যাকাত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
যাকাত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৯ জুন, ২০১৬

স্বর্ণের যাকাত কিভাবে হিসাব করতে হবে?

স্বর্ণের যাকাত কিভাবে হিসাব করতে হবে?
কারো কাছে যদি ৭.৫ ভরি বা তার থেকে বেশি পরিমান স্বর্ণ অথবা ৫২.৫ ভরি বা তার থেকে বেশি পরিমান রূপা পূর্ণ এক চন্দ্র বছর জমা থাকে, তাহলে তাকে সেটার মোট মূল্যের ৪০ ভাগের ১ ভাগ বা, শতকরা ২.৫ টাকা (প্রতি ১০০ টাকায় ২.৫ টাকা) হারে যাকাত দিতে হবে।
উদাহরণঃ যেমন ধরুন, কারো কাছে ১০ ভরি স্বর্ণ আছে। এটা নিসাবের পরিমানের থেকে বেশি, তাই তাকে যেইভাবে হিসাব করতে হবেঃ
১০ * প্রতি ভরি স্বর্ণের বর্তমান বাজার মূল্য * ০.০২৫ = যেই টাকা আসবে, সেই পরিমান টাকা তাকে যাকাতের খাতগুলোতে ব্যয় করতে হবে।
অনুরূপভাবে রূপার বা ক্যাশ টাকার যাকাত হিসাব করতে হবে (মোট মূল্য * ০.০২৫ =...টাকা)।
এবছর (৩১শে মে, ২০১৬ তারিখ অনুযায়ী) ২১ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরি মূল্য হচ্ছে ৪৩,৮৫৬ টাকা।
সে হিসেবে,
(১) ২০% মূল্য বাদ দিয়ে আপনার হাতে যে স্বর্ণ আছে তার বিক্রয় মূল্য = ৪৩৮৫৬*০.৮০= ৩৫,০৮৫ টাকা।
(২) ২.৫% হারে ১ ভরি স্বর্ণের যাকাত আসবে = ৩৫,০৮৫ * ০.০২৫ = ৮৭৮ টাকা (প্রায়)
যার কাছে সাড়ে সাত ভরির বেশী আছে, তিনি ৮৭৮ এর সাথে মোট যত ভরি সেটা গুণ করলেই কত টাকা যাকাত দিতে হবে সেটা পেয়ে যাবেন।
কয়েকটি মাসয়ালাঃ
=> নিসাব পরিমান স্বর্ণ, রূপা, ক্যাশ টাকা পূর্ণ এক বছর না হওয়া পর্যন্ত যাকাত দেওয়া ফরয হবেনা। যেইদিন বছর পূর্ণ হবে সেইদিন যাকাত দেওয়া ফরয হবে। রমযান মাসে যাকাত দিতে হবে এমন কোন কথা নেই, যার উপর যেইদিন যাকাত ফরয হবে তখনই যাকাত দিতে হবে। উল্লেখ্য, বছর গণনা করতে হবে চাঁদের হিসাব অনুযায়ী, সৌর বৎসর নয়।
=> যাকাত পুরো সম্পদের উপরেই দিতে হয়। অনেকে মনে করে নিসাব পরিমানের উপরে যেটা হয়, শুধুমাত্র সেই পরিমানের উপরে যাকাত দিতে হয় এটা ঠিকনা।
=> স্বর্ণ, রূপা ও নগদ টাকার নিসাব আলাদা আলাদা হিসাব করা হবে, একসাথে করে যাকাত দিতে হবেনা। অর্থাৎ, কারো কাছে ৬ ভরি স্বর্ণ আর ৪৮ তোলা রুপা আছে, তাহলে তাকে দুইটার মূল্য যোগ করে একসাথে নিসাব হিসাব করে যাকাত দিতে হবেনা। কারণ, দুইটার নিসাব আলাদা, তাদের হিসাবও আলাদা হবে।
=> মেয়ে বা মা, বোনদের যদি মালিক করে গয়না উপহার দেওয়া হয়, তাহলে তাদের প্রত্যেকের হিসাব আলাদা হবে। যেমন ধরুন, ৩ বোনের মিলে ৭.৫ ভরি বা তার বেশি ১০/১৫ ভরি স্বর্ণ হয়, কিন্তু এককভাবে কারোরই যদি ৭.৫ ভরি স্বর্ণ না হয়, তাহলে কাউকেই যাকাত দিতে হবেনা। তবে, কেউ যদি নিজের মেয়েদের স্থায়ী মালিক না করে, গয়নাগুলো শুধু ব্যবহার করতে দেয়, তাহলে সবগুলো মিলিয়ে ৭.৫ ভরি বা তার বেশি হলে তার সম্পূর্ণটার উপরে তাকে যাকাত দিতে হবে।

=> নারীরা যেই গহনাগুলো ব্যবহার করেন, সেইগুলোর উপরেও যাকাত দিতে হবে। 

শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০১৫

জাকাতের কাপড়(!) আনতে গিয়ে

ময়মনসিংহে জাকাতের কাপড়(!) আনতে গিয়ে মানুষের পায়ে পিষ্ট হয়ে অন্তত ২৭ জনের করুন মৃত্যু হয়েছে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন,
মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থলে এবং জলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ মানুষদেরকে তাদের কর্মের শাস্তি আস্বাদন করাতে চান, যাতে করে তারা ফিরে আসে। [সূরা আর রুমঃ ৪১]

মুসলমানদের মাঝে শিরক-বেদাত এবং হারাম ও কবীরাহ গুনাহ সমূহ ব্যপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে মোটামুটি সারা বিশ্বেই মুসলমানদের উপর অবধারিতভাবে আল্লাহর গজব  দেখা যাচ্ছে। কাপড় দিয়ে যাকাত দেওয়া এ আরেক নতুন বেদাত, সম্পদের যাকাত দিতে হয় নগদ অর্থ দিয়ে, শাড়ি-লুংগি বা অন্য কোণ পণ্যদ্রব্য দিয়ে নয়। লোক দেখানো এই শাড়ি-লুংগি আনতে গিয়ে প্রতি বছর দরিদ্র অসহায় মানুষের করুণ মৃত্যু হচ্ছে। কে শেখাবে এই লোকদেরকে, যাকাতের হক্কদারদের কাছে যাকাত পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব যাকাত দাতার নিজের, তাও সেটা গোপনে। মানুষের মাঝে নাম কুড়ানোর জন্য দরিদ্র মানুষদের ডেকে ভিক্ষুকের মতো অপমান করে যাকাত দেওয়া মূর্খতাপূর্ণ বিদাত ছাড়া আর কিছুইনা। 

রবিবার, ৫ জুলাই, ২০১৫

“যাকাত ও ফেতরা নিয়ে পরিবর্তন”

যাকাত ও ফেতরা নিয়ে পরিবর্তন
সহীহ হাদীস দিয়ে প্রমানিত রাসুল (সাঃ) এর নির্দেশ ও সাহাবীদের আমল হলো ফসলের যাকাত ফসল, গবাদি পশুর যাকাত গবাদি পশু ও সম্পদের যাকাত নগদ অর্থ দিয়ে আদায় করতে হবে। অপরদিকে ফেতরা নির্ধারণ করা হয়েছে খাদ্যদ্রব্য দিয়ে, টাকা দিয়ে নয়।
প্রমানঃ ইবনে উমার (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন আল্লাহর রাসুল (সাঃ) মুসলিমদের স্বাধীন ও ক্রীতদাস, পুরুষ ও নারী এবং ছোটো ও বড় সকলের জন্য এক সা (প্রায় ২.৫ কেজির মতো) খেজুর বা যব খাদ্য আদায় ফরয করেছেন।
সহিহ বুখারীঃ ১৫০৩।
সাহাবীরা যে খাদ্যের পরিবর্তে টাকা পয়সা ফেতরা হিসেবে দিতেন না তার প্রমানঃ
আবু সাঈদ আল-খুদরী ()রাঃ বলেন, আমরা আল্লাহর রাসুলের (সাঃ) এর যামানায় ঈদের দিন এক সা খাদ্য আদায় করে দিতাম। আর তখন আমাদের খাদ্য ছিলো যব, কিসমিস, খেজুর ও পানিয়।
সহীহ বুখারীঃ ১৫১০।
হাদীসের সব জায়গায় ফেতরা নির্ধারণ করা হয়েছে খাদ্যের মাপ দিয়ে, কোথাও টাকা দিয়ে করা হয় নাই। যদি টাকা বা মূল্য দিয়ে ফেতরা দেয়া জায়েজ হতো তাহলে দিনার-দিরহাম কিন্তু ততকালীন যুগেও ছিলো। যদি জায়েজ হতো তাহলে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) একবার হলেও দিনার দিরহাম বা খাদ্য দ্রব্র্যের মূল্য পরিশোধ করলেই ফেতরা আদায় হয়ে যাবে, সে কথা বলে দিতেন বা নিজে ও সাহাবীরা এই কাজটা করে আমাদেরকে দেখিয়ে দিতেন। যেহেতু তিনি এমন কোন কথা বলেন নাই অতএব, উপরিউক্ত হাদীসের আলোকে স্পষ্ট, ফেতরা নির্ধারন করা হয়েছে খাদ্যদ্রব্য দিয়ে। অতএব খাদ্যের পরিবর্তে টাকা দিয়ে ফেতরা আদায় করা চলবেনা।
অনুরূপভাবে, আমাদের্ দেশে মানুষ যাকাত আদায় করে যাকাতের কা্পড় দিয়ে যা সাহাবাদের আমলের বিপরীত। এই রকম কুপ্রথা আমাদের্ দেশগুলো যেখানে মূর্খ মুসলমানের ছড়াছড়ি সেখানেই দেখা যায়, আজ পর্যন্ত আরব দেশগুলোতে অর্থ দিয়েই যাকাত আদায় করা হয়। এছাড়া যাকাতের উদ্দেশ্য হলো দারিদ্রতা বিমোচন, পাইকারী হারে লোক দেখানো শাড়ি লুঙ্গি বিতরনে সেই উদ্দেশ্য ব্যহত হয়।
সুতরাং, অবশ্যই সম্পদের যাকাত দিতে হবে নগদ অর্থ দিয়ে। নবীর সুন্নত বিরোধী, রিয়া মিশ্রিত যাকাতের কাপড় বিতরণ দিয়ে যাকাত আদায় আল্লাহর কাছে গ্রহনযোগ্য নয়।

মূলঃ শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাইমিন (রহঃ) এর ফতোয়া অবলম্বনে।

https://www.facebook.com/Back.to.Allah.bangla/videos/466622073434081/

সোমবার, ১৪ জুলাই, ২০১৪

প্রসংগঃ “যাকাত”


প্রসংগঃ যাকাত

যাকাত ইসলামের ৩য় রুকন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
ইসলামের রুকন বা বুনিয়াদ পাচটি বিষয়ের উপর প্রতিষ্ঠিত আর তা হচ্ছে, আল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করা, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রামাযানের সাওম পালন করা এবং হজ্জ করা
[সহীহ মুসলিমঃ ১৮]

যাকাত আদায় করা ফরযঃ
আপনি তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহণ করুন যাতে করে আপনি তাদেররকে পবিত্র করতে এবং তাদের সম্পদকে বরকতময় করতে পারেন এর মাধ্যমে আর (যারা যাকাত দিবে) আপনি তাদের জন্য দোয়া করুন, নিঃসন্দেহে আপনার দোয়া তাদের জন্য সান্ত্বনা স্বরূপ নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুই শুনেন ও জানেন
[সুরা আত-তাওবাহঃ ১০৩]
সুতরাং যাকাত দেওয়া ফরয আর এর বিনিময়ে বান্দার আত্মা পবিত্র হয় ও সম্পদ পবিত্র হয়ে তাতে আল্লাহর বরকত লাভ করা যায়।

যাকাত দেওয়ার ফযীলতঃ
নিশ্চয়ই যারা ইমান আনে এবং সৎকাজ করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত দান করে, তাদের জন্যে রয়েছে পুরষ্কার তাদের তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে তাদের কোন ভয় নেই এবং তাদের কোন দুঃখও থাকবেনা
[সুরা আল-বাক্বারাহঃ ২৭৭]

শয়তানকে পরাজিত করার একটা মাধ্যম হচ্ছে যাকাত আদায় করা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
যখনই কোন ব্যক্তি যাকাত আদায় করে সে এর দ্বারা শয়তানের ৭০টি ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেওয়া দেয়।
[ইবনে খুজাইমাহ, আহমাদঃ ৫/৩৫০, হাদীস সহীহ, সিলসিলাহ সহীহাহঃ ১২৬৮]

যাকাত না দেওয়ার শাস্তিঃ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
যাকে আল্লাহ সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু সে এর যাকাত আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন তার সম্পদকে (বিষের তীব্রতার কারণে) টাকওয়ালা মাথা বিশিষ্ট বিষধর সাপের আকৃতি দান করে তার গলায় ঝুলিয়ে দেয়া হবে সাপটি তার মুখের দুই পাশে কমড়ে ধরে বলবে, আমি তোমার সম্পদ, আমি তোমার জমাকৃত মাল তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিলাওয়াত করেনঃ
আল্লাহ যাদেরকে সম্পদশালী করেছেন অথছ তারা সে সম্পদ নিয়ে কার্পণ্য করছে, তাদের ধারণা করা উচিত নয় যে, সেই সম্পদ তাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে, বরং উহা তাদের জন্য অকল্যাণকর হবে অচিরে কিয়ামত দিবসে, যা নিয়ে কার্পণ্য করছে তা দিয়ে তাদের গলদেশ শৃংখলাবদ্ধ করা হবে (সুরা আলে ইমরানঃ ১৮০)
[সহীহ আল-বুখারীঃ ১৪০৩]

কোন সম্পদের নিসাব কত?
আজকে শুধু স্বর্ণ, রূপা ও নগদ টাকার যাকাত আলোচনা করা হলো, ইন শা আল্লাহ পরবর্তীতে ফসলের যাকাত নিয়ে আলোচনা করা হবে। 

স্বর্ণঃ
স্বর্ণের নিসাব হচ্ছে ২০ দিনার বা ৮৫ গ্রাম ওজনের স্বর্ণ, আমাদের দেশীয় হিসাব অনুযায়ী ৭.৫ ভরি স্বর্ণ।
[আবু দাউদঃ ১৫৭৩, শায়খ ইবনে উষাইমিন, আল-মুমতিঃ ৬/১০৩]

রূপাঃ
রূপার নিসাব হচ্ছে ১৪০ মিসকাল (দিরহাম) অর্থাৎ ৫৯৫ গ্রাম, আমাদের দেশীয় হিসাব অনুযায়ী ৫২.৫ ভরি রূপা।  
[সহীহ বুখারীঃ ১৪৫৯, সহীহ মুসলিমঃ ৯৭৯, শায়খ ইবনে উষাইমিন]

ক্যাশ টাকাঃ
ক্যাশ টাকার নিসাব হচ্ছে রূপা অথবা স্বর্ণের নিসাবের সমান। বর্তমানে রূপা ও স্বর্ণের নিসাবের মূল্যের মাঝে অনেক বেশি পার্থক্য। এ ব্যপারে সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া বোর্ডের ফতোয়া হচ্ছেঃ নিসাব স্বর্ণ ও রূপার মাঝে যেটাকে ধরলে গরীবেরা বেশি উপকৃত হবে, সেটাকেই ধরা উচিত।
- আল-লাজনাহ আদ-দাইয়িমাহঃ ৯/২৪৬।

বর্তমানে ৭.৫ ভরি সোনা থেকে ৫২.৫ ভরি রূপার দাম অনেক কম তাই ক্যাশ টাকার জন্য উত্তম হচ্ছে ৫২.৫ ভরি রূপার দামকেই নিসাব হিসেবে ধরা।

ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২১ ক্যারেট প্রতি গ্রাম রূপার (সৌদি স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী) মূল্য ৪৬.৮৭ টাকা ধরে রূপার নিসাব এর মূল্য হচ্ছেঃ
৫৯৫ * ৪৬.৮৭ = ২৭,৮৮৭ টাকা।
সুতরাং, কারো কাছে সর্বনিম্ন ২৭,৮৮৭ পরিমান টাকা এক বছর ধরে জমা থাকলে ঐ টাকার উপরে যাকাত দেওয়া তার জন্য ফরয হবে।
বিঃদ্রঃ আপনারা স্থানীয় মার্কেটে খোজ নিয়ে দেখুন, আমাদের দেশে যেই ক্যারেটের রূপা ব্যবহার করা হয় তার দাম কত এবং সেই অনুযায়ী হিসাব করে নিবেন ইন শা আল্লাহ।

যাকাতের টাকা কিভাবে হিসাব করতে হবে?
কারো কাছে যদি ৭.৫ ভরি বা তার থেকে বেশি পরিমান স্বর্ণ অথবা ৫২.৫ ভরি বা তার থেকে বেশি পরিমান রূপা পূর্ণ এক চন্দ্র বছর জমা থাকে তাহলে তাকে সেটার মোট মূল্যের ৪০ ভাগের ১ ভাগ বা, শতকরা ২. টাকা (প্রতি ১০০ টাকায় ২. টাকা) হারে যাকাত দিতে হবে
উদাহরণঃ যেমন ধরুন, কারো কাছে ১০ ভরি স্বর্ণ আছে। এটা নিসাবের পরিমানের থেকে বেশি, তাই তাকে যেইভাবে হিসাব করতে হবেঃ

১০ * প্রতি ভরি স্বর্ণের মূল্য * .০২৫ = যেই টাকা আসবে সেই পরিমান টাকা তাকে যাকাতের খাতগুলোতে ব্যয় করতে হবে।

অনুরূপভাবে রূপার বা ক্যাশ টাকার যাকাত হিসাব করতে হবে (মোট মূল্য * ০.০২৫ =...টাকা)

=> নিসাব পরিমান স্বর্ণ, রূপা, ক্যাশ টাকা পূর্ণ এক বছর না হওয়া পর্যন্ত যাকাত দেওয়া ফরয হবেনা। যেইদিন বছর পূর্ণ হবে সেইদিন যাকাত দেওয়া ফরয হবে। রমযান মাসে যাকাত দিতে হবে এমন কোন কথা নেই, যার উপর যেইদিন যাকাত ফরয হবে তখনই যাকাত দিতে হবে। উল্লেখ্য, বছর গণনা করতে হবে চাঁদের হিসাব অনুযায়ী, সৌর বৎসর নয়

=> একই সম্পদ যদি জমানো থাকে তাহলে তার উপরে প্রতি বছরই যাকাত দিতে হবেঅর্থাৎ, কোন সম্পদের উপরে এক বছর যাকাত দিলে পরের বছরেও যদি সেই সম্পদ জমা থাকে, আর তার পরিমান নিসাবের সমান হয়, তাহলে পরের বছরেও ঐ একই সম্পদের উপর যাকাত দেওয়া ফরয হবে।

=> যাকাত পুরো সম্পদের উপরেই দিতে হয়। অনেকে মনে করে নিসাব পরিমানের উপরে যেটা হয় শুধুমাত্র সেই পরিমানের উপরে যাকাত দিতে হয় এটা ঠিকনা।

=> স্বর্ণ, রূপা বা নগদ টাকার যাকাত আদায় করতে হবে স্বর্ণ, রূপা বা নগদ টাকা দিয়ে। টাকা দিয়ে গরীবদেরকে যাকাতের কাপড় বা অন্য কিছু কিনে বিরতণ করলে যাকাত আদায় হবেন। যাকাতে কাপড় দেওয়া এক প্রকার নিকৃষ্ট বেদাত।

=> স্বর্ণ, রূপা ও নগদ টাকার নিসাব আলাদা আলাদা হিসাব করা হবে, একসাথে করে যাকাত দিতে হবেনা। অর্থাৎ, কারো কাছে ৬ ভরি স্বর্ণ আর ৪৮ তোলা রুপা আছে, তাহলে তাকে দুইটার মূল্য যোগ করে একসাথে নিসাব হিসাব করে যাকাত দিতে হবেনা। কারণ, দুইটার নিসাব আলাদা, তাদের হিসাবও আলাদা হবে।

=> মেয়ে বা মা বোনদের যদি মালিক করে গয়না উপহার দেওয়া হয়, তাহলে তাদের প্রত্যেকের হিসাব আলাদা হবে। যেমন ধরুন, ৩ বোনের মিলে ৭.৫ ভরি বা তার বেশি ১০/১৫ ভরি স্বর্ণ হয়, কিন্তু এককভাবে কারোরই যদি ৭.৫ ভরি স্বর্ণ না হয়, তাহলে কাউকেই যাকাত দিতে হবেনা। তবে, কেউ যদি নিজের মেয়েদের স্থায়ী মালিক না করে গয়নাগুলো শুধু ব্যবহার করতে দেয়, তাহলে সবগুলো মিলিয়ে ৭.ভরি বা তার বেশি হলে তার সম্পূর্ণটার উপরে তাকে যাকাত দিতে হবে।

=> স্ত্রীর গয়নার মালিক যদি সে হয়, তাহলে যাকাত ফরয হবে স্ত্রীর উপরে। স্ত্রীর গয়নার উপরে স্বামী যাকাত দিতে বাধ্য নন, তবে কেউ স্বেচ্ছায় নিজ স্ত্রীর যাকাত দিয়ে দিলে তার জন্য ভালো, কিন্তু স্ত্রী বাধ্য করতে পারবেনা। স্ত্রীর কোন উপার্জন নেই এটা কোন অজুহাত হয়, স্ত্রীর নগদ টাকা না থাকলে আর স্বামী যদি যাকাত দিতে না চায়, তাহলে গয়না বিক্রি করেও হলে স্ত্রীকে যাকাত আদায় করতে হবে।

=> ৩-৪ বছর অবহেলা করে যাকাত না দিলে সেটা মারাত্মক অপরাধ ও কবীরা গুনাহ। অতি দ্রুত আল্লাহর কাছে খালেস তোওবা করে অতীতের যাকাতের টাকা হিসাব করে যাকাত আদায় করতে হবে।

=> ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির যদি নিসাব পরিমান সম্পদ থাকে তাহলে তার উপর যাকাত ফরয হবে। তবে তার উচিত হচ্ছে আগে ঋণ পরিশোধ করা, এর পরে নিসাব পরিমান সম্পদ অবশিষ্ট থাকলে, তার উপর যাকাত আদায় করা। কিন্তু কেউ যদি ঋণ পরিশোধ না করে ও নিসাব পরিমান সম্পদ তার কাছে জমা থাকে, তাহলে তাকে যাকাত আদায় করতে হবে।

=> নিকটাত্মীয় যাদের জন্য ব্যয় করা কারো জন্য ফরয (যেমন স্ত্রী, ছেলে মেয়ে, বাবা-মা), বা কেউ মারা গেলে যারা উত্তরাধিকার হয় (যেমন ভাইয়ের কোন ছেলে না থাকলে) তাদেরকে যাকাত দেওয়া যায়না। তবে যাদের জন্য ব্যয় করা ফরয নয় এবং যারা তার উত্তরাধিকারও হবেনা, এমন আত্মীয়দেরকে যাকাত দেওয়া যায়।

=> মুজাহিদদের যাকাত প্রদান করা যায়। ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা করা এক প্রকার জিহাদ। তাই দ্বীন শিক্ষায় নিয়োজিত ছাত্রদেরকে যাকাত দেওয়া যায়।

=> মসজিদে যাকাত দেওয়া যায় না।


=> নিজে ব্যবহার করার জন্য ব্যবহৃত গাড়ি ও বাড়িতে যাকাত দিতে হয়না। বাড়ি, গাড়ি ভাড়া দিয়ে রাখলেও তাঁর উপরে যাকাত দিতে হয়না। প্রাপ্ত ভাড়া জমা থাকলে বছর শেষে তার উপরে যাকাত দিতে হয়। 

শুক্রবার, ১১ জুলাই, ২০১৪

টাকার বদলে যাকাতের কাপড়, শস্যের পরিবর্তে টাকা

যাকাত ও ফেতরা দেওয়ার ভুল সিস্টেমঃ টাকার বদলে যাকাতের কাপড়, শস্যের পরিবর্তে টাকা

فَاسْتَقِمْ كَمَا أُمِرْتَ

উচ্চারণঃ ফাসতাক্বিম কামা উমিরতু
অর্থঃ তুমি সরল সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকো, যেইভাবে তোমাকে আদেশ করা হয়েছে। [সুরা হুদঃ ১১২]

দ্বীনের ব্যপারে বা যেকোন ইবাদত ঠিক সেইভাবে করতে হবে যেইভাবে করতে আদেশ করা হয়েছে ক্বুরান ও সহিহ হাদীসে। এই হুকুমের বাইরে কেউ যদি অন্য কারো তরীকায়, নিজের মনমতো কিছু করে যার হুকুম আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে দেন নাই তাহলে সেটা বাতিল, এইগুলোকেই বেদাত বা ধর্মে নামে নতুন আবিষ্কার বলা হয়। এই ব্যপারে স্পষ্ট হাদীস আছে শ্রেষ্ঠ হাদীসের কিতাব সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে।

মা আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ কেউ যদি এমন কোন কাজ করে, যার অনুমোদন আমাদের কাজের মধ্যে নেই - তাহলে সেটা মারদুদ বা প্রত্যাখ্যাত। [বুখারী ও মুসলিম]

এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আমাদের কাজে - এর দ্বারা তিনি দ্বীনকে বুঝিয়েছেন অর্থাৎ, এমন কোনো কাজ করা যাবেনা যার দলীল কুরান বা সহীহ হাদীসে নাই কিন্তু সওয়াবের কাজ মনে করে করা হবে।

যাকাত ও ফেতরা দুইটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এই যাকাত ও ফেতরা কিভাবে দিতে হবে তা সহীহ হাদীসে স্পষ্ট করে বলা আছে। যেমনঃ-
=> ধান, গম ইত্যাদি ফসলের যাকাত দিতে হবে মোট ফসলের ১০ ভাগের ১ ভাগ (যদি আকাশের বৃষ্টি দিয়ে ফসল হয়) অথবা ২০ ভাগের ১ ভাগ (যদি সেচের মাধ্যমে ফসল ফলানো হয়) কিন্তু এই কথা বলা হয় নাই যে, ফসলের যাকাত ফসলের টাকা দিয়ে দিলে দিতে হবে। বরং কুরান ও হাদীসে বলা হয়েছে ফসলের যাকাত দিতে হবে ফসল দিয়েই।
=> স্বর্ণ, রূপা বা নগদ টাকার যাকাত দিতে হবে তাঁর ২.৫, এই কথা কোথাও বলা নাই এইগুলোর যাকাত দিতে হবে যাকাতের কাপড় কিনে গরীবদের মাঝে বিতরণ করে। বরং, এর মূল্য যাকাতের খাতে ব্যয় করতে হবে।

আর ফেতরার ব্যপারে বলা হয়েছে
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ
প্রত্যেক গোলাম, আযাদ, পুরুষ, নারী, প্রাপ্ত বয়স্ক, অপ্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিমের উপর নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদকাতুল ফিতর হিসাবে খেজুর হোক অথবা যব হোক এক সা (প্রায় ৩ কেজি) পরিমাণ আদায় করা ফরয করেছেন এবং লোকজনের ঈদের সালাতে বের হওয়ার পূর্বেই তা আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন।

এইবার, এর বিপরীতে দেখুন শয়তান সবসময় চায় বান্দাকে ইবাদত থেকে দূরে রাখতে। আর যদি দূরে রাখতে নাও পারে তাহলে অন্তত এর মাঝে ভুল বা শিরক-বেদাত ঢুকিয়ে ইবাদতকে নষ্ট করে দিতে।

এইরকম একটা শয়তানী ষড়যন্ত্র হচ্ছে টাকার পরিবর্তে শাড়ি-লুংগি দিয়ে যাকাত দেওয়া ও শস্যের পরিবর্তে টাকা দিয়ে ফেতরা দেওয়া।

ইসলামী ফাউন্ডেশানের মতো বোকা হুজুর যারা শরীয়াত কি জিনিস জানেনা, তারা যুক্তি দেয়ঃ ফেতরা ধান বা গম দিয়ে দিলে মানুষের কোন উপকারে আসবেনা তাই টাকা দিতে হবে। কিন্তু এই লোকগুলো, যাকাত দেওয়ার সময় এই কথা চিন্তা করেনা, চাল দিলে যদি কারো উপকার না হয় (ভ্রান্ত ধারণা), তাহলে যাকাতের সময় কেনো আমার তাকে কাপড় কিনে দিতে হবে? বরং, যাকাতের টাকা দিয়ে দেই সে তার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করুক।

এইটা এক প্রকার শয়তানী ধোঁকা। কোনটা দিলে কার উপকার কার ক্ষতি সে চিন্তা তোমাকে কে করতে বলেছে? তোমাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাঃ) যেই নির্দেশ দিয়েছেন সেটা করো, তাহলে তুমি নাজাত পাবে। ভ্রান্ত হুজুরের কথা শুনে, মনগড়া যুক্তি দাঁড় করিয়ে শরীয়তকে চেঞ্জ করে টাকার পরিবর্তে শাড়ি-লুংগি দিয়ে যাকাত দিলে অথবা, শস্যের পরিবর্তে টাকা দিয়ে ফেতরা দিলে সেইটা গ্রহণযোগ্য নয়। বরং, শরিয়ত চেঞ্জ করার স্পর্ধা দেখানোর জন্য হাউজে কাউসার থেকে বঞ্চিত হয়ে জাহান্নামে যেতে হবে। হাদীস দেখুন, যারা শরিয়ত চেঞ্জ করে, নিজের মনমতো ইবাদত করে কেয়ামতের দিন তাদের কি পরিণতি হবেঃ

সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, কেয়ামতের দিন হাশরের ময়দানে কিছু মুসলমান যখন হাউজে কাউসার থেকে পানি পান করতে যাবে, তখন ফেরেশতারা তাদেরকে তাড়িয়ে দেবে। রাসুল (সা.) যখন তাদেরকে আসতে দেয়ার কথা বলবেন, তখন ফেরেশতারা তাদের অপরাধের কথা বলবে যে, রাসুল (সা.) এর পরে তারা দীনকে পরিবর্তন করেছিলো। অর্থাত তারা ইবাদাত করেছে ঠিকই, ইসলাম পালন করেছে ঠিকই, কিন্তু বেদাতী ভুল পদ্ধতিতে। এ কথা শোনার পর রাসুল (সা.) বলবেন, যারা আমার পরে আমার পরে দীনকে পরিবর্তন করে ফেলেছে তাদেরকে দূরে তাড়য়ে দাও, তাদেরকে দূরে তাড়িয়ে দাও।


পছন্দ আপনার, হুজুরের শিখানো বাপ দাদার বেদাতী ভুল আমল করে হাউজে কাউসার থেকে বঞ্চিত হবেন নাকি সুন্নাতের পাবন্দী হবেন।

শনিবার, ২৮ জুন, ২০১৪

যাকাত - শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমিন



রমাযাবনের ৩০ আসরঃ
আজকের বিষয়ঃ যাকাত
- শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমিন

সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি পদস্খলন মিটিয়ে দেন ও উপেক্ষা করেন, ক্ষমা করেন আবোল-তাবোল কথা ও ছাড় দেন। যে কেউ তাঁর কাছে আশ্রয় চায় সে সফল হয়, যে কেউ তার সাথে লেন-দেন করে সেই লাভবান হয়, তিনি আকাশকে বিনা খুঁটি উপরে উঠিয়েছেন সুতরাং তুমি চিন্তা কর এবং খাঁটি ও স্বচ্ছ হও। তিনি নাযিল করেছেন বৃষ্টি ফলে ফসলাদিকে দেখা যায় পানিতে সাতরাতে। প্রাচুর্যও প্রদান করেন আবার দারিদ্র্যতাও দেন, কখনও কখনও দারিদ্র্যতা হয় বান্দার জন্য উপযোগী। এমন বহু প্রাচুর্যশীল রয়েছে, যার প্রাচুর্য তাকে গর্ব অহংকারের খুব নিকৃষ্টতম পর্যায়ে নিপতিত করেছে। এ তো ‘কারূন অনেক কিছুরই সে মালিক হয়েছিল, কিন্তু সে সামান্যের ব্যাপারে ছাড় দিতে রাযী ছিল না, তাকে সাবধান করা হয়েছিল কিন্তু সে জাগ্রত হয় নি, তাকে তিরস্কার করা হয়েছিল কিন্তু তিরস্কার তার কাজে আসে নি, বিশেষ করে যখন তার জাতির লোকেরা তাকে বলেছিল, ‘তুমি বেশি খুশি হয়ো না। আমি তাঁর প্রশংসা করি যতক্ষণ পর্যন্ত দিন গড়িয়ে বিকেল হবে, আর রাত পেরিয়ে হবে সকাল।

আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই, তিনি অমুখাপেক্ষী, দানবীর, প্রশস্ত দান করার মাধ্যমে দয়া করেছেন এবং নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল, যিনি আল্লাহর জন্য তাঁর জান ও মাল ব্যয় করেছেন, সত্যকে করেছেন স্পষ্ট ও প্রকাশিত।
আল্লাহ তাআলা তাঁর উপর সালাত পেশ করুন, আর তার সাথী আবু বকরের উপর, যিনি সফরে ও অবস্থানস্থল সর্বদা তার সাথে ছিলেন, কখনও তাকে পরিত্যাগ করেন নি। অনুরূপ উমারের উপর, যিনি দিনের সম্মান ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধিতে ছিলেন সদা সচেষ্ট। আর উসমানের উপর, যিনি আল্লাহর রাস্তায় বহু খরচ করেছেন এবং সংশোধন করেছেন। তদ্রূপ আলীর উপর, যিনি ছিলেন রাসূলের চাচাতো ভাই, তার ব্যাপারে যারা বাড়াবাড়ি কিংবা সম্মানহানি থেকে তাদের থেকে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ মুক্ত; অনুরূপভাবে বাকী সাহাবীগণের উপর এবং যারা সুন্দরভাবে তাদেরকে অনুসরণ করেছেন তাদেরও উপর। আর আল্লাহ তাদের উপর যথাযথ সালামও পেশ করুন।

o  প্রিয় ভাইয়েরা!

* আল্লাহ তাআলা বলেন:
তাদের এ মর্মে আদেশ করা হয়েছে যে, তারা নিবিষ্ট মনে একান্তভাবে শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে, সালাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত প্রদান করব। আর এটাই হলো সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। {সূরা আল-বায়্যিনাহ, আয়াত: ৫}
* আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
আর সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। আর তোমরা নিজদের জন্য মঙ্গলজনক যা কিছু অগ্রে পাঠাবে তোমরা তা আল্লাহর কাছে পাবে প্রতিদান হিসেবে উৎকৃষ্টতর ও মহত্তর রূপে। আর তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। {সূরা আল-মুযযাম্মিল, আয়াত: ২০}
আল্লাহ তাআলা বলেন:
আর তোমরা যে সূদ দিয়ে থাক, মানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য তা মূলত আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না। আর তোমরা যে যাকাত দিয়ে থাক আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে (তাই বৃদ্ধি পায়) এবং তারাই বহুগুণ সম্পদ প্রাপ্ত। {সূরা আর-রূম, আয়াত: ৩৯}
এ ছাড়াও যাকাত ফরয হওয়ার বিধান সম্পর্কে অনেক আয়াত রয়েছে।

o  হাদীসের আলোকে যাকাতের বিধান:
* ‘আব্দুল্লাহ ইবন ‘উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন:
ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি, যথা- এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্যিকারের মাবুদ নেই। সালাত আদায় করা, যাকাত প্রদান করা, রমযানের সিয়াম পালন করা ও হজ আদায় করা। এ কথা শুনে একব্যক্তি বললেন, হজ তারপর কি রমযানের সিয়াম? তিনি বললেন, না বরং প্রথমে রমযানের সিয়াম তারপর হজ। এ ধারাবাহিকতায় আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি। 
মুসলিম: ১৬।
* অন্য বর্ণনায় রয়েছে: (ইসলামের ভিত্তি হলো) এ সাক্ষ্য প্রদান করা যে ‘এক আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই, মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আল্লাহর রাসূল। তারপর পূর্বোক্ত হাদীসের অনুরূপ। 
  বুখারী: ৮; মুসলিম: ১৬
সুতরাং বোঝা গেল, যাকাত ইসলামের একটি রুকন ও মৌলিক ভিত্তিগুলোর একটি।
আর কুরআনের বহু জায়গায় সালাতের পাশাপাশি যাকাতের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।

o  ইজমা:
সকল মুসলিম অকাট্যভাবে একমত যে, যাকাত একটি ফরয বিধান। সুতরাং যাকাত ফরয জেনেও যদি কোনো ব্যক্তি তা অস্বীকার করে, তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে।
আর যে যাকাত প্রদানে কৃপণতা করবে বা পরিমানের চেয়ে কম দেবে, সে লাঞ্ছনা ও কঠিন শাস্তির উপযুক্ত হবে।

o  চার ধরনের সম্পদে যাকাত ফরয:
প্রথম প্রকার: ভূমি থেকে উৎপাদিত শস্য ও ফল-ফলাদী
* কারণ, আল্লাহ তাআলা বলেন:
 ‘হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের বৈধ উপার্জন এবং আমরা তোমাদের জন্য ভুমি থেকে যে শস্য উৎপন্ন করি তা থেকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যয় কর। {সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ২৬৭}
* অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন:
আর তোমরা ফসল কাটার সময় তার হক (যাকাত) আদায় কর। {সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১৪১}

আর সম্পদের সবচেয়ে বড় হক হচ্ছে যাকাত।
* রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
আসমান ও ঝর্ণার পানিতে কিংবা স্বেচ্ছা উৎপাদিত ফসলের মধ্যে এক দশমাংশ আর যা সেচের মাধ্যমে আবাদ হয় তার মধ্যে বিশভাগের এক ভাগ যাকাত প্রদেয়। 
  বুখারী: ১৪৮৩।
ফসলের ওপর যাকাত ফরয হওয়ার নির্ধারিত পরিমাণ হলো  পাঁচ ওসক। কারণ,
* রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
শস্য বা ফলমুলের ওপর যাকাত ফরয হবে না। যতক্ষণ  তা পাঁচ ওসক পরিমাণ না হয়। 
  মুসলিম: ৯৭৯।
আর ওসকের পরিমাণ হলো; রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যবহৃত সা এর ৬০ সা সমপরিমাণ। তাহলে নিসাব হলো, তিনশ সা, আর এক সার পরিমাণ হলো ২০৪০ গ্রাম (দুই কেজি চল্লিশ গ্রাম)। সুতরাং নিসাবের পরিমাণ দাঁড়ালো ৬১২ কেজি। তাই এর কমে যাকাত ফরয নয়। ওই নিসাবে বিনাশ্রমে প্রাপ্ত ফসলের যাকাতের পরিমাণ হলো এক দশমাংশ আর শ্রম ব্যয়ে প্রাপ্ত ফসলের এক বিশমাংশ।
o  ফলমূল, শাক-সবজি, তরমুজ ও জাতীয় ফসলের ওপর যাকাত ফরয নয়।
* কেননা ‘উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেছেন, ‘শাক-সবজিতে যাকাত নেই
* তেমনি আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেছেন, ‘আপেল বা এ জাতীয় ফলের ওপর যাকাত ফরয নয়।
* তাছাড়া যেহেতু এগুলো (নিত্যপ্রয়োজনীয়) খাবার জাতীয় শস্য বা ফল নয়, তাই এর ওপর যাকাত নেই। তবে যদি এসব টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হয় তাহলে মূল্যের ওপর নিসাব পূর্ণ হয়ে এক বছর অতিক্রান্ত হবার পর যাকাত ফরয হবে। 
দ্বিতীয় প্রকার: যে সকল প্রাণীর ওপর যাকাত ফরয হয়
তাহলো: উট, গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ। যদি এ সকল প্রাণী ‘সায়েমা হয় তথা মাঠে চরে চষে খায় এবং এগুলোকে বংশ বৃদ্ধির জন্য পালন করা হয় এবং তা নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে এদের যাকাত দিতে হবে। উটের নিসাব ন্যূনতম ৫টি, গরুর ৩০টি, আর ছাগলের ৪০টি।

সায়েমা ওই সকল প্রাণীকে বলে, যেগুলো সারা বছর বা বছরের অধিকাংশ সময় চারণভূমিতে ঘাস খেয়ে বেড়ায়। যদি এসব প্রাণী সায়েমা না হয়, তবে এর ওপর যাকাত ফরয নয়। কিন্তু যদি এগুলো দ্বারা টাকা-পয়সা কামাই করার উদ্দেশ্য থাকে; যেমন বেচা-কেনা, স্থানান্তর ইত্যাদির মাধ্যমে টাকা-পয়সা আয় করা, তাহলে তা ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে বিবেচিত হবে; আর তখন সেগুলো সায়েমা কিংবা মালুফাহ (যাকে ঘাস কেটে খাওয়ানো হয়) যা-ই হোক না কেন তাতে ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত আসবে; যদি তা স্বয়ং নিসাব পরিমাণ হয় অথবা এসবের মূল্য অন্য ব্যবসায়িক সম্পদের সঙ্গে যুক্ত করলে নিসাব পরিমাণ হয়।

তৃতীয় প্রকার: স্বর্ণ-রৌপ্যের ওপর (নিসাব পরিমাণ হলে) সর্বাবস্থায় যাকাত ফরয। কারণ,
* আল্লাহ তাআলা বলেন:
আর যারা সোনা ও রূপা জমা করে রাখে অথচ তা আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যয় করে না (যাকাত দেয় না)। আপনি তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ প্রদান করুন। কিয়ামত দিবসে ওই সোনারূপাকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ ও পৃষ্ঠে ছেকা দেয়া হবে এবং বলা হবে এ হলো তোমাদের সে সকল ধন-সম্পদ যা তোমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করে রাখতে। সুতরাং আজ জমা করে রাখার স্বাদ গ্রহণ কর।
সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৩৪-৩৫।
আয়াতে ‘জমা করে রাখা বলতে আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় না করা বুঝানো হয়েছে। আর আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার সবচেয়ে বড় খাত হচ্ছে, যাকাতে ব্যয় করা।
* তাছাড়া সহীহ মুসলিমে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
যে সকল সোনা-রূপার মালিকগণ তাদের সম্পদ থেকে নির্ধারিত হক (যাকাত) আদায় না করে, কিয়ামত দিবসে তার জন্য কতগুলো আগুনের পাত প্রস্তুত করে তা জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে তা দ্বারা ওই লোকদের ললাট ও পিঠে চেপে ধরা হবে। তাপ কমে গেলে উত্তপ্ত করে পুনরায় চেপে ধরা হবে। পঞ্চাশ বছর দীর্ঘ সময় বান্দাদের হিসাব-নিকাশ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এভাবে শাস্তি চলতেই থাকবে।
  মুসলিম: ৯৮৭।

* ‘সোনা-রূপার হক আদায় না করার অর্থ, যাকাত আদায় না করা। যা অন্য বর্ণনায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। যেখানে এসেছে,
যে সকল সোনা-রূপার মালিকগণ তাদের সম্পদের যাকাত আদায় না করে....’।
সোনা-রূপার যাবতীয় প্রকারে যাকাত ফরয হবে। চাই তা হোক টাকা পয়সা, চাকা বা টুকরা, পরিধেয় অলংকার বা ধার দেওয়ার মত অলংকার অথবা অন্য প্রকার সোনা-রূপা এসব কিছুর ওপর যাকাত ফরয। কারণ সোনা-রূপার উপর যাকাত ফরয করে বর্ণিত সকল আয়াত বা হাদীস ব্যাপকভাবে এর উপর প্রমাণবহ।
* ‘আবদুল্লাহ ইবন ‘আমর ইবন ‘আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
একদা একজন মহিলা তার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মুখে এলেন। ওই মেয়ের হাতে স্বর্ণের দুটি ভারি ও মোটা বালা ছিলো। তা দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি এসবের যাকাত দাও? মেয়েটি বলল, না। তিনি বললেন, তুমি কি এটা পছন্দ কর যে কিয়ামতের দিন আল্লাহ এসবের দ্বারা দুটি আগুনের চুড়ি বানিয়ে তোমার হাতে পরিয়ে দেবেন? মেয়েটি এ কথা শুনে বালা দুটি খুলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দিয়ে বলল, এসব আল্লাহর রাস্তায় দান করলাম। 
 আহমাদ ২/১৭৮; আবু দাউদ: ১৫৬৩; নাসাঈ ৫/৩৭; তিরমিযী: ৬৩৭। ইবনুল কাত্তান এটাকে সহীহ হাদীস বলেছেন। শাইখ উসাইমীন এর সনদকে ‘শক্তিশালী বলেছেন।
* অন্য এক হাদীসে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার কাছে এলেন, তখন আমার হাতে কয়েকটি বড় বড় রূপার আংটি ছিল। তিনি বললেন, এসব কী? আমি বললাম, আপনার সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করার জন্য এগুলো তৈরি করেছি। তিনি বললেন, তুমি কি এসবের যাকাত প্রদান করো? আমি বললাম, না। তিনি বললেন,  তোমার জাহান্নামে যাওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। 
 আবু দাউদ: ১৫৬৫; বাইহাকী ৪/১৩৯; হাকেম ১/৩৮৯-৩৯০। হাকেম বলেছেন বুখারী ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী, ইমাম যাহাবী তার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। শাইখ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী তার ইরওয়াউল গালীল গ্রন্থে (৩/২৯৭) বলেছেন, হাদিসটি তারা দুজন যেমন বলেছেন তেমনই।
হাদীসটি আবু দাউদ সংকলন করেছেন। অনুরূপ বাইহাকী ও হাকেম, আর তিনি সেটাকে সহীহ বলেছেন এবং আরও বলেছেন যে, এটি বুখারী ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী।
ইবন হাজার ‘আত-তালখীস গ্রন্থে বলেন, এটি বুখারী শর্ত অনুযায়ী। ইবন দাকীকিল ‘ঈদ বলেন, এটি মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী। 

  সোনার নিসাব পূর্ণ না হলে তার ওপর যাকাত ফরয হবে না। আর সে নিসাব হলো, ২০ দিনার। কারণ,
* রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোনার ব্যাপারে বলেছেন,
(স্বর্ণের যাকাত হিসেবে) তোমার ওপর কিছুই ওয়াজিব হবে না যাবৎ তোমার কাছে বিশ দিনার পরিমাণ স্বর্ণ না হবে। 
  আবু দাউদ: ১৫৭৩।
* দিনার বলতে ইসলামী দিনার উদ্দেশ্য যার ওজন এক মিছকাল। মিছকাল সমান সোয়া চার গ্রাম। সে হিসাবে সোনার নিসাব হলো ৮৫ গ্রাম। যা সাউদী মাপে এগার জুনাইহ ও এক জুনাইহ এর তিন সপ্তমাংশ। 
  এ দেশীয় মাপে ৭.৫ ভরি হয়। [অনুবাদক ও সম্পাদক]
o  রূপার নিসাব পূর্ণ না হলে তাতে যাকাত ফরয নয়। আর তার নেসাব হলো: পাঁচ ওকিয়্যা। কারণ,
* রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«لَيْسَ فِيمَا دُونَ خَمْسِ أَوَاقٍ صَدَقَةٌ»
পাঁচ ওকিয়্যার কম রূপার ওপর যাকাত নেই। 
  বুখারী: ১৪৫৯; মুসলিম: ৯৭৯।
এক ওকিয়্যা সমান ৪০ ইসলামী দিরহাম।
সে মতে রূপার হিসাব হলো: ২০০ দিরহাম।
আর এক দিরহাম হলো, এক মিসকালের সাত দশমাংশ। এর মোট ওজন ১৪০ মিসকাল, যার বর্তমান প্রচলিত ওজন হলো: ৫৯৫ গ্রাম।  যা আরবী ৫৬ রৌপ্য রিয়াল মুদ্রা।
  যা এ দেশীয় মাপে ৫২.৫ ভরি। [অনুবাদক ও সম্পাদক]

রৌপ্য ও স্বর্ণের যাকাতের পরিমাণ হচ্ছে, চার দশমাংশ বা ৪০ ভাগের এক ভাগ।

o  কাগজের তৈরি নোট (টাকা) এর ওপরও যাকাত ফরয; কারণ নোটগুলো রূপার বদলেই চলমান। সুতরাং এসব রূপার স্থলাভিষিক্ত হবে এবং এর মূল্যমান রূপার নিসাবের সমপরিমাণ হলে তাতে যাকাত ফরয হবে।
o  সোনা-রূপা ও কাগজের নোট ইত্যাদি ওপর সর্বাবস্থায় যাকাত ফরয। চাই তা হাতে মজুদ থাকুক বা অন্য কারো যিম্মাদারীতে থাকুক।
এ থেকে বুঝা যায়, সব ধরনের ঋণ, চাই তা কর্জ হোক বা বিক্রয়কৃত বস্তুর মূল্য হোক কিংবা ভাড়া বা এ ধরনের যা-ই হোক না কেন, তার ওপর যাকাত ফরয। তারপর যদি সে ঋণ এমন লোকের কাছে থাকে যে সচ্ছল এবং সহজে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তখন সে প্রতি বছর অন্যান্য সম্পদের সঙ্গে সঙ্গে এসবের যাকাত দিবে, অথবা সে ঋণ আদায় করা পর্যন্ত দেরী করে যত বছর যাকাত দেয় নি তত বছরের যাকাত হিসেব করে আদায় করবে।
আর যদি দরিদ্র বা ঋণ আদায়ে টালবাহানাকারী লোককে ঋণ দেয়া থাকে, যার কাছ থেকে সেটা আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ে  তাহলে ঋণ আদায় হওয়ার পর শুধু ওই ঋণ উসুল করা বছরের যাকাত প্রদান করবে; পূর্ববর্তী বছরগুলোর যাকাত দিতে হবে না।

o  সোনা-রূপা ছাড়া অন্য সকল খনিজ পদার্থ যদিও তা আরও মূল্যবান হয়, তাতে যাকাত ফরয নয়। তবে তা যদি ব্যবসার পণ্য হয়ে থাকে; তাহলে নিসাব পূর্ণ হলে অবশ্যই ব্যবসায়ী পণ্য হিসেবে যাকাত দিতে হবে।

চতুর্থ প্রকার: ব্যবসায়ী পণ্য
ব্যবসায়ী পণ্য বলতে বুঝায়: এমন যাবতীয় বস্তু যা দ্বারা মুনাফা অর্জন কিংবা ব্যবসার উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। যেমন, জমি, জীব-জন্তু, খাবার, পানীয় ও গাড়ী ইত্যাদি সব ধরনের সম্পদ।
সুতরাং বছরান্তে সেগুলোর মূল্য নির্ধারণ করে তার চার দশমাংশ বা ৪০ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে। চাই সেটার মূল্যমান ক্রয়মূল্যের সমপরিমান হোক, অথবা কম হোক অথবা বেশি হোক। 
মুদি দোকানদার, মেশিনারি দোকানদার বা খুচরা যন্ত্রাংশ বিক্রেতা  ও এ জাতীয় ব্যবসায়ীদের কর্তব্য হলো, ছোট বড় সকল অংশের মূল্য নির্ধারণ করে নেবে, যাতে কোনো কিছু বাদ না পড়ে। পরিমাণ নির্ণয়ে যদি জটিলতা দেখা দেয়, তাহলে সতর্কতামূলক বেশি দাম ধরে যাকাত আদায় করবে, যাতে সে সম্পূর্ণভাবে দায়িত্বমুক্ত হতে পারে।
o  মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় বস্তু যথা খাবার, পানীয়, বিছানা, আসবাবপত্র, থাকার ঘর, বাহন, গাড়ী, পোশাকের (ব্যবহার্য সোনা-রূপা ছাড়া) ওপর যাকাত নেই। কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
 ‘মুসলিমের দাস-দাসী, ঘোড়ার ওপর যাকাত নেই। 
বুখারী: ১৪৬৪; মুসলিম: ৯৮২।
o  অনুরূপভাবে ভাড়া দেওয়ার জন্য প্রস্তুতকৃত পণ্য যেমন জমি-জমা, গাড়ী ইত্যাদির ওপর যাকাত আসবে না। তবে সেসব থেকে প্রাপ্ত অর্থের ওপর বছর পূর্তির পর সেটা দ্বারা স্বয়ং নিসাব পূর্ণ হোক বা এ জাতীয় অন্য সম্পদের সাথে মিশে নিসাব পূর্ণ হোক তাতে যাকাত দেয়া ফরয হবে। 

o  প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা! তোমরা তোমাদের সম্পদের যাকাত যথাযথভাবে আদায় কর, আর এতে তোমাদের মন যেন খুশী থাকে। বস্তুত এটা লাভজনক, জরিমানামূলক নয়। মুনাফাস্বরূপ, ক্ষতিস্বরূপ নয়। তোমরা তোমাদের সকল যাকাতযোগ্য সম্পদ ভালোকরে হিসেব কর। আর আল্লাহর কাছে যা তোমরা ব্যয় কর তা কবুল করার জন্য এবং যা তোমাদের কাছে অবশিষ্ট রেখেছ তাতে বরকত দেওয়ার জন্য প্রার্থনা কর।
আর সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহর জন্য।

আল্লাহ সালাত ও সালাম পেশ করুন আমাদের নবী মুহাম্মাদ, তার পরিবার-পরিজন ও সকল সাহাবীর উপর।