বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০১৫

‘আইয়ামে বীয’ এর রোজাঃ

আইয়ামে বীয এর রোজাঃ
হিজরী বা চাঁদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আজ মাগরিবের পর থেকে ১৪৩৭ হিজরী সনের সফর মাসের ১৩ তারিখ শুরু হলো। সুতরাং, যারা আইয়ামে বীজ-এর রোজা রাখতে চান, তারা আজ থেকে সাহরী খেয়ে ইন শা আল্লাহ আগামীকাল থেকে বৃহস্পতি, শুক্র ও শনিবার এই মোট তিন দিন রোজা থাকবেন। ঢাকায় আজকে সাহরীর শেষ সময়ঃ ৫:০০ মিনিট এবং আগামীকাল ইফতার শুরুঃ ৫:১১ মিনিটে।
________________________
প্রশ্নঃ আইয়ামে বীয কি?
উত্তরঃ চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫, এই দিনগুলোকে আইয়ামে বীয বা আলোকিত দিনসমূহ বলা হয়। কারণ এই দিনগুলোতে চাঁদ সবচাইতে বেশি আলোকিত থাকে।
________________________
প্রশ্নঃ আইয়ামে বীয এর দিনগুলোর বিশেষ ফযীলত কি?
উত্তরঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাসের এই তিনদিন নিয়মিত রোযা রাখতেন। তাই মাসের ৩টা রোযার জন্য এই ৩ দিনকে বেছে নিলে ভালো।
(১) আবু দরদা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমার প্রিয় বন্ধু (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে এমন তিনটি কাজের অসিয়ত করেছেন, যা আমি যতদিন বেঁচে থাকব, কখনোই ত্যাগ করব না। সেগুলো হচ্ছে, প্রতি মাসে তিনটি করে রোযা (আইয়ামে বীজ এর ৩দিন) পালন করা, চাশতের নামায পড়া এবং বিতির না পড়ে ঘুমাতে না যাওয়া।
সহীহ মুসলিমঃ ৭২২, আবু দাউদঃ ১৪৩৩, আহমাদঃ ২৬৯৩৫।
(২) আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, প্রত্যেক মাসে (নফল) রোযা পালন করলে (শুক্লপক্ষের) ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে পালন করো।
তিরমিযীঃ ৭৬১, নাসায়ীঃ ২৪২৪, শায়খ আলবানীর মতে হাসান সহীহ, তাহকীক রিয়াদুস সালেহীন।
(৩) ক্বাতাদাহ ইবনে মিলহান রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে শুক্লপক্ষের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোযা রাখার জন্য আদেশ করতেন।
আবু দাউদঃ ২৪৪৯, নাসায়ীঃ ২৪৩২।
(৪) আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাড়ীতে থাকাবস্থায় অথবা সফরে থাকাবস্থায়, কখনোই আইয়ামে বীযের রোযা ছাড়তেন না।
নাসায়ী ২৩৪৫, শায়খ আলবানীর মতে হাসান সহীহ, তাহকীক রিয়াদুস সালেহীন।
________________________
প্রত্যেক মাসে তিনটি করে রোযা রাখার ফযীলতঃ
প্রত্যেক মাসে ৩টা করে রোযা রাখলে সারা বছর নফল রোযা রাখার সমান পাওয়া যায়, সুবহানাল্লাহ! কারণ, আল্লাহ যেকোনো ভালো কাজের প্রতিদান অন্তত ১০ থেকে ৭০০ গুণ, বা তাঁর রহমত অনুযায়ী চাইলে আরো অনেক বেশি দান করেন। ৩*১০=৩০, এইভাবে প্রত্যেক মাসে ৩টি রোযা রাখলে সারা বছরই নফল রোযা রাখার সমান সওয়াব পাওয়া যাবে, ইন শা আল্লাহ।
ব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রতি মাসে তিনটি করে রোযা রাখা, সারা বছর ধরে রোযা রাখার সমান।
সহীহুল বুখারীঃ ১১৫৯, ১৯৭৫।
***উল্লেখ্য কোনো কারণে আইয়ায়মে বীজ-এর এই ৩ দিন রোযা রাখতে না পারলে, মাসের অন্য যেকোনো ৩দিন রাখলেও সারা বছর রোযা রাখার এই ফযীলত পাওয়া যাবে।
________________________
উল্লেখ্য, আগামীকাল বৃহস্পতিবার, সুতরাং যারা আগামীকাল রোযা থাকবেন তারা বৃহস্পতিবার রোযা রাখা সুন্নত, অন্তরে অতিরিক্ত সেই নিয়তও করে রাখবেন। এইভাবে নিয়তের দ্বারা একদিন রোজা রেখে দুইটি সুন্নতের উপর আমল করার দ্বিগুণ সওয়াব পাওয়া যাবে ইন শা আল্লাহ। আর যাদের কাজা রোজা বাকী আছে, তারা সাহরীর ওয়াক্ত শেষ হওয়ার পূর্বেই ফরজ কাজা এই নিয়ত করে নেবেন। কারণ, ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার পূর্বেই ফরজ রোজার নিয়ত না করলে সেটা ফরজ বলে গণ্য হবেনা, নফল রোজা হিসেবে গণ্য হবে।  
________________________
#আনসারুস সুন্নাহ।

মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৫

মৃত্যুর কথা স্বরণ করুন

(১) ইব্রাহীম ইবনে বাশার (রহঃ) বলেন, “যে আয়াত পাঠ করতে গিয়ে আলী ইবনে ফুজাইল (রহঃ) ইন্তেকাল করেন, তা হলোঃ
“আপনি যদি দেখতেন যখন তাদেরকে জাহান্নামের কিনারায় দাড় করানো হবে, তখন তারা বলবে, হায়! যদি আমাদেরকে দুনিয়ায় আবার ফেরত পাঠানো হতো।” [সুরা আল-আনয়া’মঃ ২৭]
ক্বুরান তেলাওয়াত করতে করতে তিনি এই আয়াতের এখানে এসে থমকে দাড়ান ও মৃত্যুবরণ করেন। আমি তার জানাযায় অংশগ্রহণ করেছিলাম।”
সিয়ারু আআলামিন নুবালাঃ ৮/৪৪৬। 
(২) হাসান বসরী (রহঃ) একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে গেলেন। তিনি গিয়ে দেখেন সে মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করছে। তিনি তার কষ্ট ও যাতনা দেখে যখন বাড়ি ফিরে আসেন তখন তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে যায়। বাড়ি ফিরে এলে পরিবারের লোকজন বলে, আসুন খাবার খেয়ে নিন। তিনি বললেন, তোমরা খানাপিনা কর। আল্লাহ কসম! আজকে যে মৃত্যুর কষ্ট দেখলাম , এর জন্যই এখন থেকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত কাজ করে যাব।”
তাযকিরাঃ পৃষ্ঠা ১৭।

রবিবার, ২২ নভেম্বর, ২০১৫

পরকালের ধনী

পরকালের ধনীঃ
এই পৃথিবীতে ৩টি শ্রেষ্ঠ সম্পদ, যা আপনাকে পরকালে ধনী বানিয়ে দেব, আর তা হচ্ছে -
(১) সর্বদা আল্লাহর যিকিরকারী সিক্ত জিহবা,
(২) অল্পতেই তুষ্ট এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞশীল অন্তর এবং
(৩) দ্বীনের ব্যপারে সাহায্যকারী মুমিনা স্ত্রী।
সুতরাং, দ্বীনি ভাই ও বোনেরা! বর্তমান সময়ে যখন ফিতনা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বেশিরভাগ মানুষই দ্বীন থেকে সরে যাচ্ছে, আপনারা অবসর সময়েক হারাম অথবা বেহুদা কাজের পেছনে নষ্ট না করে পরকালের জীবনে স্বচ্ছলতার জন্যে সুন্নাহ সম্মত যিকিরগুলো শিখে নিন এবং সর্বাদাই আল্লাহকে স্বরণ করার চেষ্টা করুন। ঈমানের ষষ্ঠ রুকন তাক্বদীর সম্পর্কে জানুন, এবং তাক্বদীরের প্রতি বিশ্বাসকে মজবুত করুন। বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র/পাত্রী নির্বাচনে সম্পদ, সৌন্দর্য, চাকুরী, বংশ কিংবা দুনিয়াবী শিক্ষা নয় বরং দ্বীনদারিতা, চরিত্র, দ্বীনি শিক্ষাকে প্রাধান্য দিন। আল্লাহ আমাদেরকে সফলতা দান করুন, আমিন।
উতসঃ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর তিনটি সহীহ হাদীসের আলোকে।

শনিবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৫

বর্তমান সময়ে মুসলিম উম্মাহর দুর্দশা নিয়ে শায়খ ফাউজানের গুরুত্বপূর্ণ ফতোয়া

প্রশ্নকর্তাঃ ইয়া শায়খ! আল্লাহ আপনাকে হেফাজত করুন। বর্তমান সময়ে ফিতনা (পরীক্ষা, আল্লাহর আযাব-গজব কিংবা দুঃখ-দুর্দশা) যা সারা পৃথিবীব্যাপী মুসলিমদেরকে স্পর্শ করেছে, সে ব্যপারে আপনার কি উপদেশ রয়েছে? এ ব্যপারে একজন তালিবুল ইলম (দ্বীন শিক্ষার্থীর) কি ভূমিকা কেমন হওয়া উচিৎ?
উত্তরঃ মুসলিমদের উপর আপতিত এই ধরণের বিপর্যয়কর ফিতনাহ আরো বেশি করে আসবে, এইগুলো বন্ধ হবেনা, বরং তা আরো বেশি করে আসবে, যদিনা মুসলিমরা তাদের দ্বীনে ফিরে, যদি না মুসলিমরা সঠিকভাবে দ্বীনের অনুসরণ করে। মুসলিমরা যদি দ্বীনে ফিরে না আসে, তাহলে (এ ধরণের বিপর্যয়কর) ঘটনাগুলো আরো বেড়ে যাবে এবং ইসলামের শত্রুদেরকে আল্লাহ মুসলিমদের উপর ক্ষমতাসীন করে দেবেন।
হে মুসলিম ভাইয়েরা! একটু চিন্তা করে দেখুন  
যখন উহুদ যুদ্ধের সময় কিছু সংখ্যক সাহাবী ভুল করেছিলেন, অল্প কয়েকজন সাহাবীর একটি মাত্র ভুল! রাসুলু্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (৫০ জন তীরন্দাজ মুজাহিদকে) উহুদ পাহাড়ের উপরে থাকতে আদেশ করেছিলেন, যাতে করে কাফের বাহিনী পেছন দিক থেকে মুসলিমদের উপর আক্রমন করতে না পারে, সেইজন্যে তারা পেছন দিক থেকে মুসলিমদেরকে গার্ড দেবে। যখন (উহুদ) যুদ্ধ শুরু হলো, তখন প্রাথমিকভাবে মুসলিমরা বিজয়ী হলো, সুতরাং তারা গনীমত (যুদ্ধে লব্দ কাফিরদের সম্পদ) সংগ্রহ করতে শুরু করলো। রাসুলু্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তীরন্দাজ বাহিনীকে আদেশ করে বলেছিলেন, সাবধান! যুদ্ধে আমাদের জয় কিংবা পরাজয় যাই হোকনা কেনো, তোমরা কিছুতেই পাহাড় ছেড়ে নামবেনা। এমনকি আমরা যদি আহত হই, তবুও আমাদেরকে সাহায্য করার জন্যে তোমরা পাহাড় থেকে নামবেনা।   
কিন্তু পাহাড়ের উপর নিযুক্ত তীরন্দাজ মুসলিম বাহিনী যখন দেখলো যে, মুসলিমরা গনীমতের সম্পদ সংগ্রহ করছে, তারা মনে করলো যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। তাই তাদের মধ্য থেকে কেউ কেউ বললো, চলো আমরা নিচে নেমে যাই এবং আমাদের ভাইদেরকে গনীমত সংগ্রহ করতে সাহায্য করি।
তাদের দলের অধিনায়ক (আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়ের ইবনু নুমান আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, আমরা যুদ্ধে জিতি কিংবা হারি, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি আমাদেরকে পাহাড় ছেড়ে যেতে নিষেধ করেন নি?
কিন্তু তারা তাদের অধিনায়কের কথা শুনলোনা, বরং তারা পাহাড় থেকে নিচে নেমে গেলো। শুধুমাত্র তাদের দলের অধিনায়ক এবং অল্প কয়েকজন (নয়জন) সাহাবী পাহাড়ের উপরে গার্ড দেওয়ার জন্যে থাকলেন, শেষে তাঁরা কাফিরদের সাথে যুদ্ধ করে শহীন হন, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন।
মুশরিকরা এই সুযোগ গ্রহণ করলো এবং পাহাড়ের উপরে উঠে পেছন দিক থেকে মুসলিমদের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করলো। মুসলিমরা এটা বুঝতে পারেনি, কারণ তারা মনে করছিলো তাদের পেছন দিকে গার্ড রয়েছে। যার ফলে কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই কাফিররা সামনে ও পেছনে, দুই দিক থেকেই মুসলিমদেরকে ঘিরে ফেললো। 
যুদ্ধ আবার শুরু হলো এবং একটি মাত্র ভুলের কারণে অল্প সময়ের মাঝে মুসলিম বাহিনীর কিছু মানুষ নিহত হলো এবং কিছু আহত হলো। নিহত সাহাবীদের মাঝে ছিলেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর অত্যন্ত প্রিয় চাচা, হামযা বিন আব্দুল মুত্তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু। তাঁর মৃত্যুর কারণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেইভাবে কেঁদেছিলেন, অন্য কারো মৃত্যুর জন্যে এইভাবে কখনো কান্না করেন নি। প্রসিদ্ধ সাহাবী  হানযালা রাদিয়াল্লাহু আনহু এই যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন, যার গোসল করিয়েছিলেন আল্লাহর ফেরেশতারা।
প্রকৃতপক্ষে এই যুদ্ধে আহত ও নিহতদের দৃশ্য ছিলো অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এমনকি স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও এই যুদ্ধে আহত হয়েছিলেন। কারণ যখন আল্লাহর আযাব আসে, তখন সালেহ (নেককার) ও ফাসেক্ব (পাপী), সকলকেই তা স্পর্শ করে। আল্লাহ তাআলা এই ব্যপারে সতর্ক করে বলেন,
আর তোমরা সেই ফিতনাহকে ভয় করো, যা তোমাদের মধ্যে যারা জালেম, শুধুমাত্র তাদেরকেই স্পর্শ করবে না (বরং নেককার কিংবা পাপী, সকলকে তা স্পর্শ করবে)। আর জেনে রেখ যে, আল্লাহর আযাব অত্যন্ত কঠোর। [সুরা আনফালঃ আয়াত ২৫]
উহুদের যুদ্ধে তীরন্দাজ বাহিনী কর্তৃক নবীর আদেশ অমান্য করার ফলে আল্লাহর আযাব এমনকি আল্লাহর নবীকেও স্পর্শ করেছিলো। কয়েকজন সাহাবীর শাহাদাত হওয়া, কয়েকজনের আহত হওয়ার পাশাপাশি অরক্ষিত অবস্থায় কাফেরদের সম্মিলিত আক্রমনের ফলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবন হানির মতো অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিলো। তাঁকে হত্যার জন্যে কাফেররা তলোয়ার দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করে, যার ফলে তাঁর মাথার হেলমেট চূর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। কাফেরদের আক্রমনের ফলে তাঁর সামনের একটি দাঁতও ভেঙ্গে গিয়েছিলো। তিনি গালে আঘাতপ্রাপ্ত হন, যার ফলে অনেক রক্তপাত হয়। এ সবই শুধুমাত্র নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একটিমাত্র আদেশের বিরোধীতা করার কারণে হয়েছিলো।
এই ঘটনা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেছিলেন,
আর আল্লাহ সেই ওয়াদাকে সত্যে পরিণত করেছেন, যখন তোমরা তাঁরই নির্দেশে শত্রুদেরকে হত্যা করছিলে। (যতক্ষণ পর্যন্ত না) তোমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছিলে ও কর্তব্য স্থির করার ব্যাপারে তর্কে লিপ্ত হয়েছিলে। আর যা তোমরা ভালোবাসো, তা দেখার পর (তোমাদের কেউ কেউ) কৃতঘ্নতা প্রদর্শন করেছিলো। তখন তোমাদের কেউ দুনিয়া কামনা করছিলো, আর কেউ কামনা করছিলো আখেরাত। অতঃপর, তোমাদেরকে সরিয়ে দিলেন ওদের উপর থেকে (অর্থাৎ তোমরা পরাজিত হলে), যাতে করে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করেন। প্রকৃতপক্ষে, তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। আর আল্লাহর মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত অনুগ্রহশীল। [সুরা আলে-ইমরানঃ ১৫২]
যাই হোক, আল্লাহ তাদেরকে এই বলে নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন, তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছেন সুতরাং, ভবিষ্যতে তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন না।
উহুদের যুদ্ধের উদাহরণ দ্বারা এটা স্পষ্টভাবে প্রমানিত হয় যে, এমনকি মানুষের মাঝে যারা শ্রেষ্ঠ, তারাও যদি কোন ভুল করে, তাহলে তাদের উপরেও আল্লাহর আযাব আসতে পারে। তাহলে এখন কি অবস্থা হতে পারে, যখন অনেক মুসলিম শুধুমাত্র নিজেদের ইসলাম দাবী করে, কিন্তু তারা দ্বীনের অনুসরণ করেনা।
অনেক মুসলিম ইসলামের বিধি-বিধান মেনে চলেনা, ইসলামী আইন দ্বারা বিচার-ফয়সালা করেনা, সঠিক ইসলামী আক্বীদাহর প্রতি বিশ্বাস রাখেনা, হুদুদ বা ইসলামিক দন্ডবিধির বাস্তবায়ন করেনা, তারা সৎ কাজে আদেশ করেনা ও অসৎ কাজে বাঁধা দেয়না।
একারণে মুসলিমদের উপর বৃষ্টির মতো একের পর এক ফিতনাহ বর্ষিত হচ্ছে দেখে আমরা আশ্চর্য হইনা। এই ফিতনাহ থেকে মুক্তির কোন পথ নেই, একমাত্র আল্লাহর কিতাব (ক্বুরানুল কারীম) ও রাসুলু্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহর দিকে ফিরে আস ছাড়া।
মূল উৎসঃ শায়খ সালেহ আল-ফাউজান হাফিজাহুল্লাহ এর একটি প্রশ্নের উত্তর থেকে নেওয়া। পাশাপাশি আল্লামাহ শফিউর রহমান মুবারকপুরী রাহিমাহুল্লাহর রাসুলু্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সীরাহ বা জীবনীর উপরে লিখিত অনন্য গ্রন্থ আর-রাহীখুল মাক্বতুম থেকে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য সংযোজন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রায় একই কথা ইমাম মুহাম্মদ ইবনে উসায়মিন রাহিমাহুল্লাহ বলেছিলেন, ওহুদ যুদ্ধে মাত্র অল্প কয়জন সাহাবী রাসুলু্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর একটি মাত্র আদেশ অমান্য করার কারণে গোটা মুসলিম বাহিনীর নিশ্চিত জয় হাতছাড়া হয়ে তাদের উপর বড় বিপর্যয় নেমে এসেছিলো । সেখানে বর্তমানে আমরা কি করে আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে জয়ী হওয়ার আশা করতে পারি, যেখানে আমাদের মাঝে বেশিরভাগ লোকই হচ্ছে পাপী, আর আমাদের পাপের সংখ্যা হচ্ছে অগণিত? 
উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছিলেন,
আমরা তো মর্যাদাহীন লোক ছিলাম, আল্লাহ আমাদেরকে ইসলাম এর নিয়ামত দিয়ে সম্মানিত করেছেন। সুতরাং, আল্লাহ আমাদেরকে যা দ্বারা সম্মানিত করেছেন, আমরা যদি সেই ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়ে অন্য কোথাও সম্মান খুঁজি, তাহলে আল্লাহ পুনরায় আমাদেরকে  অপমানিত করবেন।
এ থেকে মুক্তির পথ সম্পর্কে ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ (মৃত্যুঃ ১৭৯ হিজরী) বলেছিলেন, এই উম্মতের শেষ লোকদেরকে কেবলমাত্র ঐ জিনিসই সংশোধন করতে পারে, যা তাদের পূর্ববর্তীদেরকে (অর্থাৎ সাহাবাদেরকে) সংশোধন করেছিলো।
শায়খ মুহাম্মদ ইবনে উসায়মিন রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
সাহাবাদেরকে যেই জিনিস সংশোধন করেছিলো তা হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার আনুগত্য ও পাপাচার থেকে বিরত থাকা।
শায়খ ফাওজানের মূল ফতোয়া এবং তার ইংরেজী অনুবাদের লিংক
https://www.youtube.com/watch?v=u41T-f_G8Cw  
আর-রাহীখুল মাক্বতুম এর ডাউনলোড লিংক
http://islamhousebd.wordpress.com/ar-raheequl-makhtoom/
অথবা,

http://www.quraneralo.com/ar-rahiqul-makhtum/

বুধবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৫

“সুন্নাহ”

সুন্নাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবন আদর্শকে সুন্নাহ বলা হয়। সুন্নাহ জানা যায় সহীহ এবং হাসান পর্যায়ের হাদীস সমূহ থেকে। হাদীস হচ্ছে সুন্নাহর দলিল বা সুন্নাহর লিখিত ফর্ম।
ক্বিয়ামত যত কাছে আসবে, সুন্নাহর উপর টিকে থাকা তত কঠিন হবে। এ কারণে যারা সুন্নাহ মানা কঠিন হওয়া সত্ত্বেও তার অনুসরণ করবে, তারা প্রতিদানে বেশি সওয়াব পাবে।
. আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
তোমরা সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজে নিষেধ করতে থাক। অবশেষে যখন দেখবে যে, সর্বত্র মানুষ দুনিয়াবী লোভ-লালসার দাস হয়ে গেছে, সবাই নিজের প্রবৃত্তির খেয়াল-খুশি অনুযায়ী চলছে, দুনিয়াবি স্বার্থকেই সর্বত্র প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে এবং প্রত্যেকেই তার নিজের মতকে সর্বোত্তম বলে বিশ্বাস করছে, তখন তুমি নিজের ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত হবে এবং সাধারণ মানুষের বিষয় ছেড়ে দেবে। কারণ, তোমাদের সামনে রয়েছে এমন কঠিন সময়, যখন ধৈর্য্য ধারণ করা একটা আগুনের অঙ্গার মুঠি করে ধরে রাখার মতো কষ্টদায়ক হবে। সে সময় যারা নেক আমল করবে, তাদের একজন তোমাদের (সাহাবাদের) মত যারা আমল করে তাদের ৫০ জনের সমান পুরষ্কার লাভ করবে। সাহাবীগণ বললেন, হে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!, তাদের মধ্যকার ৫০ জনের সমান সাওয়াব? তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, না, বরং তাদেরে একজন তোমাদের (সাহাবাদের) মধ্যকার ৫০ জনের সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে।
সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিজি, সুনানে ইবনু মাজাহ, সহীহ ইবনু হিব্বান, মুসতাদরাক হাকিম। হাদীসটি সহীহ।
২. ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
সুন্নাহ হচ্ছে নূহ আলাইহিস সালাম এর নৌকার মতো। যে ব্যক্তি তাতে আরোহণ করবে, সে নাজাত পাবে। আর যে ব্যক্তি তা অস্বীকার করবে, সে ধ্বংস হবে।
৩. ইমাম আল-বারবাহারী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
জেনে রাখ ইসলাম হচ্ছে সুন্নাহ, আর সুন্নাহ হচ্ছে ইসলাম।
শারাহুস-সুন্নাহ।
৪. ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
সুন্নাহকে রক্ষা করা, অস্ত্র দিয়ে জিহাদ করার চাইতে উত্তম।
সিয়ার আলাম আন-নুবালাঃ ১০/৫১৮।

সোমবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৫

স্বর্ণ দিয়ে লিখে রাখার মতো জ্ঞানী ব্যক্তিদের উপদেশঃ (পর্ব-১)

স্বর্ণ দিয়ে লিখে রাখার মতো জ্ঞানী ব্যক্তিদের উপদেশঃ (পর্ব-১)
আপনি যার সাথে কথা বলবেন, যার সাথে মিশবেন, যার সাথে উঠা-বসা, চলাফেরা ও বন্ধুত্ব করবেন, ফেইসবুক, ইন্টারনেট বা বই-পুস্তকে যেই লেখকদের লেখা পড়বেন অথবা, যাদের ওয়াজ-লেকচার শুনবেন, আপনার দ্বীন, চিন্তা-ভাবনা, বিচার-বুদ্ধি বা ইলম তাদের মতোই হবে। সেইজন্যে যেই সমস্ত নারী-পুরুষরা লিখালিখি করে, বা ওয়াজ লেকচার দিচ্ছে শুধুমাত্র ২-৪ টা সুন্দর সুন্দর লেখা বা কথা দেখেই লাইক-শেয়ারে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন না। যার কাছ থেকে ইলম নিচ্ছেন, প্রথমে নিশ্চিত হয়ে নিন, তার কাছ থেকে ইলম নেওয়ার যোগ্য কিনা। যাই হোক, আজকে আমাদের সালফে সালেহীন অর্থাৎ পূর্ববর্তী নেককার লোকদের কিছু অমূল্য উপদেশ বাণী আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। আমাদের সালাফদের ইলমের গভীরতা ও তাদের শিক্ষার মাজে কতটুকু ইখলাস ছিলো, তাদের কথা থেকেই সেটা ধারণা করা যায়।
- আনসারুস সুন্নাহ।
_________________________
(১) বলা হয়ে থাকে, হাওয়া (কু-প্রবৃত্তির অনুসরণ) বাদশাহকে পথের ভিখারী বানায়, আর সবর (ধৈর্য ধারণ) ভিখারীকে দেশের রাজা বানায়। তুমি কি জানোনা, ইউসুফ আলাইহিস সালাম ও জুলাইখা (তৎকালীন মিশরের বাদশাহর চরিত্রহীনা স্ত্রীর) ঘটনা?
(২) আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তোমার জন্যে দুনিয়ার সবচাইতে বড় নিয়ামত হচ্ছে ইসলাম।
(৩) জ্ঞানী ব্যক্তিরা উল্লেখ করেছেন, তিনটি জিনিস অন্তরের কষ্ট দূর করে দেয়ঃ ১. যিকির (আল্লাহর স্মরণ), ২. আল্লাহর অলি-আওলিয়াদের সাহচর্য এবং ৩. জ্ঞানী ব্যক্তিদের উপদেশ বাণী।
(৪) কাব বিন আহবার রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, (মসিবত থেকে বাঁচার জন্যে) মুসলমানদের দুর্গ তিনটিঃ ১. মসজিদ, ২. আল্লাহর যিকির এবং ৩. ক্বুরআন তেলাওয়াত।
(৫) ওহাব বিন মুনাব্বিহ ইয়ামানী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তাওরাতে লিখিত আছে, লোভী ব্যক্তি দরিদ্র, যদিও সে দুনিয়ার বাদশাহ হয়। সৎ ব্যক্তি অনুসরণযোগ্য, যদিও সে গোলাম হয়। অল্পে তুষ্ট ব্যক্তি ধনী, যদিও সে ক্ষুদার্থ হয়।
(৬) আলেমরা বলেন, প্রকৃত ইয়াক্বীন (দৃঢ় বিশ্বাস, যা ঈমানের চাইতে উঁচু স্তর) হচ্ছে তাক্বওয়া এবং তাক্বদীরের উপর সন্তুষ্ট থাকা।
(৭) কথিত আছে, ইবাদত একটি পেশা, তার দোকান হচ্ছে নির্জনতা, তার মূলধন হচ্ছে তাক্বওয়া, আর তার লাভ হচ্ছে জান্নাত।
(৮) মালেক বিন দিনার রাহিমাহুল্লাহ বলেন, তিনটি বস্তু দ্বারা তিনটি বস্তুর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করো, তাহলে তুমি সত্যিকারের মুমিন হতে পারবেঃ  ১. অহংকারকে নম্রতা দ্বারা, ২. লালসাকে অল্পে তুষ্টি দ্বারা এবং ৩. হিংসাকে দ্রবীভূত করো অপরের কল্যাণ কামনা দ্বারা।
(৯০ জ্ঞানী ব্যক্তিরা বলেছেন, পুরুষের লজ্জা উত্তম, কিন্তু নারীদের লজ্জা অধিক উত্তম।
(১০) জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি হতে বর্ণিত, ঈমানের আলামত চারটিঃ ১. তাক্বওয়া, ২. লজ্জা-শরম, ৩. শুকরিয়া, ৪. সবর।
(১১) জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছেন, যে ব্যক্তি ভোগ-বিলাসে লিপ্ত হতে চায়, তার জন্যে নারী অপরিহার্য। যে ব্যক্তি ধন-সম্পদ সংগ্রহ করতে চায়, তার জন্যে হারাম পথ অবলম্বন করা অপরিহার্য। যে ব্যক্তি মুসলমানদের উপকারে মত্ত হতে চায়, তার জন্যে শিষ্টাচার অপরিহার্য। যে ব্যক্তি ইবাদতে মত্ত হতে চায়, তার জন্যে ইলম অপরিহার্য।
(১২) যে ব্যক্তি ওলামাদেরকে তুচ্ছ মনে করবে, সে তার দ্বীনকে নষ্ট করবে।
(১৩) চরিত্রহীন জালিম পুরুষের অধীনে সতী মুসলিম নারী অবহেলিত। অসৎ চরিত্র ও দুষ্টমতি মহিলার কাছে সৎ মুসলিম পুরুষ অবহেলিত।
(১৪) আবু যুর জিমহির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ছয়টি গুণ সমস্ত দুনিয়ার সমকক্ষঃ ১. রুচিকর খাবার, ২. সু-সন্তান, ৩. একমনা স্ত্রী, ৪. দৃঢ় বাক্য, ৫. বুদ্ধির পূর্ণতা, ৬. সুস্থ শরীর।
(১৫) যে ব্যক্তি নিজের স্ত্রীকে তুচ্ছ করবে, সে দুনিয়ার সুখ নষ্ট করবে।
_________________________
উৎস গ্রন্থঃ সবগুলো কথা ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ সংকলিত আল-ইসতিদাদ লি-ইয়াওমিল মাআ বা পরকালের পাথেয় নামক বই থেকে সংগৃহীত। ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ অবিস্মরণীয় একজন আলেম ছিলেন, যিনি সহীহ বুখারীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্যখ্যা গ্রন্থ ফাতহুল বারী লেখার কারণে প্রসিদ্ধ। আলহামদুলিল্লাহ পরকালের পাথেয় বইটি বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে, অনুবাদ করেছেন ড. শায়খ  মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম মাদানী। আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দিন, বইটি তাওহীদ পাবলিকেশানে পাবেন। আমি আপনাদেরকে ছোট্ট, কিন্তু অসাধারণ এই বইটা অবশ্যই কিনতে বলবো। যে কোন সময়, বিশেষ করে নিঃসংগতা বা দুঃখ-ভারাক্রান্ত হলে এই বইটি আপনার সর্বোত্তম সংগী হতে পারে।

_________________________