুনানে দারেমীঃ ২১৬৬, শায়খ বিন বাজ, শায়খ উসাইমিনের মতে হাদীসটির সনদ জাইয়্যিদ (অর্থাৎ, সহীহ)।
একারণে, ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমাদ - তাঁদের সকলের মাযহাব অনুযায়ী ওযু ছাড়া ক্বুরান স্পর্শ করা জায়েজ নয়। এছাড়া, আধুনিক যুগের আলেমদের মাঝে শায়খ বিন বাজ ও শায়খ ইবনে উসাইমিন ২ জনেই পূর্ববর্তী আলেমদের সাথে একমত হয়েছেন। তবে কারো উপর গোসল ফরয নাহলে সে ওযু ছাড়া স্পর্শ না করে শুধু দেখে বা মুখস্থ ক্বুরান তেলাওয়াত করতে পারবে।
তবে লক্ষ্য করুন, ওযু ছাড়া ক্বুরান স্পর্শ করা নিষেধ শুধুমাত্র যেটাতে আরবী ক্বুরানের আয়াত আছে সেটা। ওযু ছাড়া হাদীস, তাফসির বা অন্যান্য দ্বীনি যেকোন বই পুস্তক স্পর্শ করা এবং পড়া যাবে। এর কারণ হচ্ছে, বাংলা বা ইংরেজী অনুবাদ ক্বুরান নয় এটা ক্বুরানের আয়াতের অর্থ, যার মর্যাদা ক্বুরানের সমান হয়। এই মর্যাদার পার্থক্য সহজেই বুঝবেন, আরবী ক্বুরান আল্লাহর কথা, এতে বিন্দু পরিমান ভুল নেই। আর অনুবাদ মানুষের কাজ, আর মানুষের কাজের মাঝে ভুল থাকবেই, থাকতে বাধ্য। এইজন্য ক্বুরানের আয়াতের সাথে অন্য কিছু থাকলে তাঁর মর্যাদা আর ক্বুরানের মর্যাদা এক নয়।
ওযু ছাড়া শুধু কুরআনের অনুবাদ বা ইমাম মালেকের মতে যেখানে ৫০% এর বেশি আরবী কুরানের আয়াত ছাড়া অন্য কোনো কিছু থাকে (যেমন - তর্জমা, তাফসীর হাদীস বা অনুবাদ) সেটাও ওযু ছাড়াই স্পর্শ করা যাবে।

বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন ফাতওয়া আরকানুল ইসলাম এর পবিত্রতা অধ্যায়, শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমিন (রহঃ)।

শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০১৫

কোন সময় কাফেররাও কামনা করবে যে

ক্বুরানুল কারিমের দুইটি আয়াতের তেলাওয়াত আমি যতবারই শুনি, আয়াতের অর্থের দিকে লক্ষ্য করলে প্রত্যেকবার আমার গা শিউরে উঠে। আয়াতগুলো হচ্ছে,

رُّبَمَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُواْ لَوْ كَانُواْ مُسْلِمِينَ
ذَرْهُمْ يَأْكُلُواْ وَيَتَمَتَّعُواْ وَيُلْهِهِمُ الأَمَلُ فَسَوْفَ يَعْلَمُونَ    

অর্থঃ কোন সময় কাফেররাও কামনা করবে যে, কি চমৎকার হত, যদি তারা মুসলমান হত! আপনি  তাদেরকে ছেড়ে দিন, তারা পানাহার ও ভোগ-বিলাস মত্ত থাকুক এবং আশা তাদেরকে গাফেল করে রাখুক, আর অচিরেই তারা জানতে পারবে। [সূরা আল-হিজরঃ ২-৩]

গা শিউরে উঠে এই কথা ভেবে, আমরা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারিনা, আমাদের শেষ পরিণতি কেমন হবে? [তবে অবশ্যই আল্লাহর কাছে ভালো অবস্থায় মৃত্যুর জন্য আশা রেখে দুয়া করতে হবে] যাই হোক, একটা আশ্চর্যজনক ঘটনা শুনুন, কিভাবে একজন মুজাহিদ ঈমানহারা হয়েছিলোঃ

হাফেজ ইবনে কাসির রহ. ইমাম জাউজির বরাত দিয়ে বলেন, আবদাহ বিন আব্দুর রহিম নামে এক মুজাহিদ ২৭৮ হিজরি সনে মারা যায়। যার সম্পর্কে শ্রুতি রয়েছে যে, সে অধিকাংশ সময় ইউরোপের বিরুদ্ধে জেহাদে ব্যস্ত থাকত। একবারের ঘটনা, মুজাহিদগণ ইউরোপের একটি দেশ ঘেরাও করে রেখে ছিল, দূর্গের ভেতর অবস্থানকারী এক নারীর প্রতি তার দৃষ্টি পড়ল, আর এতেই সে তার প্রেমে পড়ে যায়। আরম্ভ হল চিঠির আদান-প্রদান, সে তাকে লিখল আমি তোমাকে কীভাবে পেতে পারি? সে বলল, তুমি খৃষ্টান হও আর দেয়াল টপকে আমার কাছে চলে এসো, সে তাতে সাড়া দিল। বিষয়টি মুসলমানদের খুব ভাবিয়ে তুলল, বরং, আতঙ্কিত করল। সকলেই মর্মাহত হল, অনেক আফসোস করল, কঠিন মনে হল তাদের কাছে তার ঘটনাটি। কয়েক বৎসর পর তার সাথে একদল মুজাহিদের সাক্ষাত। তারা দেখতে পেল, তখনও সে ঐ মহিলার সাথে সংসার করছে, তারা জিজ্ঞেস করল, কি ব্যাপার? কোথায় গেল তোমার কুরআন? আর তোমার আমল, রোজা, জেহাদ ও নামাজের খবর কি? সে বলল, আমি পূর্ণ কুরআন ভুলে গেছি, শুধু একটি আয়াত আমার মনে আছে,

কোন সময় কাফেররাও কামনা করবে যে, কি চমৎকার হত, যদি তারা মুসলমান হত! আপনি  তাদেরকে ছেড়ে দিন, তারা পানাহার ও ভোগ-বিলাস মত্ত থাকুক এবং আশা তাদেরকে গাফেল করে রাখুক, আর অচিরেই তারা জানতে পারবে। [সূরা আল-হিজরঃ ২-৩]

সে আরো জানাল, এখন তো আমার তাদের মধ্যে অনেক সন্তান ও সম্পদ হয়েছে।

আল-বিদায়াঃ ১১/৬৪।

সুন্নত ও বেদাত কি?

সুন্নত ও বেদাত কি?
সুন্নত কি?
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) "ইবাদত" হিসেবে যা করেছেন, আমাদেরকে করতে বলছেন অথবা সাহাবারা তাঁর সামনে করেছেন আর তিনি চুপ থেকে মৌন সম্মতি দিয়েছেন এই সবগুলো সমষ্টির নাম হচ্ছে সুন্নত বা নবীর আদর্শ।
সুন্নতে দলীল খুঁজে পাওয়া যায়না, অর্থাৎ নবীর তরীকা ছাড়া কোনো ইবাদত করা সম্পূর্ণ হারাম, আল্লাহ তাআ'লা সেটাকে ইবাদত হিসেবে কবুল করেন না। এমন কাজগুলোকে বেদাত বলা হয়।
বেদাত কি?
বেদাত হচ্ছেন এমন কোনো কাজ বা আমল যা মানুষ সওয়াব লাভের জন্য করে থাকে, কিন্তু এই কাজ না রাসুলুল্লাহ (সাঃ) করেছেন, না করতে বলেছেন না সাহাবারা তাঁর সামনে করেছেন আর তিনি চুপ থেকে মৌন সম্মতি দিয়েছেন।
বেদাত হচ্ছে মানুষের বানানো ভুয়া ইবাদত। আসলে এইগুলো ইবাদত নয়, এইগুলো করলে কোনো সওয়াব পাওয়া যায়না - বরং নবীর তরীকা না মানার কারণে এর উপরে আমল করা কবীরা গুনাহ। কিন্তু আফসোসের বিষয় - এইকাজগুলো যারা করে তারা এটাকে নেকীর কাজ মনে করে। এই কাজ করলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন - অথচ অজ্ঞ লোকেরা মনে করে এইকাজগুলো করে জান্নাতে যাবে (নাউযুবিল্লাহ)।

admin : আনসারুস সুন্নাহ

মুনাজাতের জন্য জরুরী আরবী দুয়া সমূহ

মুনাজাতের জন্য জরুরী আরবী দুয়া সমূহ
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য। আল্লাহ দরূদ ও সালাম পেশ করুন আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর; আর তাঁর বংশধর, তাঁর সাহাবীগণ এবং কিয়ামত পর্যন্ত যারা সুন্দরভাবে তাঁদের অনুসরণ করবে তাদের উপর (আমিন)
দুয়া মানেই যে ওযু করে নামায পড়ে দুই হাত তুলে চাইতে হবে, এমন কোনো কথা নেই হ্যা, দুই হাত তুলে দুয়া করা ভালো। তবে আপনি যেকোনো সময় ওঠতে বসতে, কোথাও যেতে যেতে দুয়া করতে পারেন। এইভাবে দুয়া ও যিকিরের মাধ্যমে আমাদের অবসর সময়গুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ আমাদের তোওফিক দান করুন, আমিন।
নিচের এই দুয়াগুলো হাত তুলে বা হাত না তুলে, যেকোন মুনাজাতে, ফরয, সুন্নত বা নফল যেকোন নামাযের যেকোন সিজদাতে, নামাযে আত্তাহিয়্যাতু ও দুরুদ পড়ার পরে সালাম ফেরানোর আগে দুয়া মাসুরা হিসেবে, যেকোনো সময়েই পড়া যাবে। দুয়াগুলো ফরয নামাযের ভেতরে আরবীতে পড়তে হবে, আরবীতে না পারলে নফল-সুন্নত নামাযের সিজদাতে, সালাম ফেরানোর পূর্বে বা নামাযের বাইরে আরবী বা বাংলা, যেকোন ভাষাতেই দুয়াগুলো পড়া যাবে।
দিনে রাতে যে কোনো সময় আমল করার জন্য হিসনুল মুসলিম বইয়ের সবগুলো দুয়াই সহীহ, আর দাম মাত্র ৫০ টাকা। ছোট্ট এই বইটা পকেটে রেখে দেওয়া যায়, রাস্তায়, জার্নিতে, বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষায় বা যে কোনো অবসব সময়ে বের করে দুয়াগুলো শিখে বা পড়ে সময়টা নষ্ট না করে কাজে লাগানোর জন্য। 
বিঃদ্রঃ যারা অলসতা বশত বা ইমানের দুর্বলতার কারণে আরবী মুখস্থ করতে চান না বা পারেন না, তারা অন্তত বাংলাটা মুখস্থ করে রাখতে পারেন এবং মুনাজাতের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো গুরুত্বপূর্ণ এই জিনিসগুলো আল্লাহর কাছে চাইতে পারেন




. সবচাইতে কম কথায় সবচাইতে বেশি কল্যান প্রার্থনা করার দুয়াঃ
এই দুয়াটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব বেশি বেশি করতেন।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অধিকাংশ দোআ হতঃ
رَبَّنَا اٰتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الْاٰخِرَةِ حَسَـنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণঃ রব্বানা আ-তিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাওঁ-ওয়াফিল আ-খিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়া-ক্বিনা আযাবান্নার।
অর্থঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়ার জীবনে কল্যাণ দান করো এবং পরকালে জীবনেও কল্যাণ দান করো। আর তুমি আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে বাঁচাও। সুরা আল-বাক্বারাহঃ ২০১।
কেউ যদি অন্য কোন দুয়া না জানেন আর যেকোন কল্যানের জন্য দুয়া করতে চান, অন্তরে সেই জিনিস পাওয়ার জন্য নিয়ত রেখে এই দুয়া পড়লেও হবে।

. পাপ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য দুয়াঃ
আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ) ও মা হাওয়্যা (আঃ) আল্লাহর নিষেধ অমান্য করলে ক্ষমা প্রার্থনা ও তোওবা করার জন্য স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাদের দুইজনকে এই দুয়াটি শিখিয়ে দিয়েছিলেন। এই দুয়ার মাধ্যমে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। আমাদের উচিত তাদের মতো আমাদের পাপ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য নিয়মিত এই দুয়া বেশি করা।
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
উচ্চারণঃ রাব্বানা যোয়ালামনা আং-ফুসানা ওয়া-ইল্লাম তাগ-ফিরলানা, ওয়াতার্ হানা লানা কুনান্না মিনাল খাসিরিন
র্থঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছি, অতএব আপনি যদি আমদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন তাহলে নিশ্চয়ই আমরা ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত হব। সুরা আল-রাফঃ ২৩
. পিতা-মাতার জন্য দুয়াঃ
জীবিত বা মৃত পিতা মাতা দুইজনের জন্য এই দুয়া বেশি করতে হবেঃ
رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
উচ্চারণঃ রাব্বির হাম-হুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগিরা।
অর্থঃ হে আমাদের পালনর্তা! আপনি আমার পিতা-মাতার প্রতি তেমনি দয়া করুন যেইরকম দয়া তারা আমাকে শিশু অবস্থায় করেছিল।
মৃত মানুষ জীবিত মানুষের দুয়া দ্বারা উপকৃত হয়, তাই পিতা-মাতার জন্য এই দুয়া করে তাদের উপকার করা সম্ভব। সেইজন্য দুয়া কবুলের সময়গুলোতে যেমন সিজদার সময় এই দুয়া বেশি পড়া উচিত।
. ছোট্ট কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা দুয়াঃ
আল্লাহ যখন কারো ভালো করতে চান তখন তাকে অনেক টাকা পয়সা, ভালো স্বামী বা স্ত্রী, দামী গাড়ি দেননা। যদিও আমরা এইগুলোকেই কল্যানের বিষয় বলে মনে করি। পার্থিব সুখ স্বাচ্ছন্দ কখনো আল্লার নেয়ামত হতে পারে, কখনোবা সেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন পরীক্ষা হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ যখন কারো কল্যান করতে চান, তখন তাকে ফিকহ বা দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন। আর সেই জ্ঞান চাওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শেখানো সুন্দর ছোট্ট একটা দুয়া আছে, আপনারা মুখস্থ করে নিতে পারেন।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْماً نافِعاً، وَرِزْقاً طَيِّباً، وَعَمَلاً مُتَقَبَّلاً
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আস-আলুকা ইলমান নাফিআ, ওয়া রিযক্বান ত্বাইয়্যিবান, ওয়া আমালাম মুতাক্বাববালান। 
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট উপকারী জ্ঞান, পবিত্র জীবিকা ও গ্রহণযোগ্য আমল প্রার্থনা করছি। ইবনে মাজাহ, হিসনুল মুসলিম পৃষ্ঠা ১১৩। 
এই দুয়াটা আমার প্রিয় কারণ, এর সাথে আরো দুইটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চাওয়া হয়েছে রিযকান ত্বাইয়্যিবান বা পবিত্র জীবিকা এর দ্বারা দুনিয়াবি চাহিদার পূরণের জন্যও দুয়া করা হলো আর, মালান মুতাক্বাব্বালান বা এমন আমল যা আল্লাহর কাছে কবুল হয়, পরকালের জন্য যা প্রয়োজন তাও প্রার্থনা করা হলো। এতো গুরুত্বপূর্ণ তিনটা বিষয় একসাথে ছোট্ট একটা দুয়ার মধ্যে থাকায় আমাদের সবার শিখে নেওয়া উচিত। এই দুয়া প্রত্যেকদিন ফযরের ফরয নামাযের সালাম ফেরানোর পর একবার পড়া সুন্নত। এছাড়া সিজদাতে, সালাম ফিরানোর আগেসহ যেকোনো সময় করা যাবে। আরবীতে না পারলে বাংলাতেও করা যাবে, যতদিন না মুখস্থ হচ্ছে। দুয়াটা পাওয়া যাবে হিসনুল মুসলিম বইয়ের ১১৩ নাম্বার পৃষ্ঠায়।
. দুই সিজদার মাঝখানে বসা অবস্থায় দুয়াঃ
এখানে নিজের পছন্দমতো যেকোনো দুয়া করা যায়না, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেই দুয়াগুলো করেছেন শুধুমাত্র সেই দুয়াগুলোই করা যাবে। আর এইখানে দুয়া আরবীতেই করতে হবে। দুই সিজদার মাঝখানে এই দুয়াগুলো করার সময় তাশাহুদের মতো আংগুন দিয়ে ইশারা করা সুন্নত। যেই দুয়া করতে হবেঃ
ছোট্ট এই দুয়াটা কি মুখস্থ করা যায়না? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরয, সুন্নত, নফল যে কোনো সালাতের দুই সিজদার মাঝখানে বসা অবস্থায় এই দুআটি করতেনঃ
رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي
উচ্চারণঃ রাব্বিগ ফিরলি, রাব্বিগ ফিরলি। অর্থঃ হে আমার রব আমাকে ক্ষমা করা, হে আমার রব আমাকে ক্ষমা কর। আবু দাউদ ১/৩১, ইবনে মাজাহ, দুয়াটা সহীহ।
এই ছোট্ট দুয়াটা পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ মিস করা ঠিকনা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিনে ৭০ থেকে ১০০ বার তোওবা করতেন। আপনি যদি সালাতের দুই সিজদার মাঝখানে এই দুয়াটা পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলেন তাহলে দিনে যত রাকাত করে সালাত পড়বেন, তত বারই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া হবে। আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার একটা উপায় হচ্ছে বেশি বেশি করে নিয়মিত তোওবা ও ইস্তিগফার করা (ক্ষমা চাওয়ার দুয়া করা)। এছাড়া দুই সিজদার মাঝখানে আরেকটা ছোট্ট সুন্দর দুয়াঃ
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَارْحَمْنِي، وَاهْدِنِي، وَاجْبُرْنِي، وَعَافِنِي، وَارْزُقْنِي، وَارْفَعْنِي
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মাগফিরলী, ওয়ারহামনী, ওয়াহদিনী, ওয়াজবুরনী, ওয়াআফিনি, ওয়ারযুক্বনী, ওয়ারফানী।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন, আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন, আমার সমস্ত ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে দিন, আমাকে নিরাপত্তা দান করুন, আমাকে রিযিক দান করুন এবং আমার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন
হাদীসটি ইমাম নাসাঈ ব্যতীত সুনান গ্রন্থগারগণ সবাই সংকলন করেছেন। আবূ দাউদঃ ৮৫০, তিরমিযীঃ ২৮৪, ২৮৫, ইবন মাজাহঃ ৮৯৮। শায়খ আলবানির মতে হাদীস সহীহ।
বিঃদ্রঃ এই দুয়াটা কম-বেশি বিভিন্ন ভাবে বর্ণনা আছে, সবগুলো সহীহ তবে এখানে যেটা দেওয়া আছে এটা সবচাইতে বড় যেখানে সবগুলো দুয়া একসাথে আছে। এটা করলে সবগুলো দুয়াই করা হলো। 
. যারা অবিবাহিত তারা নেককার স্বামী/স্ত্রী ও সন্তান পাওয়ার জন্য বা যারা বিবাহিত তাদের স্বামী/স্ত্রী ও সন্তান ধার্মিক হওয়ার জন্য দুয়াঃ

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
উচ্চারণঃ রব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা ক্বুররাতা আইয়ুন, ওয়াজআলনা মুত্তাক্বীনা ইমামা।
অর্থঃ হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে চোখের শীতলতা দান কর এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্যে আদর্শস্বরূপ কর। সুরা আল-ফুরক্বানঃ ৭৪।

. আল্লাহর যিকর, শুকিরিয়া ও সুন্দরভাবে তাঁর ইবাদত করার জন্য সাহায্য চাওয়ার দুয়াঃ
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ، وَشُكْرِكَ، وَحُسْنِ عِبادَتِكَ
উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা আ ইন্নী আলা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ইবাদাতিকা
অর্থঃ হে আল্লাহ! তুমি আমাকে তোমার স্মরণ, তোমার কৃতজ্ঞতা এবং তোমার সুন্দর ইবাদত করার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য কর
এই দুয়া ইচ্ছা করলে নামাযের ভেতরে সিজদাতে বা সালাম ফেরানোর আগে দুয়া মাসুরার সময়ও করা যায়। এই দুয়াটা এতো গুরুত্বপূর্ণ যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এক সাহাবীকে এই দুয়া পড়ার জন্য বিশেষভাবে ওয়াসীয়ত করে যান। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মুয়ায বিন জাবাল (রাঃ) এর হাত ধরে বলেছিলেনঃ ‘‘হে মুয়াজ! আল্লাহর কসম আমি তোমাকে ভালোবাসি। অতঃপর তিনি বললেন, হে মুয়াজ! আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে তুমি প্রত্যেক সালাতের পর এই দুয়া করা ত্যাগ করবেনা, আল্লাহুম্মা আ ইন্নী আলা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ইবাদাতিকা।  আবু দাউদ ১/২১৩, নাসায়ী, ইবেন হিব্বান, হাদীস সহীহ।

. ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যেকোনো শিরক থেকে বাঁচার দুয়াঃ
কেউ ৪০ বছর আল্লাহর ইবাদত করলো, কত যে নফল সুন্নত নামায পড়লো, রোযা রাখলো, কিন্তু মরণের আগে শিরক করে তোওবা না করেই মারা গেলো. . .একটা মাত্র শিরক তার সমস্ত আমল নষ্ট করে দেবে (নাউযুবিল্লাহ)!
কেয়ামতের দিন তার আমলগুলোর কোনো ওযন আল্লাহ তাকে দেবেন না, এইগুলোকে ধূলো বালিতে রূপান্তরিত করে দেবেন আর জেনে হোক বা না জেনেই হোক যেকেউ, যেকোনো সময় শিরকে লিপ্ত হতে পারে, যে যত বড় নেককারই হোক না কেনো (মা যা' আল্লাহ)
এইজন্য শিরক করা অথবা অনিচ্ছায় শিরকে লিপ্ত হওয়া থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) শেখানো একটা দুয়া আছে, কেউ যদি প্রতিদিন সকাল বিকাল একবার করে পড়েন, তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ তাকে শিরক থেকে হেফাজত করবেন। আপনি কি জানেন, সেই দুয়াটা কি? দুয়াটা হচ্ছেঃ
اللَّهُمَّ  إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لاَ أَعْلَمُ
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আউযুবিকা আন উশরিকা বিকা ওয়া আনা আলাম, ওয়া আস-তাগফিরুকা লিমা লালাম
অনুবাদঃ হে আল্লাহ! আমার জানা অবস্থায় তোমার সাথে শিরক করা থেকে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি আর আমার অজানা অবস্থায় কোনো শিরক হয়ে গেলে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
আহমাদ ৪/৪০৩, হাদীসটি সহীহ, সহীহ আল-জামে ৩/২৩৩। হিসনুল মুসলিমঃ পৃষ্ঠা ২৪৬।
. বিপদ বা দুঃশ্চিন্তার জন্য এই দুয়াটা সবাই মুখস্থ করে নিনঃ
তিমি মাছের পেটে থাকা অবস্থায় ইউনুস (আঃ) এই দোয়া করেছিলেন এবং কঠিন বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন।
لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظّالِمِينَ
উচ্চারণঃ লা ইলা-হা ইল্লা-আনতা, সুবহা-নাকা ইন্নি কুনতু মিনায-যোয়ালিমিন।
অর্থঃ (হে আল্লাহ) তুমি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নাই, তুমি পবিত্র ও মহান! নিশ্চয় আমি জালেমদের অন্তর্ভুক্ত।
কুরানুল কারীমে এই দুয়া বর্ণিত হয়েছে সুরা আল-আম্বিয়া: আয়াত নাম্বার ৮৭ তে।
এই দুয়ার উপকারীতাঃ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, কোনো মুসলিম যদি এই দুয়া পড়ে, তার দুয়া কবুল করা হবে। অন্য হাদীস অনুযায়ী, এই দুয়া পড়লে আল্লাহ তার দুঃশ্চিন্তা দূর করে দিবেন। সুনানে আত-তিরমিযী।
দুয়া কিভাবে পড়তে হবেঃ বিপদ আপদ বা দুঃশ্চিন্তার সময় এই দুয়া বেশি বেশি করে পড়তে হয়। যতবার ইচ্ছা ও যতবার সম্ভব হয় ততবার পড়বেন। এক লক্ষ পঁচিশ হাজার পড়ে যে খতম ইউনুস পড়ানো হয় হুজুর বা মাদ্রাসা ছাত্রদেরকে টাকা দিয়ে ভাড়া করে, বা দুয়া কেনাবেচা করা হয় এইগুলো বেদাত এই রকম খতম করানোর কোনো দলীল নেই শরীয়তে। আপনার যতবার সম্ভব হয় ততবার পড়বেন এত এত বার পড়তে হবে, এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। আপনি নিজের জন্য নিজে দুয়া করবেন - আল্লাহর কাছে সেটাই বেশি পছন্দনীয়। সর্বোত্তম হচ্ছে ফরয/নফল/সুন্নত যেকোনো নামাযের সিজদাতে এই দুয়া পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর অতুলনীয় রহমতের ছায়ার মধ্যে আশ্রয় দিন, আমীন।
১০. হেদায়েতের উপর থাকা, অন্তর যেন দ্বীনের উপরে থাকে তার জন্য দুয়াঃ
আরবীতে হৃদয়কে বলা হয় ক্বালব, যার একটা অর্থ হচ্ছে - যেই জিনিস খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যায় অর্থাৎ, মানুষের হৃদয় খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যায়, একারণে মানুষ আজকে যাকে ভালোবাসে, কাল তাকে ঘৃণা করে কেয়ামতের আগে এমন হবে মানুষ সকালে ঈমানদার থাকবে, সন্ধ্যা সময় কাফের হয়ে যাবে আবার মানুষ সন্ধ্যা সময় ঈমানদার থাকবে, সকালে কাফের হয়ে যাবে এইজন্য হৃদয় যাতে পরিবর্তন না হয়ে যায়, পাপাচার, কুফুরী, আল্লাহর নাফরমানির দিকে ঝুকে না পড়ে সেই জন্য আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেশি বেশি করে এই দুয়া করতেনঃ
উচ্চারণঃ ইয়া মুক্বাল্লিবাল ক্বুলুব! সাব্বিত ক্বালবী আলা দ্বীনিক
অর্থঃ হে হৃদয় সমূহের পরিবর্তন করার মালিক! আমার হৃদয়কে তোমার দ্বীনের উপর অবিচলভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখো সুনানে তিরমিযী
১১. জান্নাত প্রার্থনা করা ও জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়ার দুয়াঃ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আউযু বিকা মিনান্নার।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জান্নাত চাই এবং জাহান্নাম থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ৩ বার জান্নাত প্রার্থনা করে, জান্নাত আল্লাহর কাছে দুয়া করে, হে আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করো। যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ৩ বার জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে, জাহান্নাম আল্লাহর কাছে দুয়া করে, হে আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দাও
তিরমিযিঃ ২৫৭২, ইবনে মাজাহ ৪৩৪০, শায়খ আলবানি এই হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, সহীহুল জামি ৬২৭৫।
উল্লেখ্য, সকাল সন্ধ্যায় ৭ বার আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান্নার পড়ার হাদীসটা জয়ীফ বা দুর্বল, শায়খ আলবানী সিলসিলা জয়ীফাহঃ ১৬২৪। 
সুতরাং সেটা না পড়ে এই দুয়া পড়বেন, কারণ এটাতে জান্নাত চাওয়া ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাওয়া দুইটা দোয়া আছে আর এটা সহীহ। ঐটা থেকে এইদুয়াটা ভালো ও সহীহ।  
১২. কেয়ামতের দিন হিসাব সহজ করার জন্য দুয়াঃ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেকের হিসাব নেওয়া হবে আর আল্লাহ যার হিসাব নেবেন তাকে শাস্তি দেবেন। এই কথা শুনে সাহাবীরা ভয় পেলো, কারণ কে এমন আছে যে নিষ্পাপ? সুতরাং সকলেই শাস্তি পাবে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, মুমিনদের জন্য হিসাব সহজ করা হবে। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর ঈমানদার বান্দাদেরকে রহমতের চাদরে ঢেকে নেবেন, অন্যদের থেকে আলাদা করে দেবেন। এরপরে গোপনে তাকে তার পাপকাজগুলো দেখানো হবে। বান্দা তার পাপকাজগুলো দেখে ভয় পেয়ে যাবে, আর চিন্তা করতে থাকবে তাহলেতো আমার বাঁচার কোনো পথ নাই! তখন আল্লাহ তাকে বলবেন তুমি পাপ করেছো কিন্তু অমুক সময় তোওবা করেছো আর আমি তোমার তোওবা কবুল করেছি। আর শুধু কবুলই করিনাই তোওবা করেছো এইজন্য পাপ কাজগুলোকে এখন নেকীতে পরিবর্তন করে দিলাম। এইকথা শুনে বান্দা খুব খুশি হয়ে বলবে, হে আল্লাহ আমারতো আরো অনেক পাপ আছে সেইগুলোতো দেখতে পাচ্ছিনা (পাপের পরিবর্তে নেকী পাওয়ার আশায় সে এই কথা বলবে)।
এর পরে বান্দাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে। এই হচ্ছে হিসাব সহজ করার পদ্ধতি। এরকম যেন হিসাব গ্রহণ সহজ করা হয়, এই জন্য এই দুয়া করতে হয়ঃ
উচ্চারণঃ আল্লাহুম্ম হাসিবনি হিসাবাই-য়্যাসিরা। অর্থঃ হে আল্লাহ তুমি আমার হিসাব সহজ করো।
ইমাম হাকিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, শায়খ আলবানীর মতে দুয়াটি হাসান সহীহ।
১৩. গুনাহ মাফ করার ও নেককার ঈমানদার হিসেবে মৃত্যুর জন্য দুয়াঃ
رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ
উচ্চারণঃ রাব্বানা ফাগফির লানা যুনুবানা ওয়া-কাফফির আন্না সাইয়্যিআ-তিনা ওয়া তাওয়াফ্ফানা মাআল আবরা-
অর্থঃ হে আমাদের পালনর্তা! আপনি আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন, আমাদের মন্দ কাজগুলো দূর করে দিন আর আমাদেরকে নেককার হিসেবে মৃত্যু দান করুন। সুরা আলে ইমরানঃ ১৯৩
১৪. রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সুন্দর একটি দুয়াঃ
মুখস্ত করে নিতে পারেন ও মুনাজাতে বেশি বেশি করে আর বিশেষ করে সিজদাতে বা সালাম ফেরানোর পূর্বে এই দুয়া করতে পারেন।
اَللهم إِنِّي أَسْأَلُكَ الهُدَى، وَالتُّقَى، وَالعَفَافَ، وَالغِنَى
আল্লা-হুম্মা ইন্নি আস-আলুকাল হুদা ওয়াত-তুকা ওয়াল আ'ফাফা ওয়াল গিনা।
অর্থ: হে আল্লাহ আমি তোমার কাছে হেদায়েত, তাকওয়া, সুস্থতা ও সম্পদ প্রার্থনা করছি।
মুসলিম ২৭২১, তিরমিযী ৩৪৮৯, ইবনু মাজাহ ৩৮৩২, আহমাদ ৩৬৮৪
১৫. দুঃখ ও দুশ্চিন্তার সময় পড়ার দো
এই দুয়াটা প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় অন্তত একবার পড়া সুন্নত।
يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغيثُ أَصْلِحْ لِي شَأْنِيَ كُلَّهُ وَلاَ تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ
উচ্চারণঃ ইয়া হাইয়্যু ইয়া ক্বাইয়্যূম বিরহ্‌মাতিকা আস্তাগীস, আসলিহ্‌-লী শানী কুল্লাহু, ওয়ালা তাকিলনী ইলা নাফসী ত্বারফাতা আইন।  
অর্থঃ হে চিরঞ্জীব, হে চিরস্থায়ী! তোমরা রহমতের জন্য তোমার দরবারে জানাই আমার সকাতর নিবেদন, তোমার রহমতের অসীলায় তোমার কাছে (বিপদ, দুশ্চিন্তা থেকে) উদ্ধার কামনা করি। তুমি আমার অবস্থা সংশোধন করে দাও, আর তুমি চোখের পলক পরিমান সময়ের (এক মুহূর্তের) জন্যেও আমাকে আমার নিজের উপর ছেড়ে দিওনা।
হাকেম ১/৫৪৫, তিনি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, আর যাহাবী তা সমর্থন করেছেন, সহীহ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব ১/২৭৩।
১৬. দুঃখ ও দুশ্চিন্তার, দারিদ্রতা ও ঋণগ্রস্থ হওয়া থেকে মুক্তির জন্য দুয়াঃ
যারা স্বচ্ছল অবস্থায় শান্তিতে আছেন, তারা যেনো কঠিন পেরেশানি, বড় বিপদ, বড় ঋণের বোঝা, মানুষের, অলসতা, অক্ষমতা, কাপুরুষতার স্বীকার না হন, সেই জন্য নিয়মিত এই দুয়া পড়া উচিৎ। আর যারা এইগুলোর স্বীকার হয়েছেন তারাও নিয়মিত এই দুয়া পড়ে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবেন।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নি আঊযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়াল আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়াল বুখলি ওয়াল জুবনি, ওয়া দ্বোলাই-দ্বাইনি ওয়া গালাবাতির রিজা-ল
অর্থঃ হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অলসতা ও অক্ষমতা থেকে, কৃপণতা ও কাপুরুষতা থেকে, ঋণের বোঝা মানুষের নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে। [বুখারীঃ ২৮৯৩]
রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দুআটি বেশি বেশি করে পড়তেন। ফাতহুল বুখারীঃ ১১/১৭৩। 

১৭. দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় কল্যানের জন্য সুন্দর একটি দুয়াঃ
আমরা সবাই দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত। আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন আমাদের বেশিরভাগ দুয়াই ঘুরেফিরে দুনিয়া কেন্দ্রিক। দুনিয়াবি কোনকিছু চাওয়া নিষেধ বা অপছন্দের কিছু না, বরং দুনিয়া আখেরাতের ছোট-বড় প্রতিটা বিষয়ের জন্যই আল্লাহর কাছে দুয়া করলে আল্লাহ খুশি হন। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, আল্লাহ যেই ঈমানদারদের প্রশংসা করেছেন, তারা শুধু দুনিয়ার জন্যই দুয়া করতোনা, তাদের দুয়া হচ্ছেঃ রাব্বানা আ-তিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও-ওয়াফিল আ-খিরাতি হাসানাতাও ওয়া-ক্বিনা আযাবান্নার অর্থাৎ, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে দুনিয়ার জীবনে কল্যাণ দাও এবং পরকালে জীবনেও কল্যাণ দান করো। আর আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচাও। (সুরা বাক্বারাহ)। অর্থাৎ, তারা দুনিয়ার জন্য দুয়া করতো কিন্তু সাথে সাথে পরকালের কল্যানের জন্যও দুয়া করতো। তবে পরকালের জন্য দুনিয়াবী কল্যানের চাইতে দুই গুণ বেশি দুয়া করে, কারণ দুনিয়ার জীবন পরকালের তুলনায় অতি নগণ্য। যাই হোক, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্দর এই দুয়াটা মুখস্থ করে আপনারা সহজেই নামাযে বা নামাযের বাইরে দুনিয়া ও আখেরাতের উভয় জাহানের কল্যানের জন্য দুয়া করতে পারবেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দুয়া করতেন,
উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা আসলিহ-লি দ্বিনিয়াল্লাযি হুয়া ইসমাতু আমরি, ওয়া আসলিহ-লি দুনিয়া-য়্যাল্লাতি ফীহা মাআ-শী, ওয়া আসলিহ-লি আ-খিরাতায়াল্লাতী ফীহা মাআদী। ওয়াজ আলিল হায়া-তা যিয়া-দাতাললী ফি কুল্লি খাইরি ওয়াজ আলিল মাউতা রা-হাতাল লী মিং কুল্লি শাররি।
অর্থঃ হে আল্লাহ্! তুমি আমার দ্বীনকে আমার জন্য সঠিক করে দাও, যা আমার সকল বিষয়ের প্রতিরক্ষা। তুমি আমার দুনিয়াকে আমার জন্য সংশোধন করে দাও, যার মধ্যে রয়েছে আমার জীবন-জীবিকা। তুমি আমার আখেরাতকে আমার জন্য সুন্দর করে দাও, যেখানে আমাকে ফিরে যেতে হবে। তুমি আমার প্রত্যেক পুণ্য কাজে আমার জীবনকে বৃদ্ধি করে দাও এবং প্রত্যেক মন্দ কাজ হতে মৃত্যুকে আমার জন্য শান্তির কারণে পরিণত কর।
রিয়াদুস সালেহীনঃ ১৪৭২, সহীহ মুসলিমঃ ২৭২০।