শনিবার, ১১ জুন, ২০১৬

আলেম নয়, মুখাল্লেত

জনপ্রিয় হওয়া এক জিনিস, আর আল্লাহপ্রিয় হওয়া ভিন্ন জিনিসঃ
(১) আমাদের পেইজে নোমান আলী খান এবং তার মতো আরো কিছু জনপ্রিয় ইসলামিক বক্তার সমালোচনা করা হয়ে দেখে একজন প্রশ্ন করেছেন,
আমার প্রশ্ন হল উনার যখন আক্বিদাই ঠিক নাই তাহলে তিনি এত জনপ্রিয় কেন?
উত্তরটা খুব সহজ। আপনি যদি হক্ক কথা না বলেন, শিরক এবং বিদাতের ব্যপারে এবং মুসলমানদের মাঝে যেই সমস্ত পথভ্রষ্ট দলগুলো শিরক ও বিদাতকে লালন-পালন করে, তাদের ব্যপারে চুপ থাকেন, তাহলে দেখবেন
=> লোকেরা সকলেই আপনাকে পছন্দ করবে,
=> আপনার কথা শুনতে চাইবে,
=> আপনাকে তাদের অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যাবে।
কারণ, আপনি তাদের শিরক ও বিদাতের সমালোচনা থেকে বিরত আছেন, এতেই তারা আপনার উপর খুশি হবে।
বিষয়টা আমি আরেকটু স্পষ্ট করে বলি। বিংশ শতাব্দীতে মুসলমানদের মাঝে সৃষ্ট দুইটি বড় বিদাতপন্থী দল হচ্ছে জামাতে ইসলামী (শুরুঃ ১৯৪১ সালে) এবং তাবলীগ জামাত (শুরুঃ ১৯২৭ সালে)। আপনি নোমান আলী খান, মুফতি মেঙ্ক, ইয়াসীর ক্বাদী. . .এমন সেলেব্রিটি স্পিকারদের হাজার হাজার ঘন্টার লেকচার খুঁজে দেখুন, এই সমস্ত বিদাতী দলগুলোর ব্যপারে তাদের কোন সমালোচনা খুঁজে পাবেন না। তাদের ওয়াজ লেকচারে বিদাতপন্থী দলগুলোকে বিদাত বর্জন করে সুন্নাহর দিকে ফিরে আসার জন্যে স্পষ্ট কোন দাওয়াত বা মেসেজ খুঁজে পাবেন না। বরং, অস্পষ্ট বক্তব্য বা আকার-ইংগিতে আপনি তাদেরকে বিদাতপন্থী দলগুলোর ভক্ত, অনুরাগী বা প্রশংসাকারী হিসেবেই পাবেন। স্বাভাবিকভাবে যারা আহলে সুন্নাহর আক্বিদাহ ও মানহাজ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের ভ্রষ্টতার ব্যপারে এমন নীরবতা বা মৌন সম্মতি তাদেরকে খুশি করবে। আর আপনারা হয়তো সকলেই জানেন, মুসলমানদের মাঝে মোট ৭৩টি দলের মাঝে একটিমাত্র দল নাজাত পাবে, আর বাকী ৭২টি দলই জাহান্নামে যাবে। সুতরাং হক্কপন্থী আলেম এবং তাদের অনুসারী সম সময়েই কম হবে, আর বিদাতপন্থী, ভ্রষ্ট আলেম এবং তাদের অনুসারী হবে ঝাঁকে ঝাঁক।
(২) এ ব্যপারে শায়খ মুজাম্মেল হক্ক এর সুন্দর একটা স্ট্যাটাস কপি করছিঃ
আলেম হয়ে যদি আপনি হক্ক কথা বলা আরম্ভ করেন, দেখবেন মানুষ আপনাকে পছন্দ করবেনা। বক্তৃতার মঞ্চে তথাকথিত হেকমত এর ব্যূহ ভেদ করে হক্ক কথা বলুন, দেখবেন আপনাকে তারা হজম করতে পারছেনা। ইমাম হলে কমিটির মর্জির একচুল বাইরে কিছু বলতে পারছেন না। আপনি মানুষের ভুল আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, এটা আপনার অপরাধ। তাই বন্ধুর সাথে বন্ধুত্ব থাকছেনা। আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক থাকছেনা। নিজ পরিবারের লোক ও আপনাকে নিয়ে সুখ অনুভব করছেনা। উপরন্ত হক্ক কথা না বলতে উপদেশ দিয়ে চলেছে। অদৃশ্য আল্লাহ ছাড়া আপনার জন্য আর কেউ অবশিষ্ট থাকছেনা। এসবই কি নির্মম সত্য নয়? এসবই কি মুমিনের জন্য আখেরাতের বদলায় দুনিয়া বিক্রি নয়? এমনটি কি আল্লাহ আল ক্বুরআনে উল্লেখ করেন নাই? (দেখুন সুরা তাওবাঃ ১১১)।
নবী সালেহ আঃ এর ভাষায় আল্লাহ বলেছেন, হে আমার জনপদের মানুষ! তোমাদের কাছে আল্লাহর বাণী হামেশাই পৌঁছে দিলাম এবং কতইনা উপদেশ দিলাম। কিন্তু সবশেষে এটাই বলতে বাধ্য হলাম যে, তোমরা উপদেশ দান কারীদেরকে পছন্দ করনা। রাফঃ ৭৯।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার সামনে সকল জাতিকে উপস্থিত করা হোল। দেখলাম এক নবী তার সঙ্গে অল্প কিছু মানুষ। আর একজন নবী দেখলাম যার সাথে মাত্র একজন মানুষ। আর একজন নবী যার সাথে দুইজন লোক। এবং দেখলাম আর একজন নবী, যার সাথে কেউ নেই! সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম এবং তিরমিযী।
উপরের আয়াত ও হাদিস প্রমাণ করে যে যিনি প্রকৃত হক পন্থী হবেন, তার জন্যে এমন বাস্তবতার সম্মুখীন হওয়াই স্বাভাবিক। অথচ, আলেম নামের অনেককে দেখি জনপ্রিয় হওয়ার জন্য কি কি না করছেন? সত্যি অবাক লাগে। মনে হয় যেন তারা নবীদের চাইতে বেশি হেকমত জানেন। প্রখ্যাত তাবেঈ, সুফিয়ান আস সাউরি রাহিমাহুলাহ বলেছিলেন, যদি দেখ আলেমের অনেক বন্ধু, তাহলে জেনে নিও সে আলেম নয়, বরং মুখাল্লেত।
**মুখাল্লেত অর্থ মিকচার মেশিন, যার ভিতরে হক বাতিল একসাথে মিশ্রিত হয়।
উম্মতের এই ক্রান্তিলগ্নে, যেখানে আজ মানুষ প্রকাশ্যে শিরক বিদআতে লিপ্ত, সেখানে মিকচার মেশিন কাম্য নয়।
(৩) প্রশ্নকারী আরেকটি প্রশ্ন করেছেন, তাহলে অনেক সহি আক্বীদাহর পেইজে কেনো নোমান আলী খানের লেকচার প্রচার করা হয়?
উত্তরঃ কথিত সেই সমস্ত সহীহ আক্বীদাহর পেইজগুলোও ওদের মতোই। হয় তারা নিজেরা জাহিল, একারণে কার কথা গ্রহণ করা উচিত, কার কথা বর্জন করা উচিত, এ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান নেই। অথবা, তারা জানে তাদের কথা শোনা ঠিক নয়, কিন্তু তাদের লেকচার দিলে কিছু লাইক/শেয়ার বা ফলোয়ার বাড়ে, একারণে জনপ্রিয়তার লোভে সেইগুলো প্রচার করছে। জনপ্রিয়তার প্রতি মোহ খুব খারাপ জিনিস, যা মানুষের ইখলাসকে নষ্ট করে দেয়। আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।

বৃহস্পতিবার, ৯ জুন, ২০১৬

দ্বীনের জ্ঞান অর্জনের ব্যপারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিৎ

দ্বীনের জ্ঞান অর্জনের ব্যপারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিৎ
বর্তমানে টেলিভিশন, ইউটিউব, ফেইসবুক কিংবা ইন্টারেন্টে এমন অনেক জনপ্রিয় বক্তা বা লিখক আছে, যাদেরকে মানুষ বড় আলেম বা দ্বাইয়ী মনে করে, কিন্তু তারা সালফে সালেহীন (সাহাবীদের) আক্বীদাহ (ধর্মীয় বিশ্বাস) ও মানহাজে (কর্ম পদ্ধিত বা চলার নীতিতে) বিশ্বাসী নয়। কিন্তু তারা সেটা প্রকাশ করেনা বা তাদের আক্বিদাহ কি, তা কখনো স্পষ্ট করে বলেনা। অনেক সময় তারা মনভোলানো যুক্তি ও কথার দ্বারা আহলে সুন্নাহর বিরোধীতা করে এবং কৌশলে তার ভক্ত-শ্রোতাদেরকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। এমন ব্যক্তি যারা মূলত বিদআতের অনুসারী, কিন্তু মানুষের কাছে নিজেদের বিদআতকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে, তাদের চেনার সহজ উপায় হচ্ছেঃ সে কার সাথে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা রাখে, সে কোন ব্যক্তিদের সাথে উঠা-বসা করে, কার প্রশংসা করে, সেইদিকে লক্ষ্য করা। কারণ, একজন মানুষ সাধারণত তার বন্ধুর দ্বীনের অনুসারী হয়ে থাকে।
(১) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, একজন মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের অনুসারী হয়ে থাকে। সুতরাং সে যেনো লক্ষ্য রাখে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে। তিরমিজিঃ ২৩৭৮, হাদীসটি হাসান সহীহ, শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ।
(২) এজন্যেই ইমাম আল-আউযায়ী (মৃত্যু-১৫৮ হিজরী) রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাদের কাছে তার বিদআতকে লুকিয়ে রাখে, সে কখনো আমাদের কাছে তার সংগীদেরকে লুকিয়ে রাখতে পারবেনা। আল-ইবানাহঃ ২/৪৭৬।
অনেকে ইসলামী বক্তা ও লেখক প্রকাশ্য বিদআতি ব্যক্তি বা দলগুলোকে বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে সমর্থন করার চেষ্টা করে। এমন ব্যক্তিদের ব্যপারেও আমাদের আলেমরা সতর্ক করেছেন।
(৩) ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি বিদআতিদের প্রতি সু-ধারনা রাখে এবং এই দাবি করে যে, তাদের অবস্থা অজ্ঞাত, তাহলে তাকে তাদের (বিদআতিদের) অবস্থা সম্বন্ধে অবহিত করতে হবে। সুতরাং, সে যদি বিদাতীদের ব্যপারে বিরোধী মনোভাবাপন্ন না হয়, এবং তাদের প্রতি প্রতিবাদমূলক মনোভাব প্রকাশ না করে, তাহলে তাকেও বিদআতিদেরই মতাবলম্বী ও দলভুক্ত বলে জানতে হবে। মাজমুয়া ফাতাওয়াঃ ২/১৩৩। 
(৪) শায়খ সালিহ আল-লুহাইধান হাফিজাহুল্লাহ কে প্রশ্ন করা হয়েছিলো,
প্রশ্নকর্তাঃ এক ব্যক্তি আহলে সুন্নাহ এবং আহলে বিদআহ সবার সাথেই বসে এবং বলে, এখন উম্মতের মাঝে অনেক বিভক্তি হয়েছে, তাই আমি সবার সাথেই বসি। এমন দ্বাইয়ীদের ব্যপারে কি বলা হবে?
উত্তরে শায়খ বলেনঃ সে একজন বিদআতি। উম্মতের ঐক্যের স্বার্থে হক্ক (আহলে সুন্নাহ) ও বাতিল (আহলে বিদআহ, যেমন শীয়া, সূফী, খারেজী ইত্যাদি দলের মাঝে) কোন পার্থক্য না করা, এটা একটি বিদআত। আমরা তার হেদায়েতের জন্য দুয়া করি।
বিঃদ্রঃ আমার এই লেখায় নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি বা দলের নাম উল্লেখ করা হলোনা। কারণ, তা অনেক সময় মানুষের জন্যে ফিতনাহ হয়ে দাঁড়ায়। কোন ব্যক্তি বা দলের প্রতি আবেগ বা ভালোবাসার কারণে অনেকে লেখার মূল উদ্দেশ্য নিয়ে ভুল বুঝেন। আমাদের উদ্দেশ্য মানুষের মাঝে ইলম তুলে ধরা, গ্রহণ করা বা না করা সেটা সবার নিজ নিজ ব্যক্তিগত ব্যপার।
(৫) সর্বশেষ, প্রখ্যাত তাবেয়ী বিদ্বান, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সিরীন রহিমাহুল্লাহ এর মূল্যবান একটা উপদেশ দিয়ে এখানেই শেষ করছি। তিনি বলেছেন, নিশ্চয়ই এই ইলম , এটাই হচ্ছে তোমার দ্বীন। সুতরাং, তোমরা কার নিকট থেকে ইলম অর্জন করছো, তার সম্পর্কে ভালো করে জেনে নিও। সহীহ মুসলিম, মুকাদ্দিমা।

সোমবার, ৬ জুন, ২০১৬

রমযান ও রোযা (পর্ব-১)

রমযান ও রোযা (পর্ব-১)
বিসমিল্লাহ।
আলহামদুলিল্লাহ।
ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসুলিল্লাহ।
(১) রোযার নিয়ত কিভাবে করতে হয়?
উত্তরঃ নিয়ত শব্দের অর্থ হচ্ছে কোন কাজ করতে ইচ্ছা করা বা সংকল্প করা। নিয়ত করতে হবে অন্তরে, মুখে উচ্চারণ করে বিশেষ কোন দোয়া পড়ে নয়। রমযান মাসে রোযা থাকা ফরয। রাতের বেলা আপনার যদি নিয়ত থাকে যে, আপনি আগামীকাল রোযা থাকবেন, অথবা সাহরীর সময় উঠে খাওয়া-দাওয়া করেন এবং মনে মনে চিন্তা করেন যে, আজ আমি রোযা রাখবো, তাহলেই আপনার নিয়ত করা হয়ে যাবে। রোযার নিয়ত করার জন্য বিশেষ কোন দুয়া পড়তে হয়না, শুধুমাত্র মনে ইচ্ছা বা স্থির সিদ্ধান্ত থাকলেই হবে যে, আজ আপনি রোযা রাখবেন।  
রোযার নিয়ত হিসেবে প্রচলিত সাহরী ও ইফতারির ক্যালেন্ডার বা বিভিন্ন ধর্মীয় বই-পুস্তকে যে দুয়া নাওয়াইতুয়ান আসামু গাদামান..., লেখা থাকে, এই দুয়া কুরআন ও হাদীসের কোথাও নাই। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দুয়া পড়ে রোযার নিয়ত করতেন না। এটা আমাদের দেশীয় মাওলানা সাহেবরা বানিয়ে নিয়েছেন, যা সুস্পষ্ট বিদআত। আর বিদআত মানেই হলো পথভ্রষ্টতা এবং বাতিল।
অন্তরে নিয়ত করা ফরয, কিন্তু মুখে উচ্চারণ করা নিয়তের দুয়া পড়া বিদআত।
(২) অনেকে অলসতা করে শেষ রাতে উঠে সাহরী খেতে চায় না, এটা মারাত্মক ভুল। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আমার সুন্নতকে ভালোবাসল, সে যেন আমাকেই ভালোবাসল। আর যে ব্যক্তি আমাকে ভালোবাসলো, সে আমার সাথে জান্নাতে থাকবে। বুখারী ও মুসলিম, মিশকাতঃ ৩০।
বছরে মাত্র এক মাস রোযা রাখা ফরয, তার জন্যে সাহরী খাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটা সুন্নতকে অবহেলা করা মোটেও ঠিকনা।
একটু চিন্তা করে দেখুন, কি আশ্চর্য সুন্দর ধর্ম এই ইসলাম, যা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর নাযিল করা হয়েছে। এই ধর্মের অনুসারীদের খাওয়া পানাহার করাও (সাহরী/ইফতারি ইত্যাদি) ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। সুবহানাল্লাহ!
সুতরাং, ঈমানদারদের জন্য কোনমতেই গ্রহণযোগ্য নয় যে তারা এইভাবে সুন্নতকে অবহেলা করে। যাই হোক, সাহরী খাওয়ার ফযীলত সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা সাহরী খাও, কারণ সাহরীতে রয়েছে বরকত। সহীহ বুখারীঃ ১৯২৩, সহীহ মুসলিমঃ ১০৯৫।
ইচ্ছাকৃতভাবে বা অলসতা করে সাহরী না খাওয়া নিন্দনীয়, কারণ এতে আহলে-কিতাবীদের সাথে সামাজস্য হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমাদের রোযা আর কিতাবধারীদের রোযা (ইয়াহুদি ও খ্রিস্টানদের) রোযার মধ্যে পার্থক্য হচ্ছেঃ সাহারী খাওয়া। সহীহ মুসলিমঃ ২৬০৪।
(৩) যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দা রোযা অবস্থায় থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ তার দুয়া কবুল করেন। সহীহ ইবনে খুযাইমা ও ইবনে হিব্বান গ্রন্থে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
তিন ব্যক্তির দুয়া ফেরত দেওয়া হয় না।
i. রোযাদার ব্যক্তি ইফতার করা পর্যন্ত,
ii. ন্যায়পরায়ণ ইমাম বা শাসক,
iii. মযলুম ব্যক্তির দুয়া
এই (তিন প্রকার ব্যক্তির) দুয়া আল্লাহ আকাশে মেঘমালার উপরে তুলে নেন এবং এর জন্য আকাশের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং মহান রব্ব বলেন, আমার সম্মান ও মর্যাদার কসম করে বলছি, অবশ্যই আমি তোমাকে সাহায্য করবো, কিছু সময় পর হলেও।
আহমাদঃ ২/৩০৫; তিরমিযীঃ ৩৫৯৮; হাদীসটি হাসান সহীহ
সুতরাং, রোযা অবস্থায় বেশি বেশি দুয়া করতে হবে, আপনারা কখনো দুয়া করতে হতাশ বা উদাসীন হবেন না। ঈমানদার বান্দার প্রতিটি নেক দুয়া আল্লাহ কবুল করেন, দ্রুত অথবা দেরীতে। এই দুনিয়াতে না পেলে, পরকালে এই দুনিয়াতে যা চাইছেন, তার চাইতে অনেক উত্তম ও চোখ জুড়ানো প্রতিদান আল্লাহ তাঁর বিশ্বাসী বান্দাদের জন্যে রেখেছেন।
ওয়া সোয়াল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লামা আলান-নাবী।
আখুকুম ফিল্লাহ,

আনসারুস সুন্নাহ। 

শনিবার, ৪ জুন, ২০১৬

‘মুফতী’ কাকে বলা হয়? (পর্ব-১)

মুফতী কাকে বলা হয়?
(১) যেই আলেমের ইজতেহাদ করে অর্থাৎ, ক্বুরান ও হাদীস গবেষণা করে ফতোয়া দেওয়ার মতো যোগ্যতা রয়েছে, তাকে মুফতী বলা হয়। ফতোয়া হচ্ছে দ্বীনের কোন বিষয়ে মতামত দেওয়া যেমন, কোন আলেমকে জিজ্ঞেস করা হলো, অমুক কাজটা কি হালাল নাকি হারাম? এর উত্তরে তিনি বললেন, ক্বুরান ও হাদীসের উপরে আমার গবেষণা অনুযায়ী এই কাজটি হারাম অথবা, শরিয়তের দৃষ্টিতে এই কাজটি হারাম এমন বলা, এটা হচ্ছে সেই আলেমের ফতোয়া। কোন আলেম কোন কিছুকে হালাল বা হারাম বানাতে পারেনা, হালাল বা হারাম বলার মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলার। মুফতিরা শুধুমাত্র ক্বুরান ও হাদীস গবেষণা করে বের করেন, আল্লাহ এটাকে হালাল করেছেন নাকি, হারাম করেছেন।    
(২) একজন আলেমের কোন ফতোয়া সঠিক হতে পারে, আবার ভুলও হতে পারে। কারণ, আলেমরাও মানুষ, তাই কোন আলেমের ফতোয়া ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে ফতোয়া ভুল হোক আর সঠিক হোক, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যে দ্বীনের ব্যপারে কোন প্রশ্নের উত্তর বের করার জন্যে তিনি যে কষ্ট করে গবেষণা করেছেন, এর বিনিময়ে তার জন্যে সওয়াব রয়েছে। কোন আলেম যদি গবেষণা করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন এবং সঠিক ফতোয়া দেন, তাহলে তার জন্যে দুইটি পুরষ্কার রয়েছে। একটি পুরষ্কার হচ্ছে গবেষণা করার জন্যে, আরেকটি হচ্ছে সঠিক ফতোয়া দেওয়ার জন্য। আর কোন যোগ্য আলেম যদি নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা করেন, কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্তে পোঁছাতে সক্ষম না হন, তবুও তার চেষ্টার জন্যে তিনি একটি পুরষ্কার পাবেন। কোন আলেমের ফতোয়া ভুল হোক আর সঠিক হোক, আমাদের কাছে তাঁরা সব সময়েই সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী।
(৩) আলেমদের মাঝে সবাই মুফতী নন। অর্থাৎ, অনেকে আলেম হতে পারেন, ক্বুরান ও হাদীস সম্পর্কে একজন ব্যক্তি অনেক জ্ঞানী হতে পারেন, কিন্তু তার মানে এই না যে, তিনি একজন মুফতি। আলেমদের মাঝে সবচাইতে জ্ঞানী, পরহেজগার, সুন্নতের অনুসারী, প্রখর স্মৃতিশক্তি ও তীক্ষ্ণ মেধা সম্পন্ন জ্ঞানী, যারা ইজতেহাদ করার মতো যোগ্যতায় পৌঁছাতে সক্ষম হন, তাঁরা হচ্ছেন মুফতি। একজন আলেমের ফতোয়া দেওয়ার মতো যোগ্যতা অর্জনের জন্যে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। আমাদের দেশের কওমী মাদ্রাসার অনেকে মনে করেন, কোন ব্যক্তি এতো হাজার ফতোয়া মুখস্থ বলতে পারলে সে একজন মুফতি, এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত একটা ধারণা। অন্য আলেমদের ফতোয়া মুখস্থ করে যে ব্যক্তি তার অন্ধ অনুসরণ করে, সে কোনদিন মুফতি হতে পারেনা, বরং তিনি একজন মুকাল্লিদ বা অন্ধ অনুসারী। কোন আলেম নিজস্ব যোগ্যতার ভিত্তিতে ফতোয়া দিয়ে, এবং অন্য আলেমদের কাছেও মুফতি হিসেবে গ্রহণযোগ্য এবং স্বীকৃত হলে, তাঁকে আমরা একজন মুফতি বলতে পারি।
(৪) মুসলমানদের প্রাণের ভূমি, ইসলামের কেন্দ্র, মক্কা মদীনার দেশ সৌদি আরবের বর্তমান প্রধান মুফতির নাম হচ্ছে, শায়খ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ আহলুশ-শায়খ হাফিজাহুল্লাহ। বর্তমান সারা বিশ্বের মাঝে জীবিত আলেমদের মাঝে তিনি শীর্ষস্থানীয় একজন আলেম হিসেবে বিবেচিত ১৯৯৯ সালে সৌদি আরবের প্রাক্তন প্রধান মুফতি আল্লামাহ আব্দুল আজিজ বিন বাজ রাহিমাহুল্লাহ মৃত্যুবরণ করার পর শায়খ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ আহলুশ-শায়খ সম্মানিত এই আসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে নির্বাচিত হন। উল্লেখ্য, আপনারা প্রতিবছর হজ্জের সময় ৯-ই জিলহজ্জ আরাফাহর ময়দানে ইহরামের সাদা পোশাক পড়া অবস্থায় যাকে খুতবা দিতে দেখেন, তিনিই হচ্ছেন শায়খ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ আহলুশ-শায়খ। সুবহানাল্লাহ, এটা আল্লাহর একটা নিয়ামত যে, তিনি একাধারে বিগত ৩৪ বছর ধরে আরাফার ময়দানে খুতবা দিয়ে আসছেন। শায়খ এর জন্ম হয়েছিলো ১৯৪ সালে, অর্থাৎ বর্তমানে তাঁর বয়স ৭৩ বছর মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেন। আল্লাহ তাঁর দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেন, কিন্তু এর পরিবর্তে তাঁকে সবচাইতে মূল্যবান জিনিস দ্বীনের জ্ঞান দান করেন। ফা লিল্লাহিল হামদ।

(৫) এছাড়া সৌদি আরবের আরেকজন আলেম, শায়খ সালেহ আল-ফাওজান হাফিজাহুল্লাহ মুফতি হিসেবে আরব, অনারব সর্বত্র অত্যন্ত পরিচিত এবং গ্রহণযোগ্য একজন ব্যক্তিত্ব। বিগত শতাব্দীর শীর্ষস্থানীয় দুইজন আলেম ও মুফতি, শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বাজ রাহিমাহুল্লাহ এবং শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ-কে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, আপনার পরে ফতোয়া নেওয়ার জন্যে আমরা কার কাছে যাবো? তাঁদের দুইজনেই প্রথমে যেই আলেমের নাম বলেছিলেন তিনি হচ্ছেনঃ শায়খ সালেহ আল-ফাওজান। শায়খ সালেহ আল-ফাওজান হাফিজাহুল্লাহ ১৯৩৩ সালে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, বর্তমানে তাঁর বয়স হচ্ছে ৮৩ বছর। আকিদাহ, ফিকহ এবং দ্বীনের অনেক বিষয়ের উপরে তাঁর অসংখ্য কিতাব রয়েছে, যার অনেকগুলো বাংলা, ইংরেজী সহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাতে অনুদিত হয়েছে। 
(ইং শা আল্লাহ চলবে)