রবিবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৬

বার্মাতে মুসলিমদের গণহত্যার ব্যপারে শায়খ সালিহ আল-ফাউজান হা’ফিজাহুল্লাহর উপদেশ

বার্মাতে মুসলিমদের গণহত্যার ব্যপারে শায়খ সালিহ আল-ফাউজান হাফিজাহুল্লাহর উপদেশঃ
(১) প্রশ্নকর্তাঃ সম্মানিত শায়খ! আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। বার্মাতে বৌদ্ধদের দ্বারা মুসলিম ভাইদের গণহত্যার ব্যপারে মুসলিমদের উদ্দেশ্যে আমরা আপনার মূল্যবান উপদেশ কামনা করছি। উল্লেখ্য, সম্প্রতি বার্মাতে মুসলিমদের উপরে যে গণহত্যা হচ্ছে, এটা নতুন কোন ঘটনা নয়। বরং, দশকের পর দশক ধরে মুসলিম গণহত্যা ও এথনিক ক্লিনজিং (সাম্প্রদায়িক নিশ্চিহ্নকরণের) ধারাবাহিকতা মাত্র। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এ ব্যপারে সম্পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করছে।
শায়খের উত্তরঃ মুসলিম গণহত্যা শুধুমাত্র বার্মাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বর্তমানে অনেক মুসলিম দেশেই ইসলামকে অপমানিত করা হচ্ছে, ইসলামকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। কাফের জাতিগুলো মুসলিমদের উপর বিজয়ী হয়ে তাদের উপর কর্তৃত্ব করছে। কাফেররা কখনোই চায় না যে, মুসলিমরা কোন রাষ্ট্র গঠন করুক। তারা ইসলামের নাম-নিশানা সহ্য করতে পারেনা। ইসলামকে মুছে ফেলার জন্যে তারা যা করা সম্ভব, সবই করছে। তোমরা সকলেই জানো, কাফেররা মুসলিমদের উপর কি পরিমান অন্যায়-অত্যাচার করছে। কাফেররা গণতন্ত্র অনুসরণ করার দাবী করে, এবং তাদের এই তরীকা ও কুফুরী আইন মুসলিমদের উপরে চাপিয়ে দিতে চায়। তারা তাদের রচিত কুফুরী আইন আমাদের মুসলিমদের উপরে চাপিয়ে দিচ্ছে, আর এর নাম দিয়েছে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। কিন্তু (তাদের এই ইচ্ছা কখনোই পূরণ হবেনা) কারণ, আল্লাহ অবশ্যই তাঁর নূরের (ইসলামের, কুরআনের) পূর্ণতা দান করবেন। সুতরাং, আমাদের জন্য জরুরী হচ্ছে, সমস্ত মুসলিম ভাই ও বোনদের জন্যে অত্যন্ত বিনীতভাবে, আন্তরিকতার সহিত বার বার আল্লাহর কাছে দুয়া করা। আল্লাহ যেন তাদেরকে সাহায্য করেন এবং তাদেরকে শত্রুদের হাত থেকে মুক্তি দান করেন (আমীন)। আমাদের উচিত দুয়া করা, এই মুহূর্তে আমরা দুয়া ভিন্ন অন্য কিছু করার ক্ষমতা রাখিনা। তবে যার সামর্থ্য আছে এর অতিরিক্ত কিছু করার, সে যেন তা করার জন্যে জোর প্রচেষ্টা চালায়। নাআম। (ক)
(২) অনেকে সচেতনতা তৈরীর জন্যে ফেইসবুক, ইউটিউব, ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ফিলিস্থিনে, সিরিয়াতে, ইন্ডিয়াতে, বার্মাতে ইত্যাদি স্থানে নির্যাতিত মুসলিমদের উপর অত্যাচার নির্যাতনের ছবি, ভিডিও ও প্রেজেন্টাশান প্রচার করে থাকে। এইগুলোর কোনটাতে দেখা যায় ক্ষত-বিক্ষত, টুকরা টুকরা করা কোন মুসলিমের লাশ, কোনটাতে অমানুষিক নির্যাতনে কোন মুসলিমকে হত্যা করার ভিডিও...এইগুলো দেখে অনেক কোমলমতি, সংবেদনশীল কিশোর-কিশোরী ও নারীরা পেরেশানি বোধ করেন, অসহ্য মানসিক যন্ত্রনার শিকার হন। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বীভৎস, ভয়ংকর ছবি ও ভিডিও মানুষের মাঝে প্রচার করা এক প্রকাক মানসিক অত্যাচার। প্রশ্ন হচ্ছে ইসলাম প্রচার, দাওয়াত-তাবলীগ, মুসলিমদের উপর অত্যাচার-নির্যাতন সম্পর্কে জানানোর জন্যে এধরণের হৃদয় বিদারক, বীভৎস ছবি বা ভিডিও প্রচার করা শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ?
এ সম্পর্কে শায়খ সালিহ আল-ফাউজান হাফিজাহুল্লাহ বলেন, এই কাজ করা মোটেও ঠিক না, আহত লোকদের (বীভৎস ছবি) তোলা #জায়েজ_নয়। আমাদের করণীয় হচ্ছে, মুসলিমদেরকে তাদের নির্যাতিত ভাইদেরকে সাদাকাহ দেওয়ার জন্যে আহবান জানানো। আর নির্যাতিত মুসলিমরা খারাপ অবস্থার মাঝে আছে, এটা অন্য মুসলিমদেরকে (মুখে বলার মাধ্যমে কিংবা লেখনীর দ্বারা) জানানো উচিত। যেকোন ধরণের ছবি বা আহত মানুষের ছবি মুসলিমদেরকে দেখানো ব্যতীত এই কাজ করতে হবে। কারণ, এতে (প্রাণীর) ছবি প্রস্তুত করা হছে, (যা শায়খের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম ও কবীরাহ গুনাহ)। এছাড়া, এই সমস্ত (বীভৎস, করুণ) ছবি দ্বারা মুসলিমদেরকে মানসিকভাবে দুর্বল করা হচ্ছে। কারণ, তুমি যখন বিকৃত করা হয়েছে এমন কোন মুসলিমের লাশ দেখাবে, অথবা মুসলিমদের কর্তিত অংগ-প্রত্যংগ দেখাবে, এটা মুসলিমদের মনে ভীতির সৃষ্টি করবে। এটা কাফেরদের নৃশংসতার ব্যপারে মুসলিমদেরকে ভীত করবে। আর এটা ওয়াজিব হচ্ছে যে, মুসলিমদের কোন দুর্বলতা মানুষের মাঝে প্রচার করবেনা। মুসলিমদের উপর আপতিত কোন বিপর্যয়ের ছবি মানুষকে দেখানো যাবেনা। বরং, এই সমস্ত ছবি গোপন রাখতে হবে, যাতে করে মুসলিমদের শক্তি দুর্বল হয়ে না পড়ে। নাআম। (খ)
বিঃদ্রঃ সাধারণ মানুষকে আল্লাহ তাআলা আদেশ করেছেন, যদি তুমি না জানো, তাহলে আহলে যিকির (যারা জ্ঞানী/আলেম) তাদের কাছ থেকে জিজ্ঞাসা করে জেনে নাও। সুরা আল-আম্বিয়াঃ ৭।
সুতরাং, দ্বীনের কোন বিষয়ে মতামত জানানো বা ফতোয়া দেওয়া, এটা শুধুমাত্র আলেমদের দায়িত্ব ও অধিকার। আলেমদের ডিংগিয়ে কোন সাধারণ মানুষ নিজের অল্প ইলম নিয়ে কখনোই ফতোয়া দিবেনা, এটা একজনের দ্বীনকে ধ্বংস করে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ও গোমরাহীর সৃষ্টি দেয়। উপরে দুইটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন সৌদি আরবের প্রখ্যাত আলেমে-দ্বীন ও ফকীহ, আল্লামাহ সালিহ আল-ফাউজান হাফিজাহুল্লাহ। তাঁর ব্যপারে সৌদি আরবের বিগত প্রধান মুফতি ইমাম আব্দুল আজিজ বিন বাজ (মৃত্যুঃ ১৯৯৯) রাহিমাহুল্লাহ বলেছিলেন, শায়খ সালিহ আল-ফাউজান হচ্ছে শ্রেষ্ঠ আলেমদের একজন, তাঁর আকিদাহ ও গুণ প্রশংসনীয়। তিনি একজন ফকিহ (দ্বীনের ব্যপারে গভীর জ্ঞানের অধিকারী)। (গ)
দয়া করে এই পোস্টের কমেন্টে আলোচিত বিষয়ের উপর কেউ কোন মতামত, ফতোয়া ব্যক্ত করবেনা না। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন, আমীন।
শায়খের মূল ফতোয়ার অডিও টেপ, আরবী ও ইংরেজী অনুবাদসহ
(ক) https://www.youtube.com/watch?v=xUvV9FsDux4&feature=youtu.be
(খ) https://www.youtube.com/watch?v=iYx7JzvOgs0
(গ) https://www.youtube.com/watch?v=pbVEjdMczPo&feature=youtu.be


শুক্রবার, ১৮ নভেম্বর, ২০১৬

আসমা রাদিয়াল্লাহু আ’নহা রাদিয়াল্লাহু আ’নহা (পর্ব-১)

আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাদিয়াল্লাহু আনহা (পর্ব-১)
রসুলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওতের পূর্বে ও পরে সবচাইতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সাহাবীদের মাঝে সবচাইতে বেশি মর্যাপ্রাপ্ত সাহাবী হচ্ছেন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু। রসুলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কিশোরী কন্যা আয়িশাহ রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ে করেছিলেন। এথেকে বুঝা যায়, আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু রসুলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কত আপন ও বিশ্বস্ত বন্ধু ছিলেন। আবু বকর, আয়িশাহ ছাড়াও এই পরিবারের আরেকজন নারী সদস্য ছিলেন, রসুলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সম্মানিত ও মর্যাপ্রাপ্ত সাহাবীদের একজন। তিনি হচ্ছেন আবু বকরের কন্যা ও আয়িশাহর বড় বোন, আসমা বিনতে আবু বকর, আল্লাহ তাঁদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন। আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহা মক্কাতে সর্বপ্রথম ইসলাম কবুলকারী সাহাবীদের একজন ছিলেন। তাঁর উপাধি ছিলোঃ যাত আন-নিতাকাইন। তাঁর এই উপাধি সম্পর্কে বিস্তারিত ঘটনাটা জানার ২০১৪-সালে ১৯-শে নভেম্বরে লিখেছিলাম
<<< যাত আন-নিতাকাইন >>>
আসমা বিনতে আবু বকর, অর্থাত আবু বকর রাঃ এর মেয়ে আসমা রাঃ সর্বপ্রথম ইসলাম কবুলকারী সাহাবীদের একজন ছিলেন। তার পিতা আবু বকর রাঃ যখন তাঁকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেন, তখন তিনি মাত্র ১৪ বছর বয়সে সেই দাওয়াত কবুল করেন। তিনি যখন ইসলাম কবুল করেন তখন নারী-পুরুষ মিলেয়ে মুসলমানদের মোট সংখ্যা ছিলো মাত্র ১৭ জন। তার জীবনের বিখ্যাত একটি ঘটনা হচ্ছে, রাসুল সাঃ যখন মক্কা থেকে মদীনাতে হিজরত করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি তা শুধুমাত্র আবু বকর রাঃ কে জানান। কারণ, কুরাইশরা তখন রাসুল সাঃ কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করছিলো, সুতরাং রাসুল সাঃ এর হিজরত করার কথা শুনলে হয়তো সাথে সাথে আক্রমন করে তাকে হিজরত করার পূর্বেই হত্যা করার চেষ্টা করবে। সেমতে তিনি একদিন রাতের বেলায় আবু বকর রাঃ এর ঘর থেকে গোপনে মক্কা ছেড়ে মদীনার উদ্দেশ্যে যাওয়ার সফর শুরু করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। রাসুল সাঃ তার হিজরতের সাথী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন এই উম্মতের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব আবু বকর রাঃ-কে। এমন সময় আসমা রাঃ দীর্ঘ সফরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি খাবার ও একটি পানির প্যাকেট প্রস্তুত করে দিচ্ছিলেন। কিন্তু খাবার ও পানির প্যাকেট ভালো করে বাধার জন্য হাতের কাছে কোন কিছু খুজে পাচ্ছিলেন না। এমন সময় আবু বকর রাঃ আসমা রাঃ-কে তাঁর কোমরের বেল্ট খুলে খাবারের প্যাকেটগুলো বাধতে বলেন। আসমা রাঃ তার কোমর থেকে বেল্ট খুলে সেটাকে দুইটা ভাগ করে খাবার ও পানির প্যাকেটকে বেঁধে দেন। রাসুল সাঃ এই ঘটনা দেখে খুশি হয়ে আসমা রাঃ এর জন্য দুয়া করেন, আল্লাহ তোমাকে এই দুইটির পরিবর্তে জান্নাতের দুইটি বেল্ট দান করুন।
এই ঘটনার জন্য পরবর্তীতে আসমা রাঃ কে যাত আন-নিতাকাইন অর্থাৎ দুইটি বেল্টের মালিকা বলে উপাধি দেওয়া হয়েছিলো।

বিঃদ্রঃ বর্তমান মুসলমানদের জন্য বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, আমাদের তরুন ভাইয়েরা মুশরেকিন ব্যভিচারিনী নায়িকাদের স্বপ্নে বিভোর, তাদের নগ্ন ছবি-ভিডিও ও গান দিয়ে মোবাইল ও কম্পিউটার ভর্তি করছে। আমাদের বোনেরা মুশরেকিন উলংগ অভিনেত্রীদের পোশাকের সাথে পাল্লা দিচ্ছে, এসবে বাধা আসলে স্বামীকে ডিভোর্স দিচ্ছে, আত্মহত্যা করছে। অথচ আমরা আমাদের আদর্শ সাহাবী ও সাহাবীয়াদের নামই জানিনা। আজকে আমাদের অনেকেই পাকিস্থান, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট টিমের খেলোয়াড়দের নাম, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ফুটবল দলের খেলায়াড়দের নাম, হলিউড-বলিউডের নোংরা নর্দমার কীটের চাইতে নিকৃষ্ট নায়ক-নায়িকা বা গায়ক-গায়িকাদের নাম মুখস্থ শত শত। মুশরেকিনদের নাটক-সিনেমা দেখে, কুফুরী ও চরিত্রহীনতার গল্প-উপন্যাস পড়ে রামায়ন-মহাভারতের দেব-দেবীর নাম মুখস্থ। কিন্তু আমাদের কয়জন নবী-রাসুলদের নাম ও তাদের ঘটনাগুলো জানি? কয়জন সাহাবী ও মহিলা সাহাবীদের সম্পর্কে জানি?

বৃহস্পতিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৬

অদৃশ্য জগতের কথা (পর্ব-৭)

অদৃশ্য জগতের কথা (পর্ব-৭)
(পর্ব ১-৬)
https://www.facebook.com/Back.to.Allah.bangla/photos/a.130928300273259.14132.125167817515974/1751676758198397/?type=3&theater
______________________
(১) মৃত্যুর ফেরেশতারা যখন কোন মানুষের আত্মা কবজ করেন, তখন ফেরেশতাদের চেহারা, কথা ও আচরণ দ্বারাই একজন মানুষ বুঝতে পারে, দুনিয়াতে সে যেই আমল করেছে, কবরে তার জন্যে কি প্রতিদান অপেক্ষা করছে। আল্লাহর প্রতি সঠিক ঈমান এনে, আল্লাহকে ভয় করে ও ভালোবেসে তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে যে ব্যক্তি দুনিয়াতে নেক জীবন অতিবাহিত করে, মৃত্যুর সময়ই ফেরেশতারা কবরে ও আখেরাতের জীবনে তার জন্যে আল্লাহ যে সুখের জীবন প্রস্তুত করে রেখেছেন, সেই সুসংবাদ শোনাতে থাকে। যেকারণে কোন নেককার ব্যক্তির জানাযা শেষে যখন তার লাশ কাঁধে বহন করে কবরের দিকে নেওয়া হয়, সেই মৃত নেককার ব্যক্তিটি তখন বলতে থাকে, তোমরা আমাকে দ্রুত (কবরের দিকে) নিয়ে চলো, আমাকে তোমরা দ্রুত নিয়ে চলো। পক্ষান্তরে কোন পাপী ব্যক্তির মৃত্যুর সময়ই দুনিয়াতে তার কৃত খারাপ কাজের শাস্তি শুরু হয়ে যায়। আর ফেরেশতারা কবরে ও আখেরাতের জীবনে তার জন্যে আল্লাহ যে কঠিন শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন, সেই দুঃসংবাদ শোনাতে থাকে। যেকারণে কোন পাপী ব্যক্তির জানাযা শেষে যখন তার লাশ কাঁধে বহন করে কবরের দিকে নেওয়া হয়, সেই মৃত পাপী ব্যক্তিটি আফসোস করে বলতে থাকে, হায়! তোমরা আমকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ। হায়! তোমরা আমকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ। তার এই চিৎকার মানুষ ব্যতীত সমস্ত প্রাণী শুনতে পায়। মানুষ যদি পাপী ব্যক্তিদের এই ভয়ংকর চিৎকার শুনতে পেতো, তাহলে বেহুঁশ হয়ে যেত। সহীহ বুখারীঃ ১৩১৪, নাসায়ীঃ ১৯০৯। একারণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা জানাযার (লাশ) নিয়ে যেতে তাড়াতাড়ি কর। কেননা, সে যদি পুণ্যবান হয়, তাহলে ভালো; ভালো (গন্তব্যের) দিকেই তোমরা তাকে পেশ করবে। আর যদি তা এর উল্টো হয়, তাহলে তা মন্দ; যা তোমরা তোমাদের ঘাড় থেকে নামিয়ে দেবে। সহীহ বুখারীঃ ১৩১৫, সহীহ মুসলিম ৯৪৪।
(২) শয়তান দুই প্রকার, জিন শয়তান ও মানুষ শয়তান। মানুষের মাঝে যারা শয়তানের বন্ধু, শয়তান তাদের কাছে ওয়াহী (প্রত্যাদেশ) পাঠাইয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয়ই শয়তান তার আওলিয়া (বন্ধুদের) কাছে ওয়াহী প্রেরণ করে, যাতে তারা যেন তোমাদের সাথে তর্ক করে। সুতরাং (হে মুসলমানেরা সাবধান!) তোমরা যদি শয়তানের বন্ধুদের আনুগত্য করো, তাহলে তোমরা মুশরেক হয়ে যাবে। সুরা আনআম আয়াতঃ ১২১। গণক বা জ্যোতিষীরা শয়তানের বিশেষ দোসর, যাদের উপর শয়তান নাযিল হয় এবং তারা শয়তানের নাযিল করা কথাগুলোর সাথে আরো ৯৯-টা মিথ্যা যুক্ত করে মানুষকে বলে। আল্লাহ তাআলা বলেন, (হে নবী!) আমি কি আপনাকে বলে দেব, শয়তানরা কার উপর অবতরণ করে? শয়তানরা অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক মিথ্যাবাদী, গোনাহগারের উপরে। তারা শোনা কথা এনে দেয় এবং তাদের অধিকাংশই মিথ্যাবাদী। সুরা শুআরাঃ ২২১-২২৩।
(৩) আল্লাহ তাআলা নক্ষত্র বা আকাশের তারাগুলোকে সৃষ্টি করেছেন তিনটি উদ্দেশ্যে। প্রথমতঃ প্রদীপের মতো মিষ্টি ও নরম আলো দিয়ে আসমানের সৌন্দর্য বর্ধন করার জন্যে। দ্বিতীয়তঃ শয়তানেরা যখন ফেরেশতাদের কথা শোনার জন্যে আসমানের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখন এগুলোকে উল্কারূপে তাদের উপর নিক্ষেপ করা হয়। তৃতীয়তঃ মানুষ যেনো এই নক্ষত্রগুলো দেখে জাহাজে করে সমুদ্রে ও স্থলে পথ ও দিক নির্ণয় করতে পারে। সুরা মুলকঃ ৫, সুরা আনআমঃ ৯৭।
(৪) হাজার অর্থ পাথর, আর আসওয়াদ অর্থ কালো। সুতরাং, হাজরে আসওয়াদ অর্থঃ কালো পাথর। এই পাথরটি আল্লাহ তাআলা জান্নাত থেকে ফেরেশতাদেরকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছিলেন, যা ইব্রাহীম ও ইসমাঈল আলাইহিস সালাম কাবাঘর নির্মানের সময় কাবার দক্ষিণ-পূর্ব দেয়ালে স্থাপন করেছিলেন। প্রথম যখন পাথরটি আনা হয়েছিলো তখন তার রঙ ছিলো দুধের চাইতে সাদা। কিন্তু পাপী মানুষের স্পর্শের কারণে আস্তে আস্তে এটা কালো বর্ণ ধারণ করে। কেয়ামতের দিন আল্লাহ এই হাজরে আসওয়াদকে এমনভাবে উত্থিত করবেন যে, তার দুটি চোখ থাকবে যার দ্বারা সে দেখতে পারবে, তার একটা জিহবা থাকবে যার দ্বারা সে কথা বলবে। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে ঈমানের সহিত এই পাথরটিকে চুম্বন করবে, কেয়ামতের দিন হাজরে আসওয়াদ তাকে চিনতে পারবে এবং তার ঈমানের পক্ষে সাক্ষ্য দেবে। উল্লেখ্য, এই পাথরের নিজের ক্ষমতা নেই যে, সে মানুষের কোন ভালো বা মন্দ করবে। যেহেতু আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জান্নাতের এই পাথরটিকে ভালোবেসে চুমু খেয়েছিলেন, সেজন্যে আমাদের জন্যেও তাঁর অনুসরণে সুন্নত হচ্ছে পাথরটিকে চুমু দেওয়া। তিরমিযীঃ ৯৬১, তিরমিযীঃ ৭৮৮, সনদ সহীহ।
(৫) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন তোমাদের কেউ ঘুমাতে যায়, শয়তান তখন তার মাথায় তিনটা গিঁট লাগিয়ে দেয়। প্রত্যেক গিঁট লাগানোর সময় সে বলে, এখনো অনেক রাত্র বাকী আছে অথাৎ তুমি শুয়ে থাক। যখন সে জেগে উঠে, সে যদি আল্লাহর যিকর করে (অর্থাৎ আল্লাহকে স্মরণ করে), তাহলে একটি গিঁট খুলে যায়। অতঃপর সে যদি ওযু করে, তাহলে আরো একটি গিঁট খুলে যায়। আর সে যদি সালাত আদায় করে, তাহলে সবগুলো গিঁট খুলে যায় এবং তার সকালটা হয় আনন্দ ও উদ্দীপনার সহিত। আর সে যদি (ঘুম থেকে না উঠে, আল্লাহকে স্মরণ না করে, ওযু না করে এবং ফযরের নামায না পড়ে), তাহলে তার সকালটা হয় ক্লান্ত ও বিষাদময়। সহীহ বুখারীঃ ১১৪২, সহীহ মুসলিমঃ ৭৭৬, নাসায়ীঃ ১৬১০।
(৬) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যখন তোমাদের কেউ ঘুম থেকে উঠবে, সে যেন নাকে পানি দিয়ে তিনবার নাক ঝেড়ে নেয়। কেননা, শয়তান তার নাকের ভেতর রাত্রি যাপন করে। সহীহ বুখারী ৩২৯৫, সহীহ মুসলিম।
(৭) কোন ব্যক্তি সূর্য উদয় হওয়া পর্যন্ত ঘুমিয়ে ফযরের নামায কাযা করে ফেললে শয়তান তার কানে পেশাব করে দেয়। সহীহ বুখারীঃ ৫৪/৪৯২।
(৮) নামাযরত কোন ব্যক্তি ও তার সুতরার জায়গার মধ্য দিয়ে কালো কোন কুকুর হেঁটে গেলে তার নামায ভেংগে যাবে। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কালো কুকুর হচ্ছে শয়তান। সহীহ মুসলিমঃ ১০৩২, তিরমিযীঃ ৩৩৮। একারণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কালো কুকুর এবং কুকুরদের মাঝে যেইগুলো হিংস্র, সেগুলোকে হত্যা করতে বলেছেন। সহীহ মুসলিমঃ ৩৮১৩, আবু দাউদঃ ২৮৩৯।
(৯) কল্যাণের দেশ শাম, হাশরের ময়দান শামঃ
আল্লাহ তাআলা বলেন, আমি তাঁকে (ইব্রাহীম) ও লুতকে উদ্ধার করে সেই দেশে পৌঁছিয়ে দিলাম, যেখানে আমি বিশ্বের জন্যে কল্যাণ রেখেছি। সুরা আল-আম্বিয়াঃ ৭১।
উল্লেখিত আয়াতে যেই স্থানের কথা বলা হয়েছে, সেটা হচ্ছে শাম, যেই এলাকা বর্তমানে বৃহত্তর সিরিয়া ও ফিলিস্থিন নামে পরিচিত। এই শামে অধিকাংশ নবী-রসুলদেরকে পাঠানো হয়েছিলো, এবং সেখান থেকেই তাঁদের উপর নাযিলকৃত শরিয়ত পৃথিবীর অন্যান্য দেশে প্রচারিত হয়েছিলো। এমনকি কিয়ামতের পর পুনরুত্থান ও হাশরও হবে এই শামে। আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল-শাম হচ্ছে হাশরের ও পুনরুত্থানের ময়দান। মুসনাদে আহমাদ, সনদ সহীহ।

আল্লাহর আদেশে ইসরাফীল আলাইহিস সালাম সিংগায় প্রথমবার ফুঁ দিলে কিয়ামত সংগঠিত হবে। এরপর দ্বিতীয়বার সিংগায় ফুঁ দেওয়া হবে, যার ফলে লোকেরা কবর থেকে উঠবে। বিচারের জন্যে তখন লোকদেরকে শামের দিকে তাড়িয়ে নেওয়া হবে। বিচারের জন্যে সবাইকে শামে বিশাল এক ময়দানে একত্রিত করাকে হাশর বা মহা-সমাবেশ বলা হয়। আল-মানাভী, ফাতহুল ক্বাদীরঃ ৪/১৭১।

শুক্রবার, ১১ নভেম্বর, ২০১৬

তোওবা ও ইস্তিগফার নিয়ে কুরআনের কয়েকটি আয়াতের তর্জমা

তোওবা ও ইস্তিগফার নিয়ে কুরআনের কয়েকটি আয়াতের তর্জমাঃ
তোওবা অর্থ আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, আর ইস্তিগফার অর্থ আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করাআপনারা কেউ তোওবা ও ইস্তেগফার করতে ক্লান্ত হবেন না বা, নিজের কৃত পাপের কারণে তোওবা করার ব্যপারে হতাশ হবেন না।  একজন বান্দার আমল নামায় যেই আমল আল্লাহকে সবচাইতে বেশি খুশি করে, এবং যেই আমল দ্বারা বান্দা দুনিয়া ও আখেরাতের ব্যপারে সবচাইতে বেশি উপকৃত হয়, সেটা হচ্ছে তোওবাহ। তোওবার গুরুত্ব ও উপকারীতা নিয়ে অনেক আয়াত ও হাদীস রয়েছে।
উযুবিল্লাহি-মিনাশ-শাইত্বানির রাযীম।
(১) মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে তোওবাকারী ও অত্যাচারী, এই দুইভাগে ভাগ করেছেন। এখানে তৃতীয় কোন ভাগ নেই। মহান আল্লাহ বলেন, যারা তোওবা করবেনা, তারাই হচ্ছে অত্যাচারী সুরা আল-হুজুরাতঃ ১১।
(২) মহান আল্লাহ সমস্ত মুসলমানকে তোওবা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, হে মুমিনগণ! তোমরা সকলে আল্লাহর পানে তোওবা (প্রত্যাবর্তন) কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। সুরা আন-নূরঃ ৩১।
(৩) হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তোওবা কর, এমন তোওবা কর যা আন্তরিক। আশা করা যায়, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের খারাপ কাজগুলো মুছে দেবেন এবং তোমাদেরকে প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে, যার তলদেশে দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়। সুরা তাহরীমঃ ৮।
(৪) আল্লাহ তাআলা তাঁর গুনাহগার বান্দা, সে যতই গুনাহ করুক না কেনো, কেউ যদি আন্তরিক তোওবা ও ইস্তেগফার করে তাহলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ বলেন, (হে নবী!) আপনি বলুনঃ (আমি আল্লাহ এই কথা ঘোষণা করছি যে), হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা (পাপ কাজ বেশি করে) নিজেদের প্রতি যুলুম (অত্যাচার) করেছ, তারা আল্লাহর রহমত (করুণা) হতে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেবেন। নিশ্চয় তিনিই চরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সুরা আয-যুমারঃ ৫৩।
(৫) আর তিনি (আল্লাহ) হচ্ছেন ক্ষমাশীল, ভালোবাসায় পূর্ণ। সুরা আল-বুরুজঃ ১৪।
(৬) তারা কি একথা জানতে পারেনি যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তোওবা কবুল করেন এবং যাকাত গ্রহণ করেন? নিশ্চয়ই আল্লাহ হচ্ছেন তোওবা কবুলকারী, করুণাময়। সুরা তোওবাহঃ ১০৪।
(৭) সুতরাং আপনি আপনার পালনকর্তার পবিত্রতা বর্ণনা করুন এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। নিশ্চয় তিনি তোওবাহ কবুলকারী। সুরা নাসরঃ ৩।
(৮) তারা কি লক্ষ্য করে না যে, প্রতি বছর দুই-একবার তারা বিপর্যস্ত হচ্ছে। কিন্তু এরপরেও তারা তওবা করেনা, কিংবা উপদেশ গ্রহণ করে না। সুরা তোওবাহঃ ১২৬।
(৯) তোওবা করলে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাতে উভয় দুনিয়াতেই এর উত্তম প্রতিদান দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, আর তোমরা নিজেদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। অতঃপর তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন কর। তাহলে তিনি তোমাদেরকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উত্তম রিযিক (জীবন উপকরণ) দান করবেন এবং অধিক আমলকারীকে বেশী করে দেবেন। আর যদি তোমরা বিমুখ হতে থাক, তবে আমি তোমাদের উপর এক মহা দিবসের আযাবের আশঙ্কা করছি। সুরা হুদঃ ৩।

(১০) অতঃপর আমি (নূহ তার জাতির লোকদেরকে) বলেছিঃ তোমরা তোমাদের পালনকর্তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। (তোমরা যদি ক্ষমা প্রার্থনা করো তাহলে), তিনি তোমাদের উপর অজস্র ধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করবেন। আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বাড়িয়ে দিবেন, তোমাদের জন্যে বাগান স্থাপন করবেন এবং তোমাদের জন্যে নদী-নালা প্রবাহিত করবেন। সুরা নূহঃ ১০-১২।

সোমবার, ৭ নভেম্বর, ২০১৬

রসুল (সাঃ) খাদীজা (রাঃ) কে বিবাহ

প্রশ্নঃ ৯/৪৯ : রসুল (সাঃ) খাদীজা (রাঃ) কে বিবাহের সময় মোহর হিসাবে কি দিয়েছিলেন? তার পরিমাণ কত ছিল? উক্ত বিবাহ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই।
উত্তরঃ মুহাম্মাদ (সাঃ) মোহরানা স্বরূপ খাদীজা (রাঃ) কে বিবাহের মোহর স্বরূপ ২০টি উট প্রদান করেন। এসময় খাদীজা (রাঃ) ছিলেন মক্কার শ্রেষ্ঠ ধনী ও সম্ভ্রান্ত মহিলা এবং সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারিণী হিসাবে তিনি তাহেরা (পবিত্র নারী) নামে খ্যাত ছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৪০ এবং মুহাম্মাদের বয়স ছিল ২৫। মুহাম্মাদ সাঃ ছিলেন খাদীজা রাঃ এর তৃতীয় স্বামী। অন্যদিকে খাদীজা রাঃ ছিলেন মুহাম্মাদ সাঃ এর প্রথমা স্ত্রী। ইবনু হিশামঃ ১/১৮৭-৮৯; আল-বিদায়াহ ২/২৯৩-৯৪।
খাদীজা রাঃ তার ব্যবসায়ের প্রতিনিধি হিসেবে রসুল (সাঃ) কে শামে প্রেরণ করেছিলেন। সেই ব্যবসায়ে অভাবিত সাফল্যে খাদীজা দারুণ খুশী হন। অন্যদিকে গোলাম মায়সারার কাছে মুহাম্মাদ সাঃ এর মিষ্টভাষিতা, সত্যবাদিতা, আমানতদারী এবং উন্নত চিন্তা-চেতনার কথা শুনে বিধবা খাদীজা রাঃ মুহাম্মাদ সাঃ এর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে পড়েন। ইতিপূর্বে পরপর দুইজন স্বামী মৃত্যুবরণ করায় মক্কার সেরা নেতৃবৃন্দ তাঁর নিকটে বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে থাকে। কিন্তু তিনি কোনটাই গ্রহণ করেননি। এবার তিনি নিজেই বান্ধবী নাফীসার মাধ্যমে নিজের বিয়ের পয়গাম পাঠালেন যুবক মুহাম্মাদ সাঃ এর কাছে। তখন উভয় পক্ষের মুরব্বীদের সম্মতিক্রমে শাম থেকে ফিরে আসার মাত্র দুইমাসের মাথায় সমাজ নেতাদের উপস্থিতিতে ধুমধামের সাথে তাদের বিবাহ সম্পন্ন হয়।
সূত্রঃ সীরাতে ইবনু হিশামঃ ১/১৮৭, টীকা ১-২; ইমাম হাকেমঃ হা/৪৮৩৮, ৩/২০০; বিস্তারিত দ্রঃ সীরাতুর রাসূল ৭৩ পৃঃ।

কৃতজ্ঞতাঃ আত-তাহরীক।

রবিবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৬

দুনিয়া vs আখেরাত

দুনিয়া vs আখেরাতঃ
মানুষের স্বভাব হচ্ছে যেই জিনিসটা নগদ নগদ বা দ্রুত পাওয়া যায়, সেটা নিয়েই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে, সেটা অল্প হোক কিংবা বেশি। কিন্তু পরবর্তীতে অনেক বড় কিছু অপেক্ষা করলেও মানুষ সেটাকে মূল্যায়ন করে না। আমি কয়েকটা উদাহরণ দিচ্ছি যাতে করে বিষয়টা বুঝতে আপনাদের জন্যে সহজ হয়।

(১) অনেকে মনে করে, ইংল্যান্ড-আমেরিকার মতো ইয়াহুদী-খ্রীস্টানদের দেশে বসবাস করতে পারলে নিজের ও ছেলে-মেয়েদের জীবন সুন্দর ও নিরাপদ হবে। এটা দুর্বল ঈমানদার মুসলমানদের মাঝে মারাত্মক একটা ভুল ধারণা। যাই হোক, একটু ভালো থাকার আশায় কাফের দেশে যাওয়ার জন্যে হাজার-হাজার মুসলমানেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ইংরেজী ভাষা শিখছে, লক্ষ-লক্ষ টাকা খরচ করছে, মানুষের কাছে বুদ্ধি নেওয়ার জন্য ছুটাছুটি করছে. . .কিন্তু কুরআন পড়া ও বুঝার জন্যে তারা আরবী ভাষা শিখছেনা। যেই নামায না পড়লে সাক্বার নামক জাহান্নামের আগুনে পুড়তে হবে, যেই নামায সম্পর্কে কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম প্রশ্ন করা হবে, সেই নামায তাদের অধিকাংশ মানুষই পড়ছেনা। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হচ্ছে, অনেকে নামায পড়ার সঠিক নিয়ম-কানুন জানেনা, জানার চেষ্টাও করেনা কিংবা এই বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেনা।

(২) জামাতের প্রথম কাতারে নামায পড়ার এতো বড় ফযীলত যে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ লোকেরা যদি জানতো যে জামাতের প্রথম কাতারে নামায পড়ার কি সওয়াব রয়েছে, তাহলে লোকেরা (প্রথম কাতারে নামায পড়ার জন্যে এতো বেশি প্রতিযোগিতা করতো যে), লটারী দেওয়া ছাড়া প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর সুযোগ কেউ কখনো পেতোনা। এতো বড় পুরষ্কার থাকা সত্ত্বেও লোকেরা জামাতের প্রথম কাতারে নামায পড়ার জন্যে কোন প্রতিযোগিতা করেনা। কিন্তু হলিউড-বলিউডের জেনাকারী, উলংগ নায়িকা-গায়িকাদেরকে নাচ-গান দেখার জন্যে, হারাম ও জুয়ার সমতুল্য ক্রিকেট-ফুটবল খেলা দেখার জন্য প্রতিযোগীতা করছে, এইগুলোর টিকেট কেনার জন্যে সারাদিন লম্বা লাইন ধরে হাজার টাকা খরচ করছে, এমনকি মারামারিও করছে।

(৩) বর্তমান যুগের মুসলমানদের অবস্থা হয়েছে এমন যে, দুনিয়াবি বিষয়ে কারো কখনো বুদ্ধির প্রয়োজন হলে মানুষ হাজার হাজার টাকা খরচ করে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির শরণাপন্ন হয়। কিন্তু দ্বীনের ব্যপারে প্রশ্নের উত্তর জানার প্রয়োজন হলে মানুষ আলেম আর জাহেল দেখেনা। সামনে যাকে পায়, তাকেই জিজ্ঞেস করছে, ফুটপাত থেকে ফতোয়া নিচ্ছে। আজকাল টিভি, ইউটিউব ফেইসবুকের যুগে মূর্খ লোকেরা নিজের মনগড়া দ্বীন প্রচার করেছে। মানুষ আলেমদের কাছে না গিয়ে সহজেই মোবাইল বা কম্পিউটারে হাতের কাছেই পাওয়া যায়, সেইজন্যে জাহেলদের কাছ থেকেই দ্বীন শিখছে।

এই উদাহরণগুলো থেকে সহজেই বুঝা যায়, মানুষ দুনিয়াকে কতটুকু মূল্যায়ন করছে, আর আখেরাতকে কতটুকু মূল্যায়ন করছে। মানুষের এই চিরন্তন স্বভাবের সমালোচনা করে আল্লাহ তাআলা বলেন,
বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দিয়ে থাক। অথচ, পরকালের জীবনই হচ্ছে উত্তম এবং চিরস্থায়ী। সুর আল-আলাঃ ১৬-১৭।

আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেন, নিশ্চয় তারা দ্রুত চলে আসে এমন জীবনকে (অর্থাৎ দুনিয়াকে) ভালবাসে। আর তারা পরবর্তীতে আসে এমন কঠিন দিনকে (অর্থাৎ পরকালকে) উপেক্ষা করে চলে। সুরা আল-ইনসানঃ ২৭।
আয়াতের তাফসীরঃ
মৃত্যুর পরের জীবন আখেরাতকে বিশ্বাস করেনা, বা আখেরাতের ব্যপারে সন্দেহ পোষণ করে এমন কাফের-মুশরেক এবং তাদের মতোই অন্য লোকেরা সর্বদা দুনিয়াবী আশা-আকাংখার মায়াজালে বন্দী থাকে। তাদের সমস্ত চেষ্টা ও মনোযোগ দুনিয়ার জন্যেই ব্যয় করে। কিয়ামত ও তার কঠিনতা, ভয়াবহতাকে তারা উপেক্ষা করে চলে। অর্থাৎ, কেয়ামতের জন্য তারা কোন প্রস্তুতি গ্রহণ করে না, এবং তার কোন পরোয়াও করে না।

দুনিয়ার জীবনে ভোগ-বিলাসের প্রতি অনাসক্ত হয়ে আখেরাতকে প্রাধান্য দেওয়ার মর্যাদা নিয়ে অন্তর ছুঁয়ে যায় এমন একটা হাদীসঃ
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি দুনিয়াকে তার সবচাইতে গুরুত্বপুর্ণ বিষয় বানাবে, আল্লাহ তার কাজকর্ম এলোমেলো করে দেবেন, তার দুই চোখের মাঝে সর্বদা দারিদ্রতাকে দৃশ্যমান করে রাখবেন। আর সে দুনিয়া শুধুমাত্র ততটুকুই লাভ করতে পারবে, যতটুকু তার তাকদীরে লিপিবদ্ধ ছিলো। আর যার কাছে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে পরকাল, আল্লাহ তার সব কাজ সুন্দরভাবে সমাধান করে দিবেন, তার অন্তরকে তৃপ্ত করে দেবেন। আর দুনিয়া নিজেই তার কাছে ধরা দেবে, যদিও সে তা কামনা করেনা।

সুনানে ইবনু মাজাহঃ ৪১০৫। হাদীসের সনদ সহীহ, তাহকীকঃ শায়খ আলবানী (রহঃ)। সিলসিলাহ সহীহাহঃ ৯৫০।

বুধবার, ২ নভেম্বর, ২০১৬

প্রিয়নবী মুহা’ম্মাদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে কুরআনুল কারীমের কয়েকটি আয়াতের তর্জমাঃ (পর্ব-৩)

প্রিয়নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে কুরআনুল কারীমের কয়েকটি আয়াতের তর্জমাঃ (পর্ব-৩)
.
বিসমিল্লাহ। আলহা
মদুলিল্লাহ। 
ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আ
লা রাসুলিল্লাহ। 
.
প্রথম পর্বের লিংক -
https://www.facebook.com/Back.to.Allah.bangla/posts/1730630016969738
.
দ্বিতীয় পর্বের লিংক -
https://www.facebook.com/Back.to.Allah.bangla/posts/1746223762077030
.
তৃতীয় পর্ব -
(১) মহান আল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর অনেক বড় দয়া ও অনুগ্রহ করেছেন, এবং তাঁকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিয়েছেন। এছাড়াও আরো অনেক বিষয়ের জ্ঞান (আল্লাহর পক্ষ হতে) তাঁকে দেওয়া হয়েছিলো, যে ব্যাপারে তিনি অবহিত ছিলেন না।
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (হে নবী) আল্লাহ আপনার প্রতি কিতাব ও হিকমাহ (প্রজ্ঞা) নাযিল করেছেন, এবং আপনি যা জানতে না, তা আপনাকে শিক্ষা দিয়েছেন। আর আপনার প্রতি আল্লাহর মহা অনুগ্রহ রয়েছে। সুরা আন-নিসাঃ ১১৩।
(২) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন আল্লাহ তাআলার প্রেরিত সর্বশেষ নবী ও রসুল, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বান্দা। সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব আল-কুরআনুল কারীম তাঁর উপর নাযিল করা হয়, এবং কুরআনের মতোই অতিরিক্ত হিসেবে তাঁকে হিকমাহ (জ্ঞান, প্রজ্ঞা) নামক সুন্নাহ দান করা হয়েছিলো। তবুও আল্লাহ তাআলা তাঁকে জ্ঞান বৃদ্ধির জন্যে আল্লাহর কাছে দুয়া করতে আদেশ করেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (হে নবী) আপনি বলুনঃ হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমার জ্ঞান বৃদ্ধি করুন। সুরা ত্বোয়া হাঃ ১১৪।
একটু চিন্তা করে দেখুন, বর্তমান যুগে যখন ফেতনা-ফাসাদ ও পাপাচার চতুর্দিক থেকে ব্যপকতা লাভ করেছে, সেখানে আমাদের মতো দুর্বল মুমিনদের জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দুয়া করা কতটা জরুরী!
(৩) কাফের ও মুশরেকরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এমন দাবী উত্থাপন করেছিলো যে, আপনি আমাদের মাবূদগুলোর ব্যাপারে একটু নম্রতা প্রকাশ করুন, (অর্থাৎ আমাদের দেব-দেবীগুলোকে মিথ্যা বা বাতিল বলে প্রত্যাখ্যান করবেন না), তাহলে আমরাও আপনার ব্যাপারে নম্রতা অবলম্বন করবো। কিন্তু বাতিলের ব্যাপারে শিথিলতা অবলম্বন করলে এর ফল হবে এই যে, বাতিলপন্থীরা তাদের বাতিলের পূজা ছাড়তে গড়িমসি করবে। হক্ক প্রচারের ব্যাপারে শিথিলতা প্রদর্শন করা নবুওতী দায়িত্ব পালনের জন্য বড়ই ক্ষতিকর। এজন্যে আল্লাহ তাআলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সতর্ক করে বলেছিলেন, সুতরাং আপনি (ঐ সমস্ত কাফের-মুশরেক) মিথ্যাবাদীদের কথা মেনে নিবেন না। তারা তো এই চায় যে, আপনি তাদের প্রতি নমনীয় হন। তাহলে তারাও আপনার প্রতি নমনীয় হবে। সুরা আল-ক্বলমঃ ৮-৯।
(৪) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ তাআলা কিছু জিনিস চাওয়া ছাড়াই দিয়েছেন। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন পাপ কাজ করার পূর্বেই আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে দেওয়ার অগ্রীম ঘোষণা করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (হে নবী!) আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। সুরা আত-তাওবাহঃ ৪৩।
(৫) সাহাবীরা এবং তাঁদের অনুসরণে পরবর্তী যুগের নিষ্ঠাবান মুমিনরাও রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের নিজেদের প্রাণের চাইতেও বেশি ভালোবাসতেন। আর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র বিবিগণ এই উম্মতের প্রত্যেক নারী ও পুরুষের জন্যে মায়ের মতো সম্মানিত। একারণে, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মৃত্যুর পরে তাঁর স্ত্রীদের কাউকে বিয়ে করা হারাম ছিলো। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিবিগণ যেমন রসুলের স্ত্রী ছিলেন এই দুনিয়াতে, ঠিক তেমনি আখেরাতেও তাঁরা তাঁর স্ত্রী হিসেবেই থাকবেন।
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ নবী মুমিনদের নিকট তাদের (নিজেদের) প্রাণ অপেক্ষাও অধিক প্রিয়, আর তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মায়ের মতো। সুরা আল-আহজাবঃ ৬।
(৬) প্রিয়নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর নাযিলকৃত কুরআনুল কারীমের ১১৪টি সুরার মাঝে সবচাইতে বড় (মাহাত্ম্যপূর্ণ) সুরা হচ্ছে সুরা আল-ফাতিহাহ, যার মাঝে সাতটি আয়াত রয়েছে। এই সুরাটির অর্থ ও গুরুত্বের কারণে একে উম্মুল কিতাব বা কুরআনের জননী বলা হয়। এই সুরাটি নামাজে, অসুস্থ অবস্থায় ঝাড়ফুঁক করতে এমন বিভিন্ন ক্ষেত্রে বারবার পাঠ করা হয়, একারণে এই সুরাটিকে সাবউ মাসানী বলা হয়। সুরা ফাতিহা এমন একটি সুরা, যার সমান মর্যাদা সম্পন্ন সুরা তাওরাত, যাবুর, ইনজিল, এমনকি কুরআনুল কারীমেও নেই। এই বিশেষ সুরাটি এতো মর্যাদাপূর্ণ সুরা যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি নাযিলকৃত আল্লাহর এই মহা নেয়ামতের কথা নবীকে আল্লাহ কুরআনেও স্বরণ করিয়ে দিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (হে নবী!) নিশ্চয়ই আমি আপনাকে দিয়েছি বারবার পাঠ করা হয় এমনি সাতটি আয়াত এবং মহা কুরআন। সুরা হিজরঃ ৮৭।  
(৭) আল্লাহ তাআলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মাকামে মাহমুদ বা প্রশংসিত স্থান দান করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ (হে নবী!) আপনি রাত্রির কিছু অংশে (কুরআন পড়ার মধ্য) দিয়ে তাহাজ্জুদের (নামায) পড়ুন; এটা আপনার জন্য একটি নফল ইবাদত (অতিরিক্ত কর্তব্য)। আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক আপনাকে মাকামে মাহমুদে (প্রশংসিত স্থানে) প্রতিষ্ঠিত করবেন। সুরা বনী ইসরাঈলঃ ৭৯।
মাকামে মাহমুদ অর্থ হচ্ছেঃ সেই স্থান, যা কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দান করবেন। সেই স্থানে সিজদায় পড়ে তিনি আল্লাহর অসীম প্রশংসা বর্ণনা করবেন। অতঃপর আল্লাহ জাল্লা শানুহ বলবেন, হে মুহাম্মাদ! আপনি মাথা তুলুন, আপনি কি চান বলুন, আপনাকে তা দেওয়া হবে। আপনি সুপারিশ করুন, (আপনার সুপারিশ) কবুল করা হবে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই বড় সুপারিশটি করবেন, যার পর বিচারের মাঠে মানুষের ভয়াবহ অবস্থা থেকে মুক্তি দিয়ে চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ গ্রহণ করা আরম্ভ হবে। উল্লেখ্য, এই আয়াতে আশা করা যায় দ্বারা নিশ্চিত অর্থ বহন করে।
(৮) আল্লাহ তাআলা কখনো সম্পূর্ণ অলৌকিক উপায়ে আবার কখনোবা পার্থিব কিছু উপায়-উপকরণ দ্বারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিরাপত্তা বিধান ও রক্ষণাবেক্ষণ করেছিলেন। পার্থিব বাহ্যিক উপকরণের মধ্যে ছিলো, আল্লাহ তাআলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চাচা আবু তালেবের অন্তরে নবীর প্রতি প্রকৃতি ও স্বভাবগত ভালোবাসা দান করেছিলেন। যেকারণে আবু তালেব নিজ বংশীয় নের্তৃত্ব, মর্যাদা ও প্রভাব দ্বারা তাঁর প্রাণপ্রিয় ভাতিজার নিরাপত্তা বিধান ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে থাকেন। আবু তালেবের মৃত্যুর পর আল্লাহ তাআলা কুরাইশদের মধ্যে কিছু নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ (যেমন আবু বকর, উমার, উষমান, আলী, হামযাহ, প্রমুখআল্লাহ তাঁদের সকলের প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন), তাঁদের মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে মদীনার আনসারগণের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করেছিলেন। এছাড়াও কাফের মুশরেকদের আকস্মিক আক্রমন থেকে রক্ষার জন্য সাহাবীদের মধ্য থেকে অত্যন্ত বিশ্বস্ত এমন একজন বা দুইজন সবসময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দেহরক্ষীর হিসেবে পাহাড়ায় নিযুক্ত থাকতেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা যখন এই নাযিল করেছিলেন,
আল্লাহ আপনাকে মানুষ হতে রক্ষা করবেন। সুরা আল-মায়িদাহঃ ৬৭।
এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাহ্যিক সুরক্ষা ব্যবস্থা (দেহরক্ষী বা পাহারাদার) নিয়ে চলাফেরা করা বন্ধ করে দেন। কারণ, স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাঁকে রক্ষা করার ওয়াদা করেছিলেন, সুতরাং তখন তাঁর আর দেহরক্ষীর কোন প্রয়োজন থাকলোনা।
(৯) জিবরাঈল আলাইহিস সালাম যখন ওয়াহী নিয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট আসতেন ও তাঁকে ওয়াহী শুনাতেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা ভুলে যাওয়ার আশংকায় জিবরাঈল আলাইহিস সালাম-এর তেলাওয়াতের সাথে সাথে তিনিও দ্রুত জিহবা নাড়িয়ে তা পড়ার চেষ্টা করতেন। আল্লাহ তাআলা তাঁকে এমন করতে নিষেধ করেন আর প্রথমে ওয়াহী মনোযোগ দিয়ে শোনার আদেশ করেন। কারণ ওয়াহী মুখস্থ করানো ও অন্তরে স্থান করে দেওয়ার দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তাঁর নিজের জিম্মায় নিয়েছিলেন।
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ আল্লাহ অতি মহান, সত্য অধীশ্বর। আপনার প্রতি আল্লাহর ওয়াহী (প্রত্যাদেশ) সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বে আপনি কুরআন পাঠে তাড়াতাড়ি করবেন না। সুরা ত্বোয়া হাঃ ১১৪।
আল্লাহ তাআলা আরো বলেছেনঃ ওয়াহী দ্রুত মুখস্থ করার জন্য আপনি আপনার জিহবা (জিবরাঈলের তেলাওয়াতের) সাথে সাথে দ্রুত সঞ্চালন করবেন না। নিশ্চয় ওয়াহী সংরক্ষণ করা ও সেটা (আপনাকে সঠিকভাবে) পাঠ করাবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং, আমি যখন ওয়াহী (জিব্রাঈলের মাধ্যমে) পাঠ করি, তখন আপনি সেই পাঠের অনুসরণ করুন। অতঃপর, নিশ্চয় সেই ওয়াহী ব্যখ্যা করার দায়িত্ব আমারই। সুরা ক্বিয়ামাহঃ ১৬-১৯।
(১০) আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কখনো তাঁর নাম হে মুহাম্মদ বলে সম্বোধন করে ডাকেন নি, যেমন তিনি অন্য নবীদের নাম ধরে ডেকেছেন। উদাহরণ স্বরূপ, আল্লাহ তাআলা যখন আদম আলাইহিস সালামকে ইবলিস শয়তানের ব্যপারে সতর্ক করেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেনঃ
অতঃপর আমি বললাম, হে আদম! এই (ইবলীস) তোমার ও তোমার স্ত্রীর শত্রু। সুতরাং, সে যেন কিছুতেই তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করে না দেয়, দিলে তোমরা কষ্ট পাবে। তোমার জন্য (জান্নাতে) এই (নেয়ামত) থাকল যে, তুমি জান্নাতে কখনো ক্ষুধার্ত হবে না এবং নগ্নও হবে না। সেখানে কখনো পিপাসার্ত হবে না এবং রোদ্রে কষ্টও পাবে না। সুরা ত্বোয়া হাঃ ১১৭-১১৯।
অনুরূপভাবে, আল্লাহ তাআলা যখন মুসা আলাইহিস সালাম-এর সাথে তুওয়া উপত্যকায় সরাসরি কথা বলেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেনঃ
হে মুসা! নিশ্চয় আমি হচ্ছি তোমার প্রতিপালক, অতএব তুমি তোমার জুতা খুলে ফেল, কারণ তুমি পবিত্র তুওয়া উপত্যকায় রয়েছ। আমি তোমাকে (রসুল হিসেবে) মনোনীত করেছি; অতএব যেই ওয়াহী (প্রত্যাদেশ) প্রেরণ করা হচ্ছে, তুমি তা মনোযোগের সাথে শ্রবণ কর। নিশ্চয় আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া আর কোন (সত্য) উপাস্য নেই; অতএব তুমি শুধুমাত্র আমারই ইবাদত কর, এবং আমাকে স্মরণ করার জন্য নামায কায়েম কর। সুরা ত্বোয়া হাঃ ১১-১৪।
আল্লাহ তাআলা ইয়াহইয়া আলাইহিস সালামকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন,
হে ইয়াহইয়া! এই কিতাব (তাওরাতকে) তুমি দৃঢ়তার সাথে গ্রহণ কর। সুরা মারইয়ামঃ ১২।  
এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা কুরআনে অন্যান্য নবীদেরকে তাঁদের নাম ধরে সম্বোধন করলেও আমাদের নবীর ক্ষেত্রে তিনি কখনো তাঁর নাম ধরে ডাকেন নি। বরং, সব সময় তাঁর নামকে রিসালাত দ্বারা সম্বোধন করে হে নবী অথবা হে রাসুল বলে ডেকেছেন।
যেমন আল্লাহ তাআলা বলেনঃ হে রসুল! আপনার প্রতিপালকের নিকট হতে আপনার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে (ওয়াহী বা কুরআন ও হাদীস), আপনি তা (মানুষের মাঝে) প্রচার করুন। আপনি যদি তা না করেন, তাহলে তো আপনি তাঁর বার্তা প্রচার করলেন না। সুরা আল-মাইয়িদাহঃ ৬৭।

আল্লাহ তাআলা আরো বলেনঃ হে নবী! আপনি কাফের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন এবং তাদের প্রতি কঠোর হন। তাদের আশ্রয়স্থল হচ্ছে জাহান্নাম, আর তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তন স্থল! সুর তাহরীমঃ ৯।
.
আসুন আমরা সকলেই পড়িঃ
আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিও ওয়া-লা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহীমা ওয়া-লা আলি ইব্রাহীম, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া-লা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারা-কতা আলা ইব্রাহীমা ওয়া-লা আলি ইব্রাহীম, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ