বৃহস্পতিবার, ১৬ জুন, ২০১৬

বিদায় হজ্জের ভাষণ

বিদায় হজ্জের ভাষণ
নবম হিজরীতে হজ্জ ফরয হয়। আর তাবুকের যুদ্ধ সংঘটিত হয় দশম হিজরীতে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজ্জ আদায় করলেন একলক্ষ চৌচল্লিশ হাজার মুসলমান তাঁর সঙ্গে হজ্জ আদায় করেন। এটিই ছিল হাজ্জাতুল ওয়াদা বা বিদায় হজ্জ ইমাম মুসলিম রাহিমাহুল্লাহ সংকলিত নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রিয় সাথী, হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত বিদায় হজ্জের ঐতিহাসিক সেই ভাষণের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিম্নে দেওয়া হল
শুক্রবার, ৯-ই জিলহজ, দশম হিজরী সনে আরাফার দিন দুপুরের পর রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক লক্ষের অধিক সাহাবীর সমাবেশে হজের সময় এই বিখ্যাত ভাষণ দেন হামদ ও সানা (আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগানের) পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ভাষণে ইরশাদ করেনঃ
আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। আল্লাহ তাঁর ওয়াদা পূর্ণ করেছেন তিনি তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন আর তিনি একাই বাতিল শক্তিগুলোকে পরাজিত করেছেন
হে আল্লাহর বান্দারা! আমি তোমাদের আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর বন্দেগীর জন্যে ওয়াসিয়ত করছি (উপদেশ দিচ্ছি) এবং এর নির্দেশ দিচ্ছি। হে লোক সকল! তোমরা আমার কথা শোন এরপর এই স্থানে তোমাদের সাথে আর একত্রিত হতে পারব কি না জানি নাহে লোক সকল! আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, হে মানবজাতি! তোমাদের আমি একজন পুরুষ ও একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন সমাজ ও গোত্রে ভাগ করে দিয়েছি, যাতে করে তোমরা পরস্পরের পরিচয় জানতে পারো তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিকতর সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া (আল্লাহভীতি) অবলম্বন করে) (অর্থাৎ, সব বিষয়ে আল্লাহর কথা অধিক খেয়াল রাখে)
ইসলামে জাতি, শ্রেণীভেদ ও বর্ণবৈষম্য নেই আরবের ওপর কোনো আজম (অনারবে), বা কোন আজমের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই তেমনি সাদার ওপর কালোর বা, কালোর ওপর সাদার কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই মর্যাদার ভিত্তি হলো কেবলমাত্র তাকওয়া 
আল্লাহর ঘরের হিফাযত, সংরক্ষণ ও হাজীদের পানি পান করানোর ব্যবস্থা আগের মতো এখনো বহাল থাকবে হে কুরাইশ সম্প্রদায়ের লোকরা! তোমরা দুনিয়ার বোঝা নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে যেন আল্লাহর সামনে হাযির না হও আমি আল্লাহর বিরুদ্ধে তোমাদের কোনোই উপকার করতে পারব না
যে ব্যক্তি নিজের পিতার স্থলে অপরকে পিতা বলে পরিচয় দেয়, নিজের মাওলা বা অভিভাবককে ছেড়ে দিয়ে অন্য কাউকে মাওলা বা অভিভাবক বলে পরিচয় দেয় তার ওপর আল্লাহর লানত 
ঋণ অবশ্যই ফেরত দিতে হবে প্রত্যেক আমানত তার হকদারের কাছে অবশ্যই আদায় করে দিতে হবে কারো সম্পত্তি সে যদি স্বেচ্ছায় না দেয়, তবে তা অপর কারো জন্য হালাল নয় সুতরাং তোমরা একজন অপরজনের ওপর জুলুম করবে না এমনিভাবে কোনো স্ত্রীর জন্য তার স্বামী সম্পত্তির কোনো কিছু তার সম্মতি ব্যক্তিরেকে কাউকে দেয়া হালাল নয়
যদি কোনো নাক-কান কাটা হাবশি দাসকেও তোমাদের আমীর (নেতা) বানিয়ে দেয়া হয়, তবে সে যতদিন আল্লাহর কিতাব অনুসারে তোমাদের পরিচালিত করবে, ততদিন অবশ্যই তার কথা মানবে, তার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করবে
শোনো, তোমরা তোমাদের প্রভুর ইবাদত করবে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথারীতি আদায় করবে, রমজানের রোজা পালন করবে, স্বেচ্ছায় ও খুশি মনে তোমাদের সম্পদের জাকাত দেবে, তোমাদের রবের ঘর বায়তুল্লাহর হজ্জ করবে আর আমির বা আনুগত্য করবে, তা হলে তোমরা জান্নাতে দাখিল হতে পারবে
হে লোক সকল! আমার পর আর কোনো নবী নেই, আর তোমাদের পর কোনো উম্মতও নেই আমি তোমাদের কাছে দুইটি জিনিস রেখে যাচ্ছি যতদিন তোমরা এ দুটোকে আঁকড়ে থাকবে, ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। সে দুটো হলো আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসুলের সুন্নাত
তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি থেকে বিরত থাকবে। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তীরা দ্বীনের ব্যাপারে এই বাড়াবাড়ির কারণে ধ্বংস হয়েছিলা এই (আরব) ভূমিতে আবার শয়তানের পূজা করা হবে, এ বিষয়ে শয়তান হতাশ হয়ে গেছে কিন্তু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে তোমরা শয়তানে অনুসরণ করা শুরু করবে, আর এতেই সে সন্তুষ্ট হবে সুতরাং, তোমাদের দ্বীনের বিষয়ে তোমরা শয়তান থেকে সাবধান থেকো
শোনো, আজকে তোমরা যারা উপস্থিত আছো, যারা উপস্থিত নেই তাদের কাছে আমার এই বাণী পৌঁছে দিয়ো অনেক সময় দেখা যায়, যার কাছ পৌঁছানো হয়, সে পৌঁছানেওয়ালা ব্যক্তির তুলনায় অধিক সংরক্ষণকারী হয়
যখন আমার ব্যপারে তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তখন তোমরা কী বলবে? সমবেত সবাই একই সাথে উত্তর দিলেনঃ আমরা সাক্ষ্য দিব যে, নিশ্চয়ই আপনি আপনার ওপর অর্পিত আমানত আদায় করেছেন, রিসালতের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন এবং সবাইকে নসিহত করেছেন
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন আকাশের দিকে তাঁর পবিত্র শাহাদাত আংগুল তুলে আবার নিচে মানুষের দিকে নামালেন আর বললেন, হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো। হে আল্লাহ! তুমি সাক্ষী থাকো

আল্লাহুম্মা সোয়াল্লি ওয়া সাল্লিম আলা নাবিয়্যিমা মুহাম্মদ। 

হাদীস কালেকশান

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
(১) দুনিয়া মুমিনদের জন্যে কারাগার, কাফিরদের জন্যে জান্নাত।
(২) আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন, তাকে বিপদে ফেলে পরীক্ষা করেন।
(৩) আমি যা দেখেছি তোমরা যদি তা দেখতে, তাহলে তোমরা সামান্যই হাসতে আর অনেক বেশি কাদতে।
(৪) পরকালের জীবনই হচ্ছে প্রকৃত জীবন।
(৫) দুনিয়া আখেরাতের তুলনায় সামান্য।
(৬) প্রতিটা ভালো কথা সাদাকাহ।
(৭) হয় উত্তম কথা বলো আর নয়তো চুপ থাকো।
(৮) রাগ করোনা।
(৯) যে ব্যক্তি একজনের কথা আরেকজনের কাছে লাগিয়ে বেড়ায়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবেনা।
(১০) দুজন মানুষের ভালোবাসার জন্যে বিয়ের মতো উত্তম আর কিছু হয়না।
(১১) তোমাদের কেউ যেন স্ত্রীদেরকে ঘৃণা না করে।
(১২) দুজন লোকের খাবার তিনজনের জন্যে যথেষ্ঠ, তিনজনের খাবার চার জন লোকের জন্য যথেষ্ঠ।
(১৩) কবুল হজ্জের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই না।
(১৪) যে ব্যক্তি সালাত ত্যাগ করলো, সে কুফুরী করলো।
(১৫) তোমরা কাফিরদের বিরোধীতা করো।
(১৬) আমার উম্মতের লোকদের বয়স হবে ৬০ বছর, আর তাদের খুব অল্পই ৭০ বছরে পৌঁছাবে।
(১৭) যিনাকারী যখন যিনা করে, তখন তার ঈমান থাকেনা।
(১৮) জিহবার কারণে মানুষ সবচাইতে বেশি বিপদগ্রস্থ হয়।
(১৯) দুনিয়া আল্লাহ যাকে ভালোবাসেন তাকে দেন, যাকে ভালোবাসেন না, তাকেও দান করেন। কিন্তু দ্বীন শুধুমাত্র আল্লাহ তাকেই দেন, যাকে তিনি ভালোবাসেন।
(২০) আলেমরা হচ্ছে নবী-রাসুলদের উত্তরাধিকারী।
(২১) যার সর্বশেষ কথা হবে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ", সে (একদিন না একদিন) জান্নাতে যাবে।
(২২) আল্লাহ মানুষের পোশাক বা শরীর দেখেন না, তিনি মানুষের অন্তর ও আমল দেখেন।
(২৩) খারেজীদের বয়স কম হবে, বুদ্ধি মোটা হবে। তারা কুরআন পড়বে, কিন্তু তার অর্থ বুঝবেনা। তারা জাহান্নামের কুকুর।
(২৪) আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।

(২৫) জান্নাতের পানি অত্যন্ত মিষ্টি আর মাটি খুব উর্বর। সর্বনিম্ন জান্নাতীকেও দশটা দুনিয়ার সমান দেওয়া হবে।

যেই পোশাক পরে নারী ও পুরুষেরা জাহান্নামে যাবে

যেই পোশাক পরে নারী ও পুরুষেরা জাহান্নামে যাবেঃ
>> পুরুষঃ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
তিন প্রকার লোক এমন রয়েছে, যাদের সাথে আল্লাহ কথা বলবেন না, আর না কেয়ামতের দিন তাদের দিকে তাকাবেন, আর না তাদের পবিত্র করবেন বরং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।
আমি (আবু হুরাইরা) বললাম, আল্লাহর রাসূল! তারা কারা? ওরা তো ক্ষতিগ্রস্ত!
তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তারা হচ্ছে,
(১) টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী,
(২) ব্যবসার সামগ্রী মিথ্যা কসম দিয়ে বিক্রয়কারী এবং
(৩) কাউকে কিছু দান করার পর তার খোটাদাতা।
সহীহ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, নং ২৯৪।
>> নারীঃ
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, দুই প্রকার জাহান্নামী মানুষ আসবে, যাদেরকে আমি আমার যুগে দেখতে পাচ্ছিনা। এক প্রকার হচ্ছে, ঐ সকল মহিলা যারা কাপড় পরিধান করেও উলংগ থাকবে। তারা সাজ-সজ্জা করে পর পুরুষকে আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও অন্য পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট থাকবে। তাদের মাথার খোপা (সাজ সজ্জা ও ফ্যাশানের দরুণ) উটের কুঁজের মত এদিক ওদিক হেলানো থাকবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, এমনকি তারা জান্নাতের সুগন্ধিটুকুও পাবে না। অথচ, জান্নাতের সুগন্ধি পাঁচশ বছর রাস্তার দূরত্ব থেকেও অনুভব করা যাবে। সহীহ মুসলিমঃ ২১২৮।
শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ এই হাদীসের ব্যখ্যায় বলেছেন,
কাপড় পড়েও উলংগ হচ্ছে সেই সমস্ত নারী, যারা এতো পাতলা কাপড় পরিধান করে যে, কাপড়ের মধ্য দিয়ে তাদের গায়ের চামড়া দেখা যায়, অথবা এমন টাইট পোশাক পরে যে, যার কারণে তাদের শরীরের আকৃতি বোঝা যায়।
মাজমু ফাতাওয়াঃ ১৪৬/২২।
>> জাহান্নামের কঠিন শাস্তির সামান্য বর্ণনাঃ
আল্লাহ তায়া'লা বলেছেন,
নিশ্চয়ই সীমালংঘনকারী অবাধ্য লোকদের জন্যে জাহান্নাম শত্রুর মতো ওত পেতে বসে আছে, তাদেরকে গ্রাস করার জন্য। তারা সেখানে শতকের পর শতক ধরে থাকবে। কিন্তু সেখানে তারা তৃপ্তিদায়ক কোন খাবার বা পানি খেতে পারবেনা। তাদেরকে শুধুমাত্র ফুটন্ত গরম পানি ও দুর্গন্ধযুক্ত পচা পূজ খাওয়ানো হবে। এটাই হচ্ছে তাদের উপযুক্ত প্রতিদান, কারণ তারা হিসাব-নিকাশের কোন পরোয়া করতোনা। আর আমার আয়াত (বা নিদররশন) স্মূহকে মিথ্যা বলতো।
সুরা নাবার ২২-২৮ আয়াতের তর্জমা থেকে নেওয়া। 

সোমবার, ১৩ জুন, ২০১৬

সুরা ত্বোয়া-হা।

সুরা ত্বোয়া-হা।  
এই পৃথিবীর উপরে আজ পর্যন্ত যত মানুষ চলাচল করেছেন, তাঁদের মাঝে শ্রেষ্ঠ মানুষ হচ্ছেন আল্লাহ তাআলার প্রেরিত নবী ও রাসুল যারা, আল্লাহ তাঁদের সকলের প্রতি শান্তি ও দয়া অবতীর্ণ করুন। নবী ও রাসুলদের সঠিক সংখ্যা কত তা জানা যায়না। তবে সমস্ত নবী ও রাসুলদের মধ্যে পাঁচজন নবীকে আল্লাহ তাআলা উলুল আযম বা মহান নবী বলে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। সেই পাঁচজন উলুল আযম নবী হচ্ছেনঃ
(১) হযরত নূহ লাইহিস সালাম,
(২) হযরত ইব্রাহীম লাইহিস সালাম,
(৩) হযরত মুসা লাইহিস সালাম,
(৪) হযরত ঈসা লাইহিস সালাম এবং
(৫) হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
এই পাঁচজন মহান নবীর মধ্যে হযরত মুসা লাইহিস সালাম-এর আশ্চর্যজনক, হৃদয়গ্রাহী ও ঘটনাবহুল জীবন কাহিনী আল্লাহ তাআলা কুরানুল কারীমের বিভিন্ন সুরাতে উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে সুরা ত্বোয়া-হা (২০ নাম্বার সুরার) একেবারে শুরু থেকে আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা লাইহিস সালাম কে নবুওত দান করা, তাঁর সাথে সরাসরি কথা বলা, হযরত মুসা লাইহিস সালাম-এর ফেরাউন ও তার জাতির লোকদেরকে দাওয়াত দেওয়া এবং এনিয়ে ফেরাউনের সাথে শত্রুতা এবং বনী ইসরাঈলীদের বিভিন্ন ঘটনাগুলো বর্ণনা করেছেন।
আপনারা সুরা ত্বোয়া-হা অর্থসহ বুঝে পড়বেন, এই সুরার ঘটনাগুলো সত্যিই পাঠকের হৃদয়ে স্থান করে নেয়। আর যদি সম্ভব হয় তাহলে তাফসীর ইবনে কাসীর অথবা তাফসীর আহসানুল বায়ান থেকে সুরাটির তাফসীর জেনে নিবেন ইন শাআল্লাহ। আজকে আমি সুরাটির প্রথম ২৪টি আয়াতের সরল তর্জমা ও মিশারি রাশিদ আল-আফাসীর সুন্দর একটা তেলাওয়াত আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।
বিঃদ্রঃ অনেকে সন্তানের নাম রাখে ত্বোয়া হা। এটা ঠিক নয়, ত্বোয়াহা দুইটি বিচ্ছিন্ন বর্ণ, এর কি অর্থ আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেনা। ক্বুরআনের এমন আয়াতগুলো বা আরবী বিচ্ছিন্ন হরফ যেমন নূন, মীম, আলিফ...এমন নাম ভালো কোন নাম নয়। আর ভিডিওটা সম্পাদনা করার সময় সুরাটির প্রথম আয়াত ত্বোয়া হা- এর তেলাওয়াতটা স্পষ্ট শোনা যাচ্ছেনা বলে আমি সরি। তবে আপনারা ইউটিউবে পুরো ভিডিওটা পাবেন।  
উযু বিল্লাহিমিনাশ-শাইতানির রাযীম। বিসমিল্লাহির-রাহমানির রাহীম।
(১) ত্বোয়া
হা
(২) তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্য আমি তোমার প্রতি কুরআন নাযিল করিনি।
(৩) বরং, (আমি এই কুরআন নাযিল করেছি) এমন ব্যক্তিকে উপদেশ দেওয়ার জন্য, যে (আল্লাহকে) ভয় করে
(৪) এটা তাঁর নিকট হতে অবতীর্ণ; যিনি সমুচ্চ আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন
(৫) পরম দয়াময় (আল্লাহ) আরশে সমাসীন।
(৬) যা আছে আকাশমন্ডলীতে, পৃথিবীতে, এই দুয়ের মধ্যবর্তী স্থানে ও ভূগর্ভে, তা তাঁরই
(৭) তুমি যদি উচ্চস্বরে কথা বল, তাহলে তিনি তো গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছুই জানেন।
(৮) আল্লাহ, তিনি ছাড়া আর কোন (সত্য) উপাস্য নেই, সমস্ত সুন্দর নাম তাঁরই।
(৯) মুসার খবর তোমার কাছে পৌঁছেছে কি?
(১০) সে যখন আগুন দেখল, তখন তার পরিবারবর্গকে বলল, ‘‘তোমরা এখানে অবস্থান কর। আমি আগুন দেখেছি; সম্ভবতঃ আমি তোমাদের জন্য তা হতে কিছু জ্বলন্ত অঙ্গার আনতে পারব অথবা ওর নিকট কোন পথ প্রদর্শক পাব।’’
(১১) অতঃপর, মুসা যখন আগুনের নিকট আসল, তখন তাঁকে আহবান করে বলা হল, ‘‘হে মূসা!
(১২) নিশ্চয় আমিই তোমার প্রতিপালক, অতএব তুমি তোমার জুতা খুলে ফেল, কারণ তুমি পবিত্র তুওয়া উপত্যকায় রয়েছ।’’
(১৩) আমি তোমাকে মনোনীত করেছি; অতএব যে ওয়াহী (প্রত্যাদেশ) প্রেরণ করা হচ্ছে, তুমি তা মনোযোগের সাথে শ্রবণ কর
(১৪) নিশ্চয় আমিই আল্লাহ, আমি ছাড়া আর কোন (সত্য) উপাস্য নেই; অতএব আমারই বন্দেগী কর, এবং আমাকে স্মরণের জন্য নামায কায়েম কর
(১৫) কেয়ামত তো অবশ্যই আসবে, আমি (এই কেয়ামত কবে আসবে সেটা) গোপন রাখতে চাই; যাতে করে প্রত্যেকেই নিজ কর্ম অনুযায়ী ফল লাভ করতে পারে
(১৬) সুতরাং যে ব্যক্তি কেয়ামতে বিশ্বাস করে না ও নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করে, সে যেন তোমাকে তাতে বিশ্বাস স্থাপন করা থেকে ফিরিয়ে না রাখে। আর যদি তুমি বিশ্বাস না কর, তাহলে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে।
(১৭) হে মূসা! তোমার ডান হাতে ওটা কি?’’
(১৮) সে বলল, ‘‘এটা আমার লাঠি; আমি এই লাঠি দিয়ে ভর দেই এবং এটা দ্বারা আঘাত করে আমি আমার মেষ পালের জন্য গাছের পাতা পেড়ে থাকি এবং এটা আমার অন্যান্য কাজেও লাগে।’’
(১৯) তিনি বললেন, ‘‘হে মূসা তুমি এই লাঠিটা নিক্ষেপ কর।’’
(২০) অতঃপর, সে যখন সেই (লাঠিটা মাটিতে) নিক্ষেপ করল, আর সাথে সাথে (লাঠিটা আল্লাহর কুদরতে) সাপ হয়ে ছুটাছুটি করতে লাগল
(২১) তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘‘তুমি এই (সাপটিকে) ধরো এবং একে ভয় করো না, আমি সাপটিকে এর পূর্বরূপে (লাঠিতে) ফিরিয়ে দেব।
(২২) এবং তুমি তোমার হাত বগলের নীচে রাখো, তুমি যখন তা বের করবে তা বের হয়ে আসবে দোষমুক্ত, উজ্জ্বল হয়ে, (লাঠি সাপ হয়ে যাওয়ার সাথে) আরেকটি নিদর্শন হিসেবে।
(২৩) এটা এই জন্য যে, আমি তোমাকে দেখাব আমার মহা নিদর্শনগুলির কিছু
(২৪) তুমি ফিরআউনের কাছে যাও, নিশ্চয় সে সীমালংঘন করেছে

সুরা ত্বোয়া-হাঃ ১-২৪। 
তেলাওয়াতের ভিডিও লিংক -
https://www.youtube.com/watch?v=IyshT79BjlQ

শনিবার, ১১ জুন, ২০১৬

“কাপড় পড়েও উলংগ” মহিলা কারা?

কাপড় পড়েও উলংগ মহিলা কারা?
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, দুই প্রকার জাহান্নামী মানুষ আসবে, যাদেরকে আমি আমার যুগে দেখতে পাচ্ছিনা। এক প্রকার হচ্ছে, ঐ সকল মহিলা যারা কাপড় পরিধান করেও উলংগ থাকবে তারা সাজ-সজ্জা করে পর পুরুষকে আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও অন্য পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট থাকবে। তাদের মাথার খোপা (সাজ সজ্জা ও ফ্যাশানের দরু) উটের কুঁজের মত এদিক ওদিক হেলানো থাকবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, এমনকি তারা জান্নাতের সুগন্ধিটুকুও পাবে না। অথচ, জান্নাতের সুগন্ধি পাঁচশ বছর রাস্তার দূরত্ব থেকে অনুভব করা যাবে। সহীহ মুসলিমঃ ২১২৮

শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ এই হাদীসের ব্যখ্যায় বলেছেন, কাপড় পড়েও উলংগ হচ্ছে সেই সমস্ত নারী, যারা এতো পাতলা কাপড় পরিধান করে যে, কাপড়ের মধ্য দিয়ে তাদের গায়ের চামড়া দেখা যায়, অথবা এমন টাইট পোশাক পরে যে, যার কারণে তাদের শরীরের আকৃতি বোঝা যায়। মাজমু ফাতাওয়াঃ ১৪৬/২২।

আলেম নয়, মুখাল্লেত

জনপ্রিয় হওয়া এক জিনিস, আর আল্লাহপ্রিয় হওয়া ভিন্ন জিনিসঃ
(১) আমাদের পেইজে নোমান আলী খান এবং তার মতো আরো কিছু জনপ্রিয় ইসলামিক বক্তার সমালোচনা করা হয়ে দেখে একজন প্রশ্ন করেছেন,
আমার প্রশ্ন হল উনার যখন আক্বিদাই ঠিক নাই তাহলে তিনি এত জনপ্রিয় কেন?
উত্তরটা খুব সহজ। আপনি যদি হক্ক কথা না বলেন, শিরক এবং বিদাতের ব্যপারে এবং মুসলমানদের মাঝে যেই সমস্ত পথভ্রষ্ট দলগুলো শিরক ও বিদাতকে লালন-পালন করে, তাদের ব্যপারে চুপ থাকেন, তাহলে দেখবেন
=> লোকেরা সকলেই আপনাকে পছন্দ করবে,
=> আপনার কথা শুনতে চাইবে,
=> আপনাকে তাদের অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যাবে।
কারণ, আপনি তাদের শিরক ও বিদাতের সমালোচনা থেকে বিরত আছেন, এতেই তারা আপনার উপর খুশি হবে।
বিষয়টা আমি আরেকটু স্পষ্ট করে বলি। বিংশ শতাব্দীতে মুসলমানদের মাঝে সৃষ্ট দুইটি বড় বিদাতপন্থী দল হচ্ছে জামাতে ইসলামী (শুরুঃ ১৯৪১ সালে) এবং তাবলীগ জামাত (শুরুঃ ১৯২৭ সালে)। আপনি নোমান আলী খান, মুফতি মেঙ্ক, ইয়াসীর ক্বাদী. . .এমন সেলেব্রিটি স্পিকারদের হাজার হাজার ঘন্টার লেকচার খুঁজে দেখুন, এই সমস্ত বিদাতী দলগুলোর ব্যপারে তাদের কোন সমালোচনা খুঁজে পাবেন না। তাদের ওয়াজ লেকচারে বিদাতপন্থী দলগুলোকে বিদাত বর্জন করে সুন্নাহর দিকে ফিরে আসার জন্যে স্পষ্ট কোন দাওয়াত বা মেসেজ খুঁজে পাবেন না। বরং, অস্পষ্ট বক্তব্য বা আকার-ইংগিতে আপনি তাদেরকে বিদাতপন্থী দলগুলোর ভক্ত, অনুরাগী বা প্রশংসাকারী হিসেবেই পাবেন। স্বাভাবিকভাবে যারা আহলে সুন্নাহর আক্বিদাহ ও মানহাজ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তাদের ভ্রষ্টতার ব্যপারে এমন নীরবতা বা মৌন সম্মতি তাদেরকে খুশি করবে। আর আপনারা হয়তো সকলেই জানেন, মুসলমানদের মাঝে মোট ৭৩টি দলের মাঝে একটিমাত্র দল নাজাত পাবে, আর বাকী ৭২টি দলই জাহান্নামে যাবে। সুতরাং হক্কপন্থী আলেম এবং তাদের অনুসারী সম সময়েই কম হবে, আর বিদাতপন্থী, ভ্রষ্ট আলেম এবং তাদের অনুসারী হবে ঝাঁকে ঝাঁক।
(২) এ ব্যপারে শায়খ মুজাম্মেল হক্ক এর সুন্দর একটা স্ট্যাটাস কপি করছিঃ
আলেম হয়ে যদি আপনি হক্ক কথা বলা আরম্ভ করেন, দেখবেন মানুষ আপনাকে পছন্দ করবেনা। বক্তৃতার মঞ্চে তথাকথিত হেকমত এর ব্যূহ ভেদ করে হক্ক কথা বলুন, দেখবেন আপনাকে তারা হজম করতে পারছেনা। ইমাম হলে কমিটির মর্জির একচুল বাইরে কিছু বলতে পারছেন না। আপনি মানুষের ভুল আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন, এটা আপনার অপরাধ। তাই বন্ধুর সাথে বন্ধুত্ব থাকছেনা। আত্মীয়ের সাথে সম্পর্ক থাকছেনা। নিজ পরিবারের লোক ও আপনাকে নিয়ে সুখ অনুভব করছেনা। উপরন্ত হক্ক কথা না বলতে উপদেশ দিয়ে চলেছে। অদৃশ্য আল্লাহ ছাড়া আপনার জন্য আর কেউ অবশিষ্ট থাকছেনা। এসবই কি নির্মম সত্য নয়? এসবই কি মুমিনের জন্য আখেরাতের বদলায় দুনিয়া বিক্রি নয়? এমনটি কি আল্লাহ আল ক্বুরআনে উল্লেখ করেন নাই? (দেখুন সুরা তাওবাঃ ১১১)।
নবী সালেহ আঃ এর ভাষায় আল্লাহ বলেছেন, হে আমার জনপদের মানুষ! তোমাদের কাছে আল্লাহর বাণী হামেশাই পৌঁছে দিলাম এবং কতইনা উপদেশ দিলাম। কিন্তু সবশেষে এটাই বলতে বাধ্য হলাম যে, তোমরা উপদেশ দান কারীদেরকে পছন্দ করনা। রাফঃ ৭৯।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার সামনে সকল জাতিকে উপস্থিত করা হোল। দেখলাম এক নবী তার সঙ্গে অল্প কিছু মানুষ। আর একজন নবী দেখলাম যার সাথে মাত্র একজন মানুষ। আর একজন নবী যার সাথে দুইজন লোক। এবং দেখলাম আর একজন নবী, যার সাথে কেউ নেই! সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম এবং তিরমিযী।
উপরের আয়াত ও হাদিস প্রমাণ করে যে যিনি প্রকৃত হক পন্থী হবেন, তার জন্যে এমন বাস্তবতার সম্মুখীন হওয়াই স্বাভাবিক। অথচ, আলেম নামের অনেককে দেখি জনপ্রিয় হওয়ার জন্য কি কি না করছেন? সত্যি অবাক লাগে। মনে হয় যেন তারা নবীদের চাইতে বেশি হেকমত জানেন। প্রখ্যাত তাবেঈ, সুফিয়ান আস সাউরি রাহিমাহুলাহ বলেছিলেন, যদি দেখ আলেমের অনেক বন্ধু, তাহলে জেনে নিও সে আলেম নয়, বরং মুখাল্লেত।
**মুখাল্লেত অর্থ মিকচার মেশিন, যার ভিতরে হক বাতিল একসাথে মিশ্রিত হয়।
উম্মতের এই ক্রান্তিলগ্নে, যেখানে আজ মানুষ প্রকাশ্যে শিরক বিদআতে লিপ্ত, সেখানে মিকচার মেশিন কাম্য নয়।
(৩) প্রশ্নকারী আরেকটি প্রশ্ন করেছেন, তাহলে অনেক সহি আক্বীদাহর পেইজে কেনো নোমান আলী খানের লেকচার প্রচার করা হয়?
উত্তরঃ কথিত সেই সমস্ত সহীহ আক্বীদাহর পেইজগুলোও ওদের মতোই। হয় তারা নিজেরা জাহিল, একারণে কার কথা গ্রহণ করা উচিত, কার কথা বর্জন করা উচিত, এ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান নেই। অথবা, তারা জানে তাদের কথা শোনা ঠিক নয়, কিন্তু তাদের লেকচার দিলে কিছু লাইক/শেয়ার বা ফলোয়ার বাড়ে, একারণে জনপ্রিয়তার লোভে সেইগুলো প্রচার করছে। জনপ্রিয়তার প্রতি মোহ খুব খারাপ জিনিস, যা মানুষের ইখলাসকে নষ্ট করে দেয়। আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি।