রবিবার, ৬ জুলাই, ২০১৪

প্রশ্ন হারুত ও মারুত কে? তারা জান্নাতে যাবে নাকি জাহান্নামে যাবে?



প্রশ্ন হারুত ও মারুত কে? তারা জান্নাতে যাবে নাকি জাহান্নামে যাবে?

পোস্টের ছবি পরিচিতিঃ অনেক হুজুর বা যারা ঝাড়ফুক করে তাদের মাঝে কিছু আসলে যাদুকর যারা জিন দিয়ে যাদু করে, তাদের কিছু লক্ষণ ছবিতে দেওয়া আছে)

উত্তরঃ হারুত ও মারুত হচ্ছেন ২ জন ফেরেশতা, যারা আল্লাহর নির্দেশক্রমে ইরাকের বাবেল শহরে আসেন - সেখানকার মানুষদের জন্য পরীক্ষা হিসেবে। তারা মানুষকে ‘জাদু’ শিক্ষা দিতো আর শিক্ষা দেওয়ার সময় মানুষকে বলে দিতোঃ “আমরা তোমাদের জন্য ফেতনা বা পরীক্ষা” - তাই এই শিক্ষা কাজে লাগিয়োনা কারণ – এটা (জাদু করা) হচ্ছে ‘কুফুরী’ কাজ। কিন্তু তাদের কথা না শুনে যারা যাদু শেখার জন্য জোর করতো, শুধুমাত্র তাদেরকেই তারা জাদু শিক্ষা দিতো। এভাবেই তাদেরকে আল্লাহ পরীক্ষা করেন, যাদুকরেরা দুনিয়ার সামান্য স্বার্থের জন্য যাদু শিখে কাফের হয়ে যায়। 

উল্লেখ্য, যদিও হারুত ও মারুত মানুষকে জাদু শিক্ষা দিতো কিন্তু মনে রাখতে হবে - তারা হচ্ছেন ফেরেশতা ও আল্লাহর সম্মানিত বান্দা। তারা আল্লাহর অবাধ্যতা করেননি, বরং আল্লাহই তাদেরকে পাঠিয়েছিলেন – মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য। এই তাফসীর করেছেন ইমাম আল-হাসান আল-বাসরী যা আবি হাতিমে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া, কাতাদাহ, ইবনে সুদ্দী তারাও এই মতটাকেই গ্রহণ করেছেন – কারণ আয়াতের স্পষ্ট অর্থ সেটাই মিন করে যা সাহাবাদের কাছ থেকে বর্ণিত হয়েছে। 

ব্যখ্যাঃ আমাদের জীবনের সবটাই আসলে পরীক্ষা। যেমন আল্লাহ তাআ’লা বলেনঃ

“যিনি (আল্লাহ) সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে করে তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন, কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী ও ক্ষমাময়।”
সুরা আল-মুলকঃ ২। 

আল্লাহ একেকজনকে একেকভাবে পরীক্ষা করেন। যেমন কাউকে সম্পদ দিয়ে, কাউকে সম্পদ না দিয়ে, কাউক সন্তান দিয়ে কাউকে না দিয়ে।
“তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষাস্বরূপ।”
সুরা তাগাবুনঃ ১৫। 

অনুরূপভাবে, আল্লাহ বাবেল শহরের মানুষদেরকে জাদু দিয়ে পরীক্ষা করেন, এই জাদু শিক্ষা দিতো হারুত ও মারুত নামের ২ ফেরেশতা, আল্লাহর আদেশক্রমেই। অনেকে মনে করে বা কিছু তাফসীরে লেখা আছে, হারুত মারুত আল্লাহর অবাধ্যতা করেছিলো। এই কাহিনী আসলে এসেছে কিছু ইসরায়েলী কাহিনী থেকে যেইগুলোর কোন দলীল নেই। ফেরেশতারা অবাধ্যতা বা পাপ করেছেন – এই ধারণা ভুল কারন ফেরেশতারা কোনদিন আল্লাহর অবাধ্যতা করেন না, তাদেরকে সেইভাবে সৃষ্টিই করা হয়নি। 

ফেরেশতারা সবসময় আল্লাহর অনুগতঃ
“তারা আগে বেড়ে কথা বলতে পারে না এবং তারা তাঁর আদেশেই কাজ করে।”
সুরা আল-আম্বিয়াঃ ২৭।

“তারা আল্লাহ তা’আলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে।”
সুরা আত-তাহরীমঃ ৬। 

সুতরাং, হারুত মারুত আল্লাহর কোন অবাধ্যতা করেন নি, বরং তারা আল্লাহর হুকুম মেনেই বাবেল শহরে আসেন তাদের জন্য পরীক্ষা হিসেবে। আরা ফেরেশতারা আল্লাহর অনুগত ও সম্মানিত বান্দা, তারা আল্লাহর ইবাদত করেন তার আদেশ পালন করেন। যেহেতু তাদের কোন পরীক্ষা নেই যেমন জিন ও মানুষের আছে, তাই মানুষ ও জিনের মতো ফেরেশতারা জান্নাত বা জাহান্নামে যাবেন না। 

সর্বশেষ, হারুত ও মারুতকে নিয়ে ক্বুরানুল কারীমের আয়াতে কারীমাটিঃ

“তারা ঐ শাস্ত্রের অনুসরণ করল, যা সুলায়মানের রাজত্ব কালে শয়তানরা আবৃত্তি করত। সুলায়মান কুফর করেনি; শয়তানরাই কুফর করেছিল। তারা মানুষকে জাদুবিদ্যা এবং বাবেল শহরে হারুত ও মারুত দুই ফেরেশতার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছিল, তা শিক্ষা দিত। তারা উভয়ই (হারুত ও মারুত) একথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিত না যে, আমরা পরীক্ষার জন্য; কাজেই তুমি কাফের হয়ো না। অতঃপর তারা তাদের কাছ থেকে এমন জাদু শিখত, যদ্দ্বারা স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। তারা আল্লাহর আদেশ ছাড়া তদ্দ্বারা কারও অনিষ্ট করতে পারত না। যা তাদের ক্ষতি করে এবং উপকার না করে, তারা তাই শিখে। তারা ভালরূপে জানে যে, যে কেউ জাদু অবলম্বন করে, তার জন্য পরকালে কোন অংশ নেই। যার বিনিময়ে তারা আত্নবিক্রয় করেছে, তা খুবই মন্দ যদি তারা জানত।”
সুরা আল-বাক্বারাহঃ ১০২। 


শনিবার, ৫ জুলাই, ২০১৪

চুলে কালো রঙ (কলপ) করা হারাম

চুলে কালো রঙ (কলপ) করা হারামঃ

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) চুল সাদা হয়ে গেলে তা কালার করতে বলেছেন, কিন্তু কালো রং করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, “সাদা চুল এর রঙ পরিবর্তন করো, কিন্তু কালো রঙ ছাড়া”। (সহীহ মুসলিম ৫৪৭৬)।

যারা কালো রঙ করবে তাদের ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি (সাঃ) বলেছেনঃ

“কেয়ামতের আগে কিছু মানুষ আসবে যারা চুলে কবুতরের বুকের মতো কালো রঙ করবে, তারা জান্নাতে যাওয়াতো দূরের কথা এর ঘ্রাণ পর্যন্ত পাবেনা। 
আবু দাউদ ৪২১২, নাসায়ী ৮/১৩৮।

বিঃদ্রঃ নারীরা সৌন্দর্যের জন্য চুলে অন্য যে কোনো কালার করতে পারবে। তবে, তা এমনভাবে করবেনা যাতে করে কাফের নারী বা নায়ক নায়িকাদের সাদৃশ্য বহন করে। আর পর পুরুষদের দেখানোর জন্যও করবেনা।

আল্লাহ আমাদের ও আমাদের নারীদের সম্মান রক্ষা করুন।

শুক্রবার, ৪ জুলাই, ২০১৪

বেনামাযী শিরক ও কুফর



যে ব্যক্তি নামায ছেড়ে দিলো এর অর্থ হলো, সে শিরক ও কুফুরীর পাপে লিপ্ত হলোঃ
ð  “নিশ্চয় মানুষ ও শির্ক ও কুফুরীর মাঝে পার্থক্যকারী বিষয় হচ্ছে নামায ত্যাগ করা।
সহীহ মুসলিমঃ ঈমান অধ্যায়।

শিরকের গুনাহ আল্লাহ কোনদিন ক্ষমা করবেন নাহঃ
ð  “নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে ব্যক্তি শিরক করে।”
সুরা আন-নিসাঃ ৪৮।

ð  “নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শিরক করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাত হারাম করে দেন। এবং তার বাসস্থান হচ্ছে জাহান্নাম। আর জালেমদের কোন সাহায্যকারী নেই।”
সুরা আল-মায়িদাহঃ ৭২।


এই রোযার মাঝেও যে নামায পড়তে পারেন নাহ, সারা জীবনে পারবে কিনা সন্দেহ! তাই বেনামাযি ভাই-বোনেরা সতর্ক হন। তোওবা করে ঈমান এনে, ৫ ওয়াক্ত নামায পড়ে মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণ করার চেষ্টা করুন। আল্লাহ আমাদেরকে মুসলিম-মুসলিমাহ হিসেবেই মৃত্যু দান করুন – আমিন।  

বৃহস্পতিবার, ৩ জুলাই, ২০১৪

ভালো মানুষ বিপদে পড়ে আর অনেক পাপাচারী সুখে থাকে?



প্রশ্নঃ অনেক ভালো লোক আছে, যাদের একটার পর একটা বিপদ-আপদ লেগেই থাকে। কিন্তু অমুক লোকটা এতো পাপ করে, তারপরেও সুস্থ সামর্থ্য - দিব্যি আনন্দেই দিন কাটাচ্ছে! আল্লাহ যদি পাপীদের শাস্তিই দিয়ে থাকেন তাহলে, এটা কেমন করে হতে পারে?

উত্তরঃ আলহামদুলিল্লাহ, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার।
এটা একটা প্রশ্ন যা অনেক ভাই ও বোনেরাই করে থাকেন। যাই হোক এ সম্পর্কে সংক্ষেপে কিছু কথা।

প্রথমেই বলে নেই আমাদের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ ভালো থাকা বলতে কি বুঝেনঃ
১. প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তথাকথিত ‘হাই স্ট্যাটাস নিয়ে সমাজে লাক্সারিয়াস জীবন কাটাচ্ছে।
২. ছাত্র জীবনে সফল, ক্লাসে হাইয়েস্ট নম্বর পায় নিয়মিত, ২-৩ টা প্রেম করে অবৈধভাবে নারীদের ভোগ করে যাচ্ছে, মদ জুয়া নিয়ে ইচ্ছেমত দুইদিনের দুনিয়াকে ‘এনজয় করছে, তারপরেও ভালো ডিগ্রী নিয়ে পাস করে ক্যারিয়ার এস্টাব্লিশ করছে।
৩. হালাল-হারাম মন যা চায় ব্যবসা করে, সুদ-ঘুষের সাথে জড়িয়ে খুব দ্রুত বিশাল টাকার মালিক হয়ে বাড়ি-গাড়ি করতে পারলে।

ইসলাম অনেক কিছুর সংজ্ঞাই পরিবর্তন করে দেয়। হতে পারে দুনিয়ার পাপাচারে লিপ্ত থাকার পরেও কারো ভোগ-বিলাসের সুযোগ পাওয়া – এটা আসলে তার জন্য একপ্রকার কঠোর শাস্তি! আবার কারো জন্য এমনও হতে পারে, বিপদ-আপদে পতিত মানুষটাই এর প্রতিদানের কারণে এই লোকটাই হচ্ছেন – চূড়ান্ত ভাগ্যবান।  এইজন্য আল্লাহ তাআলা বলেছেনঃ

প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। আর তোমরা কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ প্রতিদান পাবে। অতঃপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সেই প্রকৃত সফলকাম। আর পার্থিব জীবন প্রতারণাপূর্ণ সাময়িক ভোগের সম্পদ ছাড়া আর কিছুইনা। অবশ্যই তোমাদেরক ধন-সম্পদে এবং তোমাদের জীবন দিয়ে পরীক্ষা করা হবে। (সুরা আলে-ইমরানঃ ১৮৫-১৮৬)।

অনেক ভালোমানুষ বা বড় রকমের পাপী না হয়েও যে কারণে বিপদের সম্মুখীন হতে পারেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে বিপদের মুখে পতিত করেন। অর্থাত্ বিপদ দিয়ে তাকে পরীক্ষা করেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং- ৫২৩৬)।

যদিও আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন তবুও তাকে বিপদে ফেলে পরীক্ষা করেন, এর হিকমত হচ্ছেঃ
১. বিপদের দ্বারা তার দুনিয়ার জীবনের পাপ ও ভুল-ভ্রান্তির প্রায়শ্চিত্ত হয়ে পাপ মোচন হবে।
২. বিপদ-আপদে ধৈর্য ধরার কারণে সে পরকালে বেহিসাব নেয়ামত পাবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
দুনিয়ায় যারা বিপদ-আপদে নিপতিত হয়েছে তাদেরকে যখন কিয়ামতের দিন বিনিময় প্রদান করা হবে তখন বিপদ-আপত মুক্ত ব্যক্তিরা আশা করবে, দুনিয়ায় যদি তাদের চাঁমড়া কাচি দিয়ে টুকরা টুকরা করে ফেলা হত।
সহিহ আত্ তিরমিজি, সংসারের প্রতি অনাসক্তি অধ্যায়, হাদিসঃ ২৪০২, হাদীসটি হাসান সহীহ।

পক্ষান্তরে অনেকে দিন-রাত পাপ কাজে ডুবে থাকে তবুও আল্লাহ তাদেরকে পার্থিব জীবনে সাময়িক ভোগ-বিলাসের জন্য অবসর দেন। এ প্রসংগে আল-আল্লামাহ, শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ

যদি কাউকে দেখ সে প্রকাশ্য কবীরা গুনাহতে লিপ্ত আর আল্লাহ তাকে তার বিরোধীতাকারীদের থেকে আশ্রয় দিয়েছেন এবং তাকে দুনিয়ার জীবনে উন্নতি দান করছেন – তাহলে নিশ্চিত জেনে রাখ - আল্লাহ তার খারাপ চান। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
আল্লাহ্ যখন তাঁর বান্দার কল্যাণের ইচ্ছা করেন তখন দুনিয়াতে তার জন্য তাড়াতাড়ি বিপদ-আপদ নাযিল করে দেন। আর যখন তিনি তাঁর বান্দার অমঙ্গলের ইচ্ছা করেন তখন তাকে গোনাহের মধ্যে ছেড়ে দেন। অবশেষে কিয়ামতের দিন তাকে পাকড়াও করবেন।
তিরমিযী, রিয়াদুস স্বালিহিন।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আরো বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ
বিপদ-আপদ হয় যত বড় তার প্রতিদানও তত বড় হয়। আল্লাহ তাআলা যখন কোন সম্প্রদায়কে ভালবাসেন তখন তাদের তিনি পরীক্ষায় পেলেন। যে তাতে সন্তুষ্ট থাকবে তার জন্য হবে (আল্লাহর) সন্তুষ্টি আর তাতে যে অসন্তুষ্ট হবে তার জন্য হবে (আল্লাহর) অসন্তুষ্টি।
সহিহ আত্ তিরমিজি, সংসারের প্রতি অনাসক্তি অধ্যায়, হাদিস ২৩৯৫, হাদীসটি সহীহ।

এইরকম পাপাচারীদের ব্যপারে মহান আল্লাহ বলেনঃ
আর যারা কুফরের দিকে ধাবিত হচ্ছে তারা যেন তোমাদেরকে চিন্তিত করে না তোলে। তারা আল্লাহ তাআলার কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ তাদেরকে ছাড় দিয়েছেন কারণ) আল্লাহর ইচ্ছা হচ্ছে আখেরাতে তাদেরকে কোন কল্যাণ দান না করা। প্রকৃতপক্ষে তাদের জন্যে রয়েছে মহা শাস্তি। যারা ঈমানের পরিবর্তে কুফুরীকে ক্রয় করে নিয়েছে, তারা আল্লাহ তাআলার কোন ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি। কাফেররা যেন মনে না করে যে, আমি তাদেরকে যে অবকাশ দান করি, তা তাদের পক্ষে কল্যাণকর। আমিতো তাদেরকে অবকাশ দেই একারণে যে যাতে করে তারা পাপে উন্নতি লাভ করতে পারে। বস্তুতঃ তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাজনক শাস্তি। (সুরা আলে-ইমরানঃ ১৭৬-১৭৮)।
_________________________________

দুনিয়ার সম্পদ, ভোগ-বিলাস আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে দান করেন, আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন তাকে দেন, যাকে ভালোবাসেন না তাকেও দেন। কারণ, দুনিয়া দিয়ে আল্লাহ বান্দাকে রহমত করেন না, বরং পরীক্ষা করেন। কিন্তু দ্বীন আল্লাহ শুধুমাত্র তাকেই দান করেন যাকে তিনি ভালোবাসেন।

বিশ্বাস হয়না?


খোঁজ নিয়ে দেখুন, দুনিয়ার সবচাইতে ধনী মানুষদের কয়জন মুসলিম? আর এর বিপরীতে নবী রাসুলরা কত কষ্ট করে, কাফের-মুশরেকদের সাথে যুদ্ধ করে, দারিদ্র ও দুঃখ-কষ্টের সাথে লড়াই টিকে ছিলেন?

বুধবার, ২ জুলাই, ২০১৪

প্রসংগঃ “তারাবীহ” এর সালাত


প্রসংগঃ “তারাবীহ এর সালাত

তারাবীহ, তাহাজ্জুদ, বিতর – এইসবগুলো নামায আসলে একই নামাযের ভিন্ন ভিন্ন নাম – হাদীস ও ক্বুরানের ভাষায় যাকে ‘কিয়ামুল লাইল বলা হয়।

রামাযান মাসে ‘কিয়ামুল লাইল বা রাতের নফল সালাতকে ‘তারাবীহ বলা হয়। ‘তারাবীহ এর সালাতকে আল্লাহ ‘তারাবীহ বলেন নি, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও তারাবীহ বলেন নি। তারাবীহ নামটা আসলে পরবর্তীতে দেওয়া হয়। নাম ভিন্ন হলেও - মূলত এটা ‘কিয়ামুল লাইল এর অন্য নাম, এইজন্য এই সালাতকে ‘তারাবীহ বলা ‘বেদাত হবেনা। যেমন, আমরা সালতকে ফার্সি শব্দ ‘নামায বলি, কিন্তু যেহেতু এর দ্বারা উদ্দেশ্য একই থাকেঃ সালাত - তাই এটা গর্হিত কোন অপরাধ নয়। তবে আমাদের চেষ্টা করা উচিত, আস্তে আস্তে কুরান ও হাদীসের মূল শব্দগুলো চালু করার জন্য, যাতে করে এনিয়ে মানুষের মাঝে কনফিউশান তৈরী না হয়।

তারাবীহ বা ‘কিয়ামুল লাইল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়মিত পড়তেন। সেইজন্য তারাবীহর সালাত পড়া আমাদের জন্য সুন্নত। আবার, তারাবীহর সালাত ফরয ওয়াজিব নয়, সুতরাং এটা না পড়লে গুনাহ নেই, তাই এটাকে আমরা ‘নফল বা অতিরিক্ত নামায বলতে পারি। কিন্তু কেউ এটাকে অবহেলা করে না পড়লে, সে তার সওয়াব ও বিরাট ফযীলত থেকে বঞ্চিত হবে।

নফল সালাতের ব্যপারে ‘উসূল বা মূলনীতি হচ্ছেঃ
নফল নামাযের আমীর বান্দা সে নিজে। কারো ইচ্ছা হলে সে ২ রাকাত তারাবীহ পড়তে পারে, কারো ইচ্ছা হলে ৪, কারো ইচ্ছা হলে ৮, কারো ইচ্ছা হলে ২০, কারো ইচ্ছা হলে ৩০/৪০ যেকোন রাকাআত পড়া যায়েজ আছে। যে যত বেশি পড়বে সে তত বেশি সওয়াব পাবে। 

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে কয় রাকাআত তারাবীহ পড়তে বলেছেন?

এক সাহাবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞেস করেন, রাতের নামায কিভাবে পড়তে হবে? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই প্রশ্নের উত্তরে নির্দিষ্ট কোন রাকাআ'ত বেধে দেন নি, তিনি এর নিয়ম বলে দিয়ে রাকায়াত অনির্দিষ্টভাবে ছেড়ে দিয়েছেন যার যত রাকাত ইচ্ছা পড়বে। তিনি বলেছেন, ২ রাকাত রাকাত করে রাতের সালাত পড়ার জন্য, আর সর্বশেষ ১ রাকাত পড়ে সমস্ত নামাযকে বিতর বা বিজোড়ে পরিণত করে দিতে। যেহেতু এটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মুখের কথা – অর্থাৎ 'ক্বাওলী' সুন্নাহ – অর্থাৎ তিনি নিজে এইভাবে আমাদেরকে করতে বলেছেন। সুতরাং এটা তার ব্যক্তিগত আমল থেকে প্রাধান্য পাবে।

হাদীসের দলীলঃ
ইবন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) এর নিকট রাতের সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বললেন, “রাতের সালাত দুই দুই (রাকায়াত) করে। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যদি ফজর হওয়ার আশংকা করে, সে যেন এক রাকায়াত মিলিয়ে সালাত আদায় করে নেয়। আর সে যে সালাত আদায় করল, তা তার জন্য বিতর (বেজোড়) হয়ে যাবে
সহিহ বুখারী, খন্ড ২, অধ্যায় ১৬, হাদিস ১০৫।

উপরের হাদীসটা ইমাম বুখরী (রহঃ) যেই অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন তার নাম হচ্ছেঃ- “বিতরের স্বলাত

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, “বিতরের স্বলাত আর কিয়ামুল লাইল একই নামায!

এবার হাদীস দেখুন – তাহাজ্জুদ আর কিয়ামুল লাইল আসলে একই সালাতঃ
উম্মুল মুমিনীন আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এক রাতে মসজিদে সালাত আদায় করছিলেন, কিছু লোক তাঁর সঙ্গে সালাত আদায় করলো। পরবর্তী রাতেও তিনি সালাত আদায় করলেন এবং লোক আরো বেড়ে গেল। এরপর তৃতীয় কিংবা চতুর্থ রাতে লোকজন সমবেত হলেন, কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) বের হলেন না। সকাল হলে তিনি বললেনঃ তোমাদের কার্যকলাপ আমি লক্ষ্য করেছি। তোমাদের কাছে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে শুধু এ আশংকাই আমাকে বাধা দিয়েছে যে, তোমাদের উপর তা ফরয হয়ে যাবে। আর ঘটনাটি ছিল রামাযান মাসের (তারাবীহ্র সালাতের)।
সহিহ বুখারী, খন্ড ২, অধ্যায় ২১, হাদিস ২২৯।

উপরের হাদীসটা ইমাম বুখরী (রহঃ) যেই অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন তার নাম হচ্ছেঃ- “তাহাজ্জুদ বা রাতের স্বলাত অধ্যায়।. লক্ষ্যণীয় এই তাহাজ্জুদ সালাতের কথা বলা হচ্ছে, হাদীসে শেষে উল্লেখ করা আছে – এই ঘটনা রমযান মাসে। সুতরাং সাহাবা ও মুহাদ্দিসিন ইকরাম যারা সাহাবাদের কাছ থেকে আমাদের কাছে হাদীসগুলো পৌছে দিয়েছেন তাদের কাছে - তারাবীহ, তাহাজ্জুদ, কিয়ামুল লাইল, বিতির – এইসবগুলো নামায আসলে এক বলেই স্বীকৃত। যদিও আমাদের দেশের মানুষ মনে করে তাহাজ্জুদ আলাদা আর তারাবীহর নামায আলাদা!

এবার দেখি রাসুল (সাঃ) কত রাকাত তারাবীহ পড়তেনঃ
আবূ সালামা ইবন আব্দুর রাহমান (রহঃ), একজন তাবেয়ী) থেকে বর্ণিত। তিনি আায়িশাহ (রাঃ) কে জিজ্ঞাসা করেন যে, রমযানে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর (রাতের) সালাত কিরূপ ছিল? তিনি বললেন, “রমযান মাসে ও রমযান ছাড়া অন্য সময়ে (রাতে) তিনি এগারো রাকআত হতে বেশি পড়তেন না। তিনি চার রাকআত সালাত আদায় করতেন, সে চার রাকআতের সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্য ছিল প্রশ্নাতীত। এরপর চার রাকআত সালাত আদায় করতেন, সে চার রাকআতের সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্য ছিল প্রশ্নাতীত। এরপর তিন রাকআত সালাত আদায় করতেন। আমি (আয়িশাহ (রাঃ)) বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি বিতর আদায়ের আগে ঘুমিয়ে যাবেন? তিনি বললেনঃ হে আয়িশাহ! আমার দুইচোখ ঘুমায় বটে কিন্তু ,আমার অন্তর ঘুমায় না।
সহিহ বুখারী, খন্ড ৩, অধ্যায় ৩২, হাদিস ২৩০।

উপরের হাদীসটা ইমাম বুখরী (রহঃ) সাওম অধ্যায়ের পরে যেই অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন তার নাম হচ্ছেঃ- “রাতের স্বলাত (তারাবিহ) অধ্যায়

সুতরাং দেখা যাচ্ছে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমযান মাসে ৪ রাকাত, ৪ রাকাত মোট ৮ রাকাত নামায পড়তেন এবং এই ৮ রাকাত হতো অনেক দীর্ঘ ও সুন্দর যার প্রশংসা মা আ'ইয়িশাহ (রাঃ) করেছেন। এই ৮ রাকাতের পরে তিনি বিতির হিসেবে ৩ রাকাত পড়তেন।

সুতরাং, দেখা যাচ্ছে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ৮ রাকাত ও শেষে বিতির হিসেবে ৩ রাকাত এই মোট ১১ রাকাত তারাবীহর নামায পড়তেন।

তাই আমাদের জন্য ‘সুন্নাহ হচ্ছেঃ- ৮+৩=১১ রাকাত বিতির পড়া।

তবে, তারাবীহর নামায এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কেউ ইচ্ছা করলে এর বেশি বা কম পড়তে পারবেন – যেই হাদীসে রাসুলুল্লাহ সাঃ ২+২ করে পড়তে বলেছেন সেখানে তিনি রাকাত অনির্দিষ্টভাবে ছেড়ে দিয়েছেন। সুতরাং কেউ ইচ্ছা করলে ১১র বেশি বা কম যেকোন রাকাতই পড়তে পারবেন। এখানে রাকাতের কোয়ান্টিটি (সংখ্যা) থেকে কোয়ালিটি (গুণ) প্রাধান্য পাবে। অর্থাৎ, কেউ যদি তাড়াহুড়া করে ২০ রাকাত পড়ে তার থেকে বেশি সওয়াব সে পাবে, যে আস্তে ধীরে বেশি কেরাত পড়ে ঐ ২০ রাকাতের চেয়ে বেশি সময় ধরে ৮ রাকাত নামায পড়বে। আবার কেউ যদি ২০ রাকাত পড়ে যথাযথ নিয়ম মেনে, সে তার থেকে সওয়াব বেশি পাবে যে ৮ রাকাত পড়েছে ঠিকমতোই কিন্তু মোট সময় বা কেরাতের দিক থেকে ২০ রাকাতের চেয়ে কম সময় নামায পড়েছে।

বর্তমানে প্রচলিত ২০ রাকাত কোত্থেকে আসলো?
রাসুল (সাঃ) জীবনে কোনদিন ১১ রাকাতের বেশি পড়েন নি – এই কথা সহীহ হাদীস দিয়ে প্রমানিত যা উপরে বর্ণিত হয়েছে। এর বিপরীতে ইবেন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত এক হাদীস তাবারানি, বায়হাকীতে আছে যেখানে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সাঃ ২০ রাকাত বিতির পড়েছেন। কিন্তু মুহাদ্দিসিন যারা হাদীস বর্ণনা করেছেন তার নিজেরাই বলেছেন, এই হাদীস সহীহ নয় – আর সহীহ হাদীসে এর বিপরীত ১১ রাকাত আছে – তাই মুহাদ্দিসিন ইকরামরা এই হাদীসকে বাতিল বলেছেন। কারণ, সহীহ হাদীসের বিপরীতে জয়ীফ হাদীস কোনদিন গ্রহণযোগ্য নয়।

আর ইমাম মালিক এর মুয়াত্তা গ্রন্থে আছেঃ
উমার (রাঃ) খলিফা হওয়ার পর জামাতে তারাবীহ পড়া পুনঃপ্রবর্তন করেন – কিন্তু মুয়াত্তাতে উমার (রাঃ) কত রাকাত তারাবীহ পড়তে আদেশ দিয়েছে সেই সম্পর্কে ২ টা হাদীস আছে ২ রকম রাকাত বর্ণিত হয়েছেঃ
-  প্রথম হাদীসে আছে ১১ রাকাত
-  দ্বিতীয় হাদীসে আছে ২৩ রাকাত

১ম হাদীসটা সহীহ, আর বুখারীতের হাদীসে রাসুল (সাঃ) ১১ রাকাত তারাবীহ পড়েছেন এই বর্ণনাই আছে। কিন্তু, ২৩ রাকাত (২০+৩) যেটা বলা হচ্ছে উমার (রাঃ) চালু করেছিলেন – এই হাদীসটা হচ্ছে মুনকাতি – অর্থাৎ এর সনদ বিচ্ছিন্ন। এইধরণের হাদীসগুলো জয়ীফ। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে সহীহ হাদীস দিয়ে প্রমানিত হয় – উমার (রাঃ) ২০ রাকাত নয় বরং, ১১ রাকাত তারাবীহ পড়তেই আদেশ দিয়েছিলেন – আর এই রাকাত সংখ্যাই রাসুল সাঃ এর কাছ থেকে প্রমানিত। এছাড়া, রাসুল (সাঃ) ২০ রাকাত তারাবীহ পড়েছেন অথবা উমার (রাঃ) ২০ রাকাত পড়েছেন – এর পক্ষে কোন সহীহ হাদীস নেই। হাদীসের ব্যপারে সবচাইতে বড় ইমামদের একজন, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহঃ ও একই কথা উল্লেখ করেছেন।

আমরা কয় রাকাত পড়বো?
আগেই বলা হয়েছে, তারাবীহ হচ্ছে সুন্নত, ফরয নয়। তাই সবাই সবার সামর্থ্য অনুযায়ী পড়বেন। ১১ রাকাত পড়তেই হবে, বা ২০ রাকাত পড়তেই হবে এমন কোন ধরাবাধা নিয়ম নেই। তবে হ্যা, কেউ চাইলে রাসুল (সাঃ) অনুসরণ করে ১১ রাকাত পড়তে পারেন এটা করা ভালো। কিন্তু যারা একাকী পড়বেন ১১র বাইরে অন্য কোন রাকাত সংখ্যা নির্দিষ্ট না করে পড়াই ভালো, যতটুকু সামর্থ হয় ততটুকু পড়বেন।

পড়ার নিয়ম হচ্ছেঃ
তারাবীহর নামায সুন্নত, এটা এশার পর থেকে ফযরের পূর্ব পর্যন্ত যেকোন সময়েই পড়া যায়। জামাতে যদি আস্তে ধীরে নিয়ম মেনে সুন্দরভাবে পড়ানো হয় তাহলে জামাতে পড়াই ভালো। জামাতে ৮ পড়ালে ৮ পড়বেন, ২০ পড়ালে পুরো ২০ পড়ার চেষ্টা করবেন। কারণ, ইমামের সাথে শেষ পর্যন্ত নামায পড়ার ফযীলত হচ্ছে – তাহলে সে সারারাত নফল নামায পড়ার সওয়াব পাবে। আর যদি ইমাম তাড়াহুড়া করে নামাযকে নষ্ট করে, তাহলে তার সাথে না পড়ে একাকী যতটুকু সম্ভব পড়বেন।


২ রাকাত ২রাকাত করে তারাবীহর নামাযের নিয়তে নামায পড়বেন। প্রতি রাকাতে চেষ্টা করবেন বেশি করে কেরাত পড়ার জন্য, বড় সুরা না পারলে ছোটছোট ২-৩টা বা আরো বেশি সুরা একসাথে পড়তে পারবেন। তবে ১ম রাকাতের চেয়ে ২য় রাকাতে কম আয়াত তেলাওয়াত করবেন। এইভাবে যত রাকাত সম্ভব পড়বেন, যদি রাসুল সাঃ এর সুন্নাহ হিসেবে ৮/১০ পড়েন তাহলে উত্তম। এর পরে ৩ অথবা ১ (৮ পড়লে ৩ অথবা ১০ পড়লে ১ রাকাত) বিতির পড়ে নামায শেষ করবেন।  

প্রসংগঃ যাদু ‘কুফুরী’ ও যাদুকরের শাস্তি ‘কতল’



প্রসংগঃ যাদু ‘কুফুরী ও যাদুকরের শাস্তি ‘কতল

অনেকে অভিযোগ করেছেন, দেশের সিলেট চিটাগাং ও ভারতের আসামসহ বাঙ্গালী অধুষ্যিত কিছু প্রদেশে যাদুকরের ফেতনা খুব বেশি। এইজন্য যাদু কিরকম বড় পাপ ও এর শাস্তি কি সে সম্পর্কে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলো।

সবচাইতে বড় কুফুরী কাজগুলোর মাঝে একটি হচ্ছে যাদু। যাদু কুফুরী কাজের কথা ক্বুরানুল কারীমে বলা হয়েছেঃ

তারা ঐ শাস্ত্রের অনুসরণ করল, যা সুলায়মানের রাজত্ব কালে শয়তানরা আবৃত্তি করত। সুলায়মান কুফর করেনি; বরং শয়তানরাই কুফুরী করেছিল। তারা মানুষদেরকে জাদুবিদ্যা এবং বাবেল শহরে হারুত ও মারুত দুই ফেরেশতার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছিল, তা শিক্ষা দিত। তারা উভয়ই (হারুত-মারুত ফেরেশতারা) একথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিত না যে, আমরা পরীক্ষার জন্য; কাজেই তুমি কাফের হয়ো না। অতঃপর তারা তাদের কাছ থেকে এমন জাদু শিখত, যার দ্বারা স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। তারা আল্লাহর আদেশ ছাড়া তদ্দ্বারা কারও অনিষ্ট করতে পারত না। যা তাদের ক্ষতি করে এবং উপকার না করে, তারা তাই শিখে। তারা ভালরূপে জানে যে, যে কেউ জাদু অবলম্বন করে, তার জন্য পরকালে কোন অংশ নেই। যার বিনিময়ে তারা আত্নবিক্রয় করেছে, তা খুবই মন্দ যদি তারা জানত।
বাক্বারাহঃ ১০২।।

যাদুকরের কুফুরী, শিরক ও মানুষদের মাঝে ফেতনা সৃষ্টি করার শাস্তি কি সে সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ

যাদুকরের শাস্তি হচ্ছে তলোয়ারের আঘাতে তার গর্দান উড়িয়ে দেয়া (অর্থাৎ, মৃত্যুদণ্ড)।

তিরমিযীঃ ১৪৬।

‘সাওম’ বা রোযা সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করুন

‘সাওম’ বা রোযা সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করুনঃ

১. অনেকে সারা বছর সালাত আদায় করেন না, কিন্তু রমযান মাসে সবাই রোযা রাখেন তারাও সবার দেখাদেখি বা লোক দেখানো না খেয়ে থাকেন – কিন্তু রোযার মাসেও তারা সালাত আদায় করেন নাহ!
ক্বুরান, সহীহ হাদীস ও বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী – বেনামাযী মুসলিম নয়, বেনামাযী কাফের। আর কাফেরদের কোন নেক আমল আল্লাহ কবুল করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে ‘ঈমান’ আনে। তাই এই সমস্ত ভাইদের উচিত, সালাত ত্যাগ করার ‘কুফুরী’ থেকে তোওবা করে ‘ঈমান’ এনে, সালাত আদায় করেই সিয়াম পালন করা। আর ‘ঈমান’ এনে থাকলে, পরকালের প্রতি বিশ্বাস থাকলে, একজন বান্দা অবশ্যই রোযার মধ্যে এবং রোযার বাইরে কখনোই ইচ্ছাকৃতভাবে সালাত ত্যাগ করবে না।

২. অনেকে মনে করেন, তারাবীহ না পড়লে রোযা কবুল হবেনা বা রোযা হবেনা। এটা মারাত্মক রকমের একটা ভুল কথা। রোযা হচ্ছে ফরয এবং ইসলামের ৫টি রোকনের একটি, আর তারাবীহ হচ্ছে ‘সুন্নত’ সালাত। সুন্নত সালাত কেউ যদি আদায় করে সে এর সওয়াব পাবে, না করলে এর সওয়াব ও ফযীলত থেকে বঞ্চিত হবে – কিন্তু তাকে গুনাহগার বলা যাবেনা। আর রোযা হচ্ছে সুবহি সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার হুকুম আহকামগুলো পালন করার নাম – ইফতারের পরে রোযা পূর্ণ হয়ে যায়। তারাবীহ পড়ার সাথে রোযা কবুল হবে কি হবেনা – এরকম কোন সম্পর্ক নেই।

৩. অনেকে মনে করে সাহরী না খেলে রোযা রাখা যাবেনা – একথা ঠিকনা। সাহরী খাওয়া হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ একটা সুন্নত। কিন্তু ঘুমের কারণে উঠতে না পারলে সে কারণে রোযা ভংগ করা যাবেনা। সাহরী না খেয়েই রোযা রাখতে হবে। তবে না খেয়ে রোযা রাখতে গিয়ে কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন বা এমন কষ্টের সম্মুখীন হন যে, রোযা রাখা সম্ভব হচ্ছেনা – তখন তিনি রোযা ভেঙ্গে খেতে পারবেন –এরজন্য পরে ঐ রোযার জন্য একটা কাজা রোযা রেখে নিতে হবে।

৪. অনেকে রোযা রেখে সময় কাটেনা দেখে ঘুমিয়ে সময় কাটায়, এমনও আছে কেউ টিভি দেখে, গান শুনে, ফালতু গল্প করে সময় নষ্ট করে, গিবত করে, মিথ্যা কথা বলে বেড়ায় – নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক! এটা মারাত্মক ভুল ও রোযার উদ্দেশ্য তাক্বওয়া অর্জন করা – এর সম্পূর্ণ বিপরীত। কিছু সময় বিশ্রাম নিতে পারে, বা যোহরের পর ‘ক্বায়লুলা’ বা দিবানিদ্রা করতে পারে যাতে করে রাত জেগে সালাত আদায় করতে পারে। কিন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা ঘুমিয়ে কাটানো ভুল। রোযার সময়টাতে উচিত হচ্ছে ক্বুরান তেলাওয়াত করা, যিকর-আযকার করা, বেশি বেশি করে দুয়া করা, ক্বুরান ও সহীহ হাদীসের বই পড়া, রোযা সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান অর্জন করে তার হক্ক আদায় করতে সচেষ্ট হওয়া, ওয়াজ লেকচার শোনা বা জ্ঞান অর্জন করা। আর গান বাজনা শুনে, টিভি দেখে, হারাম কাজ কর্মে যারা লিপ্ত থাকে – আল্লাহ বলেছেন এরা পানাহার করুক আর না খেয়ে থাকুক – তাতে কোন পার্থক্য থাকলোনা।

৫. রোযার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ‘তাক্বওয়া’ বা আল্লাহভীতি অর্জন করা, যদিও অনেকে মনে করে গরীবদের কষ্ট বোঝার জন্য এই রোযা – যা সম্পূর্ণ ভুল। তারপরেও এই মাসে দেখা যায় – দাড়ি চাছা ভাইয়েরা শেইভ করছে, অনেকের প্যান্ট টাখনুর নিচেই আছে, গান বাজনা ছাড়তে পারছেনা, টিভির সর্বনাশা নেশাতেই ডুবে আছে, নারী-পুরুষ অবৈধ সম্পর্ক ছেড়ে তোওবা করছেনা, বেপর্দা মেয়েরা হিজাব পর্দা শিখতে পারছেনা, রোযার দিনে বেহায়াপনা ও অর্ধনগ্ন ড্রেস পড়ে মার্কেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে, স্কুল কলেজ, অফিসে নারী পুরুষ ফ্রী মিক্সিং এর জঘন্য কালচারে লিপ্ত – যদিও তারা রোযার উদ্দেশ্যে না খেয়ে আছেন? আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, রোযার মাসে কতটুকু আল্লাহ ভীতি ও নৈকট্য অর্জন করতে পারছি। শুধু না খেয়ে থাকার নাম রোযা নয় – বরং আল্লাহর হুকুম আহকাম পালন করে জাহান্নাম থেকে বেচে জান্নাতে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করার নাম হচ্ছে রোযা। আর এই কাজগুলো যে করতে না পারলো – রোযার মাস পেয়েও নিজের সংশোধন করে রমযানকে নাজাতের উসীলা বানাতে না পারলো – জিব্রাঈল (আঃ) তার ধ্বংসের জন্য বদদুয়া করেছেন – আর রাসুল (সাঃ), যাকে স্বয়ং আল্লাহ জগতবাসীর জন্যে রহমত বলেছেন – তিনিও এই বদদুয়ায় ‘আমীন’ বলে সমর্থন জানিয়েছেন। তাহলে, একটু চিন্তা করুন – রোযার মাস পেয়েও সংশোধন করতে না পারাটা কতবড় দুর্ভাগ্যের একটি বিষয়।

৬. সবচাইতে নিকৃষ্ট কাজটা বোধহয় হচ্ছে – অনেকে মনে করে ‘ইবাদত শুধুমাত্র রমযান মাসেই সীমাবদ্ধ’।
রোযার মাসে ৫ ওয়াক্ত নামায পড়ে, এতো কষ্ট করে তারাবীহও পড়ে, কিন্তু রোযার মাস শেষ হতে না হতেই – এই বান্দারা মসজিদ থেকে গায়েব হয়ে যায়। এরা আসলে আল্লাহর উপাসনা করেনা, এরা হচ্ছে রমযান পূজারী। রমযান আসলে ইবাদত করবে, রমযান শেষতো তাদের ইবাদতও শেষ। অথচ, আল্লাহ তাআ’লা নবী করীম (সাঃ) কে সেই সত্ত্বার উপর ভরসা করতে বলেছেন – যিনি চিরজীবি, যিনি কখনোই মৃত্যু বরণ করেন না। এছাড়া তিনি আযযা ওয়া যাল তার বান্দাদেরকে আদেশ করেছেন ‘ইয়াক্বীন’ নামক মৃত্যু চলে আসা পর্যন্ত তাদের রব্বের ইবাদত করার জন্য। তাই প্রিয় দ্বীনি ভাই ও বোনেরা, যেটা হারাম সেটা যেমন রমযান মাসে হারাম, যিনি হারাম করেছেন সেই মহান সত্ত্বা আল্লাহ তিনি রমযানের পরেও চিরদিন জীবিত থাকবেন – তাই তার নিষিদ্ধ জিনিস রমযানের বাইরেও চালু থাকবে। সুতরাং, দাড়ি কাটা, গান শোনা, টিভি দেখা, নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক রাখা, অশ্লীলতা, সুদ, ঘুষ, যিনা-ব্যভিচার, মিথ্যা ও গীবত – এইগুলো রমযানের ভেতরে বাইরে সব সময়েই বর্জন করতে হবে – আল্লাহ আমাদের সকলকেই সেই তোওফিক দান করুন – আমিন।


৭. অনেক মা বোনেরা ঋতুর দিনগুলোতেও না খেয়ে থাকেন। এটা ভুল, কারণ ঐদিনে তাদের রোযা রাখা হারাম, তাই তারা শরয়ী কারনেই রোযা ভংগ করছেন। সুতরাং তারা স্বাভাবিক পানাহার করতে পারবেন, রোযার দিনের বেলাতে না খেয়ে থাকা তাদের জন্য ‘ফরয’ নয়। অনুরূপ যারা অসুস্থতা, সফর, বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো, গর্ভবতী, এমন যারা উপযুক্ত কারণে রোযা ভংগ করেন, তারা দিনের বেলায় পানাহার করতে পারবেন। তবে উত্তম হচ্ছে প্রকাশ্যে পানাহার না করে গোপনে করা, যাতে করে কেউ দেখে না জেনে আপনার সম্পর্কে খারাপ ধারণা না করে।