বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৬

কয়েকটী প্রশ্নের উত্তর

(১) বিয়ে উপলক্ষ্যে মেয়েরা কনের গায়ে এবং ছেলেরা বরের গায়ে হলুদ দিতে পারে, এটা গায়ের রঙ উজ্জ্বল করে। কিন্তু গায়ে হলুদ নামে অনুষ্ঠান করা, গান বাজনা, নৃত্য, নারী পুরুষের বেহায়াপনা, পুরুষদের মদ পান করাএইগুলো বিজাতীয় হিন্দুদের সংস্কৃতি এবং নিকৃষ্ট অপচয় যা ইসলাম সম্মত নয়। বর্তমানে নামধারী কিছু মুসলমান কাফের মুশরেকদের অনুসরণ করে গর্ব বোধ করে, তাদের খারাপ কাজগুলো বর্জন করতে হবে।
(২) মানসুখ শব্দের অর্থ রহিত হওয়া। ইসলামের প্রথম দিকে কিছু বিধান ছিলো সাময়িক, যা পরে ওয়াহী নাযিল করে অন্য বিধান দ্বারা পরিবর্তন করা হয়েছে। প্রথম দিকের ক্বুরানের সেই আয়াত বা হাদীসগুলোকে মানসুখ বলা হয়। ক্বুরানের আয়াত বা যেই হাদীস মানসুখ, সেইগুলোর উপর আমল করা যায় না। বিশেষ দ্রষ্টব্য, জনপ্রিয় কিছু টিভি বক্তা অজ্ঞতাবশত মানসুখ এর বিষয়টিকে অস্বীকার বা অপব্যখ্যা করেছে। আপনারা তাফসীর ইবনে কাসীর থেকে সুরা বাক্বারাহর ১৪২ নম্বর আয়াতের ব্যখ্যা দেখলে আরো বিস্তারিত জানতে পারবেন। 
(৩) যার মজি বেশি বেশি বের হয় যে এমনকি সালাতের সময়েও বের হয়, সে প্রত্যেক ওয়াক্তে সালাতের পূর্বেলজ্জস্থান পানি দ্বারা ধৌত করবে এবং ওযু করে সালাত পড়বে। আর লজ্জাস্থানে টিস্যু বাঁ কাপড় দিয়ে রাখবে যেন কাপড়ে না লাগে। সালাতের পূর্বে সেই টিস্যু পরিবর্তন করে নিবে।
উল্লেখ্য যাদের অসুস্থতা বা রোগের কারণে বারবার বায়ু নিঃসরণের মাধ্যমে বা মজি বের হয়ে ওজু ভেঙ্গে যায় - তারা প্রথমে একবার ওজু করবেন। আর এই এক ওজু দিয়েই এক ওয়াক্তের সমস্ত ফরজ, নফল, সুন্নত নামাজগুলো পড়বেন। মাঝখানে ওজু ভেঙ্গে গেলেও তার নামাজ নষ্ট হবেনা, কারণ তিনি ''মাজুর'' বা অসুস্থ ব্যক্তি। এইভাবেই তিনি নামাজ পড়বেন যতদিন না সুস্থ হচ্ছেন, ইন শ আল্লাহ কোন সমস্যা নেই।
(৪) অপছন্দ সত্ত্বেও অনেকের বাড়ি থেকে ইসলামের মানেনা এমন জাহিল ছেলেদের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়, এটা মহা অন্যায়। অবশ্য সুন্নত মানে এমন ছেলের সংখ্যা বিয়ের বাজারে খুবই কম। একান্তই যদি বিয়ে করতে হয় ছেলের সাথে কথা বলে নিবেন, ছেলেকে দাঁড়ি রাখতে হবে, টাখনুর উপরে কাপড় পড়তে হবে, হালাল জীবিকা অর্জন করতে হবে এবং অবশ্যই সালাত পড়তে হবে। প্রয়োজনে কাবিন নামায় লিখে রাখবেন, এইগুলো না মানলে মেয়ে তালাক নিয়ে নিবে। সমস্যা হচ্ছে এতে করে অনেক ধোকাবাজ লোকেরা সম্পদশালী বাবার টাকা লোভে বা মেয়ের চাকুরির ইনকাম বা সৌন্দর্যের লোভে পড়ে হ্যা করবো বলে বিয়ে করবে ঠিকই, কিন্তু বিয়ের পরে সেই জাহিলই থেকে যাবে। এমতাবস্থায় মেয়ে পড়বে বিপদে। একটা মেয়ে একবার স্বামীর কাছ থেকে ফিরে গেলে, তাতে তার বিন্দুমাত্র দোষ না থাকলেও পরবর্তীতে তাকে প্রতিটা জায়গায় লাঞ্চনার শিকার হতে হয়। সে হয়তো শুধুমাত্র ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সেই ফাসিকের ঘরে পড়ে থাকতে বাধ্য হবে। আর বর্তমান যুগে ফাসিকদের ঘরে থেকে অনেক নারীই নির্যাতনের শিকার ও চরম দুর্ভোগের মাঝে জীবন কাটাচ্ছে। আল্লাহ আমাদের বোনদেরকে হেফাজত করুন এবং আমাদের ভাইদেরকে হেদায়েত করুন।
(৫) অনেক নারী পুরুষ প্রেম ভালোবাসায় লিপ্ত থাকে, জিনা করার পাশাপাশি ফেইসবুকে স্কাইপিতে উলংগ হয়ে ছবি বা ভিডিও আদান-প্রদান করে। টেলিফোনে যৌনতার কথা বলে। এটা অন্তরের, চোখের, কানের জিনা, আর এই জিনা থেকে শীঘ্রই লজ্জাস্থানের জিনা হবে। সুতরাং তোওবা করতে হবে এবং বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ডের চেহারায় মানুষ শয়তান থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। বর্তমান যুগে তরুণ-তরুণীদের জন্যে বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ডের চাইতে বড় দুশমন আর কে আছে? হারাম কাজে আনন্দ সাময়িক কিন্তু তার দুর্ভোগ ও যন্ত্রনা দীর্ঘস্থায়ী।
(৬) অনেকে শুধু সালাম বলে, এটা ঠিক নয়। শুদ্ধ উচ্চারণে পূর্ণ সালাম বলতে বা লিখতে হবে। আস সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু বললে ৩০টা নেকী, আস সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ বললে ২০টি নেকী আর শুধু আস সালামু আলাইকুম বললে ১০টা নেকী।
(৭) ওমান নামক আরব একটি দেশে সুন্নীদের চাইতে খারেজী মতবাদের অনুসারী বেশি, যারা ইবাদী নামে পরিচিত। সেই সমস্ত দেশে বসবাসকারী প্রবাসী ভাইয়েরা এই জঘন্য আকিদাহর অনুসারী লোকদের থেকে সাবধান। এদের মাঝে অনেক বড় বড় শিরক ও কুফর রয়েছে এবং এরা সাহাবাদের দুশমন। আমাদের দেশের কিছু লোক আরব দেশের জাহিল কিছু লোকদের দেখিয়ে নিজেদের ভ্রান্ত ফেরকা সম্পর্কে অহংকার করে। অথচ এরা এটা জানেনা, আরব দেশসমূহে অনেক আরবী ভাষাভাষী খ্রীস্টানও রয়েছে।

(৮) মানুষের খারাপ নাম রাখা ঠিক নয়, এমনকি দুষ্টামি করে বাঁ ফেইসবুকেও না। খারাপ নামের প্রভাব ব্যক্তির উপরে পড়ে। যেমন কারো নাম রাখলো পাথর, এর কারণে তার অন্তর ও আচরণ কঠোর হতে পারে। কারো নাম রাখলো আগুন, তার চরিত্র আগুনের মতো বেপরোয়া হতে পারে। একারণে রাসুলু্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারো নাম খারাপ দেখলে তা পরিবর্তন করে দিতেন। আবার নাম অতি ভালো রাখা যাবেনা। যেমন এঞ্জেল - ফেরেশতা, ইনোসেন্ট - নিষ্পাপ...এমন উচ্চ প্রশংসা বাঁ গর্ব করা হয় এমন নাম রাখা যাবেনা।  

প্রকৃতি পূজারী নাস্তিক

চার্লস ডারউইন এর অনুসারী প্রকৃতি পূজারী নাস্তিকরা দাবী করে, সৃষ্টিকর্তা বলতে কেউ নেই! এই আকাশ-বাতাস, গাছ-পালা,পশু-পাখি, মানুষ. . .এ সবের কোন খালিক্ব বা সৃষ্টিকর্তা নেই। এই সবগুলো নাকি শূণ্য থেকে এমনি এমনি দুনিয়াতে চলে আসছে। নাউযুবিল্লাহি মিন যালিক।

সুবহানাল্লাহ! মানুষ কি পরিমান নির্বোধ আর মাতাল হলে এমন উদ্ভট চিন্তা করতে পারে. . .এই সমস্ত বিকৃত মস্তিষ্কের নাস্তিকেরা বিজ্ঞানী নয়, এরা মানসিক রোগী, এরা চতুষ্পদ জন্তুর চাইতে অধম।
এই সমস্ত মানসিক রোগীদের সাথে তর্ক করবেন না, এদের সাথে তর্ক করা বেকার, কারণ এরা বধির, এরা অন্ধ। খাতামাল্লাহু আলা ক্বুলুবুহুম তাদের কুফুরী ও অবাধ্যতার কারণে তাদের অন্তরে আল্লাহ তালা লাগিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং এদের পেছনে সময় নষ্ট না করে, নিজে ইলম অর্জন করুন, ইলম প্রচার করুন যাতে করে সাধারণ মানুষ এদের গোমরাহীতে না পড়ে। ওয়ামা তোওফিক্বি ইল্লা বিল্লাহ।
ভিডিও চিত্রঃ 
https://www.facebook.com/Back.to.Allah.bangla/videos/1506977042668371/?video_source=pages_finch_main_video
আল্লাহ তাআলার অনিন্দ্য সুন্দর সৃষ্টি ময়ূরের সৌন্দর্য। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায় এমন পাখিটাকে কেউ বানায় নাই, মানুষ হয়ে এমন চিন্তা যে করে, আমরা কি করে তাকে মানুষ বলি?  

মহান আল্লাহ্ তাআলা বলেন, আর আমি সৃষ্টি করেছি জাহান্নামের জন্য বহু জ্বিন ও মানুষ। তাদের অন্তর আছে, কিন্তু তার দ্বারা তারা চিন্তা-ভাবনা করে না, তাদের চোখ আছে কিন্তু তার দ্বারা তারা দেখেনা, আর তাদের কান আছে কিন্তু তার দ্বারা তারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তাদের চাইতেও নিকৃষ্টর। তারাই হল উদাসীন ও শৈথিল্যপরায়ণ। [সুরা আল-আরাফঃ আয়াত ১৭৯]


মহান আল্লাহ্ তাআলা আরো বলেন, আপনি কি তাকে দেখেন না, যে ব্যক্তি তার প্রবৃত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছে? তবুও কি আপনি তার যিম্মাদার হবেন? আপনি কি মনে করেন যে, তাদের অধিকাংশ কথা শোনে অথবা বুঝতে পারে? তারা তো চতুষ্পদ জন্তুর মতোই; বরং তার চাইতেও পথভ্রষ্ট। [সুরা আল-ফুরক্বানঃ আয়াত ৪৩-৪৪]

বুধবার, ২০ জানুয়ারি, ২০১৬

হিজাব-পর্দার বিধানে শিথিলতা

আল্লাহ তায়ালা বলেন,
যে জানে আর যে জানেনা, তারা কি কখনো সমান হতে পারে?
সুরা নূরের আয়াতের অর্থ অনুযায়ী, যেই সমস্ত নারীরা এতো বৃদ্ধ হয়ে গেছে যে তারা পুনরায় বিয়ের জন্যে আশা করেনা, পুরুষেরা যাদের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করবেনা, তাদের জন্যে হিজাব-পর্দার বিধান কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। যদিও ফিতনার আশংকা নেই বললেই চলে, তবুও তারা যদি পূর্ণ হিজাব-পর্দা করে, আল্লাহ বলেছেন সেটা উত্তম। তাহলে এবার চিন্তা করে দেখুন, ১৫-২০ বয়সের বা তার চাইতে কম বা বেশি বয়সী কিশোরী, যুবতী মেয়েরা, যাদের জন্যে পুরুষেরা লালায়িত থাকে, তাদের জন্যে বোরখা ছাড়া চলাফেরা করা আল্লাহর দৃষ্টিতে কতটা নিকৃষ্ট হতে পারে?
আল্লাহ তায়ালা বলেন,

চিন্তা-ভাবনা শুধুমাত্র তারাই করে যারা হচ্ছে উলিল আলবাব (বুদ্ধিমান)।

মুসলমানদের ঘরে যখন কোন শিশু জন্মগ্রহণ করে

মুসলমানদের ঘরে যখন কোন শিশু জন্মগ্রহণ করে তখন তার কানে আযান দেওয়া হয়, কিন্তু সেই আযানের পরে কোন নামায পড়া হয়না। আবার সেই শিশুটি যখন বড় হয়, ৬০ বছর/৭০ বছর হায়াত শেষে মারা যায়, তখন তাকে গোসল করিয়ে তার জানাযার নামায পড়া হয়, কিন্তু সেই নামাযের জন্যে কোন আযান বা ইকামত দেওয়া হয়না। এ ব্যপারটি দ্বারা এই ইশারা রয়েছে যে, মানুষের জীবন আসললে খুবই ছোট, যেন একটা ওয়াক্তের আযান দেওয়া ও তার নামায পড়ার মধ্যে অল্প একটু সময়ের ব্যবধান মাত্র। শেষ বিচারের দিন কাফির, মুশরেক, মুনাফেক ও পাপীষ্ঠরা যখন জাহান্নামের কঠিন শাস্তি দেখবে তখন আফসোস করতে থাকবে আর আল্লাহর কাছে অনুরোধ করে বলবে, হে আল্লাহ আম্্রা আমাদের ভুল বুঝতে পেরেছি। আপনি আমাদেরকে পুনরায় দুনিয়াতে পাঠান, তাহলে আমরা ঈমান আনবো এবং নেক আমল করবো। কিন্তু তাদের এই প্রার্থনা কবুল করা হবেনা। তখন আল্লাহ বলবেন, দুনিয়াতে তোমরা কতদিন অবস্থান করেছিলে? জাহান্নামীরা বলনে, একদিন বা মাত্র এক বেলা। আল্লাহ তখন বলবেন, সত্যিই তোমরা দুনিয়াতে খুব অল্প সময় অবস্থান করেছিলে, যদি তোমরা সেটা বুঝতে পারতে!

(সুরা মুমিনের শেষের দিকের আয়াত অবলম্বনে)

মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৬

আল-সুনান আল-রাওয়াতিব

আল-সুনান আল-রাওয়াতিব
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সালাতের পূর্বে ও পরে মোট ১২ রাকাত সুন্নত সালাত নিয়মিত আদায় করতেন, বিশেষ কোন কারণ ছাড়া তা ত্যাগ করতেন না। এমনকি কখনো অনিচ্ছাকৃতভাবে এই সুন্নত সালাতের কোন একটা ছুটে গেলে পরে তিনি তার কাযা আদায় করে নিতেন। এই ১২ রাকাত সুন্নত সালাতকে আল-সুনান আল-রাওয়াতিব বলা হয়। এই ১২ রাকাত সুন্নত সালাতের অনেক বড় ফযীলত রয়েছে। আল-সুনান আল-রাওয়াতিব এর রাকাত সংখ্যা হছে নিন্মরূপঃ
(১) ফযরের ফরয সালাতের পূর্বে ২ রাকাত।
(২) যোহরের ফরয সালাতের পূর্বে ৪ রাকাত, ফরয সালাতের পরে ২ রাকাত।
(৩) মাগরিবের ফরয সালাতের পরে ২ রাকাত।
(৪) এশার ফরয সালাতের পরে ২ রাকাত।
এই মোট ১২ রাকাত সালাত সুন্নত সালাত পড়ার ফযীলতঃ
মুমিনদের জননী, উম্মে হাবীবাহ রামলা বিনতে আবু সুফিয়ান রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে কোনো মুসলিম ব্যক্তি আল্লাহর (সন্তুষ্টি অর্জনের) জন্য প্রতিদিন ফরয সালাত ছাড়া (অতিরিক্ত) বারো রাকআত সুন্নত সালাত পড়ে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের মধ্যে একটি গৃহ নির্মাণ করেন অথবা তার জন্য জান্নাতে একটি গৃহ নির্মাণ করা হয়।
সহীহ মুসলিমঃ ৭২৮, জামি তিরমিযীঃ ৪১৫, সুনানে নাসায়ীঃ ১৭৯৬, আবু দাউদঃ ১২৫০, ইবনু মাজাহঃ ১১৪১, আহমাদঃ ২৬২৩৫, দারেমীঃ ১২৫০।
কয়েকটি মাসয়ালাঃ
(১) এই ১২ রাকাত সালাত পড়া সুন্নতে মুয়াক্ক্বাদা, ফরয বা ওয়াজিব নয়। তবে এই সালাত পড়ার জন্যে আমাদের যত্নশীল হওয়া উচিৎ, বিনা কারণে অলসতা করা উচিৎ নয়। কারণ, আমাদের অনেকের হয়তো পূর্বে ফরয সালাত ছুটে গেছে, বা বর্তমানে যেই সালাত পড়ছি সেখানে দোষ-ত্রুটি রয়েছে। কিয়ামতের দিন এই ১২ রাকাত সুন্নত সালাত দ্বারা ফরয সালাতের ঘাটতি পূরণ হবে ইন শা আল্লাহ।
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন মানুষের আমলসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম তাদের সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। তিনি বলেন, আমাদের মহান রব্ব ফেরেশতাদেরকে তাঁর বান্দার সালাত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন, যদিও তিনি নিজেই সে সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত আছেন। আল্লাহ বলবেন, তোমরা দেখতো সে ফরয সালাতগুলো পূর্ণরূপে আদায় করেছে, নাকি সেখানে কোন ক্রটি আছে? অতঃপর বান্দার সালাত পরিপূর্ণ হলে তা তদ্রুপই লেখা হবে। আর যদি তাতে কোন ক্রটি-বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়, তবে তিনি (রব্ব) ফেরেশতাদের বলবেন, দেখতো আমার বান্দার কোন সালাত আছে কি? যদি থাকে তবে তিনি বলবেন, তোমরা তার নফল সালাত দ্বারা তার ফরয সালাতের ঘাটতি পূরণ কর। অতঃপর, এইরূপে সমস্ত ফরয আমলের ক্রটি নফল আমল দ্বারা দূরীভূত করা হবে।
সুনানে আবু দাউদঃ ৮৬৪, তিরমিযীঃ ৪১৩, ইবনে মাজাহঃ ১৪২৫।
হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন ইমাম তিরমিযী, ইমাম হাকেম ও শায়খ আলবানী।
(২) পুরুষদের উচিৎ নফল ও সুন্নাত সালাতগুলো ঘরে পড়ার চেষ্টা করা। নফল সুন্নত সালাত ঘরে পড়লে বেশি সওয়াব, আর এতে করে ঘরে আল্লাহর বরকত নাযিল হয় এবং ঘরের নারী ও সন্তানেরা নামাযের প্রতি, ইসলামের প্রতি আগ্রহী হবে। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
তোমাদের কেউ সলাত পড়লে তার কিছু অংশ সে যেন তার ঘরে পড়ে। কারণ তার সলাতের উসীলায় আল্লাহ তার ঘরে প্রাচুর্য দান করেন।
ইবনে মাজাহ, আহমাদঃ ১০৭২৮, ১১১৭৩। তাহক্বীক্বঃ সহীহ, শায়খ আলবানী, সিলসিলাহ আস-সহীহাহঃ ১৩৯২।
আমরা কি জানি প্রতিদিন সুন্নাত সালাতগুলো মসজিদে পড়ে কত বড় সওয়াব থেকে আমরা ঞ্চিত হচ্ছি? দেখুন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি বলেছেন, কোন ব্যক্তির ফরয সালাত ব্যতীত যাবতীয় সালাত আমার মসজিদে আদায় করার চাইতে তা নিজের ঘরে আদায় করা অধিক উত্তম।
সুনানে আবু দাউদ ও সুনানে তিরমিযী, হাদীসটি সহীহ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন,
সুন্নাত-নফল সালাত নিজ ঘরে আদায় করার মর্যাদা মানুষের সামনে আদায় করার চেয়ে তেমন বেশি, যেমন ফরয সালাত ঘরে একাকী আদায় করার চাইতে মসজিদে আদায় করার মর্যাদা বেশি
মুসান্নাফ ইবনে আবদুর রাজ্জাক, সিলসিলা সহীহঃ ৩১৪৯
(৩) মসজিদে ফযর সালাতের জামাতের পূর্বে সুন্নত সালাত পড়তে না পারলে, ফরযের পরে ওয়াক্ত থাকলে সুন্নত সালাত পড়ে নেওয়া যাবে। আর ওয়াক্ত শেষ হয়ে সূর্য উদয় হওয়া শুরু হলে বেলা উঠার পরে সুন্নত সালাত কাজা পড়ে নেওয়া যাবে।  

(৪) যোহরের ফরয সালাতের পূর্বে ৪ রাকাত সুন্নত সালাত এক সালামে একসাথে ৪ রাকাত অথবা, দুই সালামে ২+২=৪, এই দুইভাবেই পড়া জায়েজ আহে। তবে দুই সালামে ২+২=৪, এইভাবে পড়া উত্তম। মসজিদে যোহর সালাতের জামাতের পূর্বের সুন্নত সালাত পড়তে না পারলে, জামাতের পরে ফরযের পূর্বের ৪ সুন্নত সালাত পড়ে নেওয়া যাবে।

সোমবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৬

সুরা হুজুরাতের প্রথম ১০টি আয়াতের তিলাওয়াত, তর্জমা ও তাফসীর

হুজরাহ হচ্ছে থাকার জন্য ছোট ঘর..
_______________________
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পবিত্র স্ত্রী, উম্মুল মুমিনিনদের প্রত্যেকের জন্যে মসজিদে নববীর পাশে আলাদা আলাদা থাকার ছোট ছোট ঘর ছিলো, আরবীতে হুজরাহ বলা হয়। একবার কিছু সংখ্যক (কাফের) লোক তাদের স্বজাতির মধ্যে যারা মুসলমানদের হাতে বন্দী ছিলো, তাদের মুক্তির ব্যপারে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে কথা বলতে মদীনায় আসে। এসময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন একজন উম্মুল মুমিনিনের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তারা বেয়াদবের মতো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করে চিতকার করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে ডাকতে থাকে। এই সুরাতে এই ঘটনাটা উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদের এমন বেয়াদবীর জন্যে নির্বোধ বলে তিরস্কার করা হয়। এই সুরার নামকরণ এই ঘটনার আলোকেই করা হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, আজকে সুরা হুজুরাতের প্রথম ১০টি আয়াতের তিলাওয়াত, তর্জমা ও তাফসীরসহ দেওয়া হলো।
তিলাওয়াতের লিংক -
https://www.youtube.com/watch?v=NWQR7xHCatk
তিলাওয়াত করেছেন ক্বারীঃ ইব্রাহীম আল-জিব্রীন।
আর তাফসীরটুকু নেওয়া হয়েছে - তাফসীর আহসানুল বায়ান থেকে।
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ hadithbd ওয়েবসাইট, তাফসীরটুকু সেখান থেকে সংগৃহীত। 
______________________________
উযু বিল্লাহিমিনাশ-শাইতানির রাযীম। বিসমিল্লাহির-রাহমানির রাহীম।
১. হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের সামনে অগ্রণী হয়োনা এবং আল্লাহকে ভয় কর [ক]। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শুনেন ও জানেন।
তাফসীরঃ [ক] এর অর্থ হলো, দ্বীনের ব্যাপারে নিজে থেকে কোন ফায়সালা করো না (কোন সিদ্ধান্ত নিয়ো না, কোন ফতোয়া দিয়ো না)। এবং স্বীয় বিবেক-বুদ্ধিকে তার উপর প্রাধান্য দিয়ো না। বরং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। নিজের পক্ষ থেকে দ্বীনের সাথে কোন কিছু সংযোজন বা বিদআত রচনা হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলকে অতিক্রম করার এমন দুঃসাহসিকতা, যা কোন ঈমানদারের জন্য শোভনীয় নয়। অনুরূপ কুরআন ও হাদীস নিয়ে যথাযথ গবেষণা ও চিন্তা-ভাবনা না করে কোন ফতোয়া দেওয়া যাবে না এবং ফতোয়া দেওয়ার পর যদি এ কথা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, তা শরীয়তের সুস্পষ্ট বিধির প্রতিকূল, তবে তার উপর অটল থাকাও এই আয়াতে বর্ণিত নির্দেশের পরিপন্থী। মুমিনের কর্তব্যই হল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশাবলীর সামনে আনুগত্যের মস্তক নত করে দেওয়া। নিজের কথা অথবা কোন ইমামের মতের উপর অনড় থাকা তার কর্তব্য নয়।
২. হে ঈমানদারগণ! তোমরা নবীর কন্ঠস্বরের উপর তোমাদের কন্ঠস্বর উঁচু করো না এবং তোমরা একে অপরের সাথে যেরূপ উঁচুস্বরে কথা বল, তাঁর সাথে সেরূপ উঁচুস্বরে কথা বলোনা। এতে এমন হতে পারে যে, তোমাদের সমস্ত আমল নিস্ফল হয়ে যাবে, অথচ তোমরা সামান্য টেরও পাবে না।
তাফসীরঃ এখানে সেই আদব, শ্রদ্ধা, ভক্তি ও মর্যাদা-সম্মানের কথা বর্ণনা করা হয়েছে, যা প্রত্যেক মুসলিমকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্য নিবেদন করতে হয়। প্রথম আদব হল, তাঁর উপস্থিতিতে যখন তোমরা আপোসে কথোপকথন কর, তখন তোমাদের কণ্ঠস্বর যেন তাঁর কণ্ঠস্বরের উপর উঁচু না হয়ে যায়। দ্বিতীয় আদব হল, যখন নবী করীম (সাঃ)-এর সাথে কথোপকথন কর, তখন অতি বিনয়, ভদ্রতা ও ধীরতার সাথে কর। ঐভাবে উচ্চৈঃস্বরে তাঁর সাথে কথা বলো না, যেভাবে তোমরা আপোসে নিঃসংকোচে পরস্পরের সাথে বলে থাক। কেউ বলেছেন, এর অর্থ হল, হে মুহাম্মাদ! হে আহমাদ! বলে ডেকো না, বরং শ্রদ্ধার সাথে হে আল্লাহর রসূল! বলে সম্বোধন করো। যদি আদব ও শ্রদ্ধা-সম্মানের এই দাবীগুলোর খেয়াল না কর, তবে বেআদবী হওয়ার সম্ভাবনা আছে, যার ফলে তোমাদের সৎকর্মাদি নিষ্ফল হয়ে যেতে পারে, অথচ তোমরা তার কোন টেরও পাবে না। এই আয়াতের শানে নুযূল (অবতরণের পটভূমিকা) জানার জন্য দেখুনঃ বুখারী, তাফসীর সূরা হুজুরাত। তবে নির্দেশের দিক দিয়ে আয়াতটি ব্যাপক।
৩. যারা আল্লাহর রসূলের সামনে নিজেদের কন্ঠস্বরকে নীচু করে, আল্লাহ তাদের অন্তরকে তাক্বওয়ার জন্যে শোধিত করেছেন। তাদের জন্যে রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।
তাফসীরঃ এই আয়াতে প্রশংসা করা হয়েছে সেই লোকদের, যাঁরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর মান-মর্যাদার প্রতি খেয়াল করে নিজেদের কণ্ঠস্বর নীচু রাখতেন।
৪. যারা হুজরার আড়াল থেকে আপনাকে উচুস্বরে ডাকে, তাদের অধিকাংশই হচ্ছে নির্বোধ।
তাফসীরঃ এই আয়াত বনী তামীম গোত্রের কিছু বেদুঈন (অভদ্র) লোকদের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে; তারা একদা দুপুর বেলায়, নবী করীম (সাঃ)-এর বিশ্রামের সময়, তাঁর ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে অসভ্য ভঙ্গিতে ওহে মুহাম্মাদ! ওহে মুহাম্মাদ! বলে ডাকাহাঁকা করতে লাগল; যাতে তিনি বেরিয়ে আসেন। (মুসনাদ আহমাদ ৩/৪৮৮, ৬/৩৯৪) মহান আল্লাহ বললেন, তাদের অধিকাংশই অবুঝ। অর্থাৎ, নবী করীম (সাঃ)-এর মান-মর্যাদা, আদব ও শ্রদ্ধার দাবীসমূহের খেয়াল না রাখা হল মূর্খতা।
৫. যদি তারা আপনার বের হয়ে তাদের কাছে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করত, তবে তা-ই তাদের জন্যে মঙ্গলজনক হত [1]। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। [2]
তাফসীরঃ
[1] অর্থাৎ, তোমার বের হওয়ার অপেক্ষা করত এবং তোমাকে ডাকার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো না করত, তবে তা দ্বীন ও দুনিয়া উভয় দিক দিয়ে তাদের জন্য উত্তম হত।
[2] এই জন্য তাদেরকে পাকড়াও করেননি, বরং আগামীতে নবী (সাঃ)-এর প্রতি আদব ও শ্রদ্ধা-সম্মানের খেয়াল রাখার তাকীদ করে দিলেন
৬. হে ঈমানদারগণ! যদি কোন পাপাচারী ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোন সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা সেটা পরীক্ষা করে দেখবে [1], যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোন সম্প্রদায়ের ক্ষতিসাধনে প্রবৃত্ত না হও এবং পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্যে অনুতপ্ত না হও।
তাফসীরঃ [1] এই আয়াতটি অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে অলীদ ইবনে উকবা (রাঃ) সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। যাঁকে নবী করীম (সাঃ) বানু-মুসত্বালিক গোত্রের যাকাত আদায় করার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি (রাস্তা থেকেই ফেরৎ) এসে খামকা রিপোর্ট দিলেন যে, তারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছে। আর এই খবরের ভিত্তিতে নবী করীম (সাঃ) তাদের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণের ইচ্ছা করলেন। কিন্তু পরক্ষণে জানতে পারলেন যে, এ খবর ভুল ছিল এবং অলীদ (রাঃ) সেখানে যানইনি। তবে সনদ ও বাস্তবতা উভয় দিক দিয়ে এই বর্ণনা সহীহ নয়। তাই এই ধরনের কথা রসূল (সাঃ)-এর একজন সাহাবী সম্পর্কে বলা ঠিক নয়। তবে হ্যাঁ, আয়াতের শানে নুযুলের প্রতি দৃকপাত না করেই বলা যায় যে, এতে অতি গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি নীতি বর্ণনা করা হয়েছে, যা বৈয়াক্তিক ও সামাজিক উভয় জীবনে বড় গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক ব্যক্তি এবং প্রত্যেক শাসকের দায়িত্ব হল, তাদের কাছে যে সংবাদই আসে -- বিশেষ করে চরিত্রহীন, ফাসেক (চুগোলখোর, গীবতকারী) ও ফাসাদী প্রকৃতির লোকদের পক্ষ হতে, সে ব্যাপারে প্রথমে যাচাই করে দেখা। যাতে ভুল বুঝে কারো বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়।
৭. তোমরা জেনে রাখ, তোমাদের মধ্যে আল্লাহর রসূল রয়েছেন। তিনি যদি অনেক বিষয়ে তোমাদের আবদার মেনে নেন, তবে তোমরাই কষ্ট পাবে [1]। কিন্তু আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ঈমানের প্রতি মহব্বত (ভালোবাসা) সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং তা তোমাদের হৃদয়ের জন্য পছন্দনীয় করে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে কুফর, পাপাচার ও নাফরমানীর প্রতি তোমাদের অন্তরে ঘৃণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তারাই হচ্চছে সৎপথ অবলম্বনকারী।
তাফসীরঃ [1] আর এর দাবী এই যে, তোমরা তাঁর শ্রদ্ধা ও আনুগত্য কর। কেননা, তিনি তোমাদের ভালাই ও কল্যাণের ব্যাপারে বেশী জানেন। কারণ, তাঁর উপর অহী নাযিল হয়। অতএব তোমরা তাঁর পিছনেই চল। তাঁকে তোমাদের পিছনে চালাবার প্রচেষ্টা করো না। কেননা, তিনি যদি তোমাদের পছন্দনীয় কথাগুলো মানতে আরম্ভ করে দেন, তবে তোমরাই বেশী সমস্যায় পড়ে যাবে। যেমন, অন্যত্র বলেছেন, {وَلَوِ اتَّبَعَ الْحَقُّ أَهْوَاءَهُمْ لَفَسَدَتِ السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ} অর্থাৎ, সত্য যদি তাদের কামনা-বাসনার অনুগামী হত, তাহলে বিশৃংখল হয়ে পড়ত আকাশ-মন্ডলী, পৃথিবী এবং ওদের মধ্যবর্তী সবকিছুই। (সূরা মুমিনূন ৭১ আয়াত)
৮. এটা আল্লাহর কৃপা ও নিয়ামতঃ আল্লাহ সর্বজ্ঞ প্রজ্ঞাময়।
তাফসীরঃ এ আয়াতটিও সাহাবায়ে কিরাম (রাঃ)দের ফযীলতের অধিকারী হওয়ার এবং তাঁদের ঈমান ও হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার জ্বলন্ত প্রমাণ। {وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُوْنَ}
৯. যদি মুমিনদের দুই দল যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দিবে [1]। অতঃপর যদি তাদের একদল অপর দলের উপর আক্রমন করে বসে, তবে তোমরা আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে; যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে [2]। যদি ফিরে আসে, তবে তোমরা তাদের মধ্যে ন্যায় অনুযায়ী মীমাংসা করে দিবে এবং ইনছাফ করবে[3] । নিশ্চয় আল্লাহ ইনছাফকারীদেরকে পছন্দ করেন [4]।
তাফসীরঃ
[1] এই সন্ধির পদ্ধতি হল, তাদেরকে কুরআন ও হাদীসের প্রতি আহবান করতে হবে। অর্থাৎ, কুরআন ও হাদীসের আলোকে তাদের দ্বন্দ্বের সমাধান খুঁজতে হবে।
[2] অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রসূল (সাঃ)-এর বিধানানুসারে নিজেদের দন্ধ মিটাতে না চায়, বরং ঔদ্ধত্য ও বিদ্রোহের পথ অবলম্বন করে, তবে অন্য মুসলিমদের কর্তব্য হবে বিদ্রোহী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা, যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর নির্দেশকে মেনে নিতে প্রস্তুত হয়ে যায়। আলোচ্য আয়াতে বিদ্রোহী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ হাদীসে কোন মুসলিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কুফরী বলা হয়েছে। তো কথা হল, এটা কুফরী তখনই হবে, যখন বিনা কারণে মুসলিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে। কিন্তু এই যুদ্ধের ভিত্তি যদি বিদ্রোহ হয়, তবে এই যুদ্ধ কেবল জায়েযই নয়, বরং তার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, এ যুদ্ধ উত্তম ও তাকীদপ্রাপ্ত। অনুরূপ কুরআন বিদ্রোহী এই দলটিকে বিশ্বাসী (মুমিন) বলেই আখ্যায়িত করেছে; যার অর্থ এই যে, শুধু বিদ্রোহের কারণে, যা মহাপাপ তার ফলে ঐ দলটি ঈমান থেকে খারিজ হয়ে যায় না। যেমন, খাওয়ারিজ এবং কোন কোন মুতাযিলাদের আকীদা-বিশ্বাস। তাদের মতে মহাপাপ সম্পাদনকারীরা ঈমান থেকে বহিষ্কার হয়ে যায়।
[3] অর্থাৎ, বিদ্রোহী দলটি যদি বিদ্রোহাচরণ থেকে আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে আসে, তবে ন্যায়ভাবে অর্থাৎ, কুরআন ও হাদীসের আলোকে উভয় দলের মাঝে মীমাংসা ও সালিস করে দিতে হবে।
[4] আর তাঁর এই ভালবাসার এটাই দাবী যে, তিনি সুবিচারকারীদেরকে উত্তম প্রতিদান দানে ধন্য করবেন।
১০. আর মুমিনরা তো হচ্ছে একে অন্যের ভাই! অতএব, তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করবে [1] এবং আল্লাহকে ভয় করবে, যাতে করে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও [2]।
তাফসীরঃ
[1] এটি পূর্বের নির্দেশেরই তাকীদ স্বরূপ। অর্থাৎ, মুমিনরা যখন পরস্পর ভাই ভাই, তখন তাদের সবার মূল বস্তু হল ঈমান। অতএব, এই মূল বস্তুর দাবী হল, একই ধর্মের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারীরা যেন আপোসে লড়ালড়ি না করে। বরং পরস্পর এক সাথে মিলে-জুলে, একে অপরের দুঃখে-সুখে শরীক হয়ে, পরস্পরকে ভালবেসে এবং একে অপরের হিতাকাঙ্ক্ষী ও কল্যাণকামী হয়ে থাকে। আর যদি কখনও ভুল বুঝাবুঝির ফলে তাদের মধ্যে দূরত্ব ও ঘৃণা সৃষ্টি হয়ে যায়, তবে তা দূর করে তাদের আপোসে পুনরায় সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব কায়েম করতে হবে। (যেহেতু এক মুমিন অপর মুমিনের জন্য আয়না স্বরূপ।) (আরো দেখুন, সূরা তাওবার ৭১নং আয়াতের টীকা)
[2] অর্থাৎ, সমস্ত বিষয়ে আল্লাহকে ভয় কর। সম্ভবতঃ এর ফলে তোমরা আল্লাহর রহমতের অধিকারী হয়ে যাবে। সম্ভাবনা ও আশাব্যঞ্জক কথা সম্বোধিত (মানুষের) দিকে লক্ষ্য করে এ রকম বলা হয়েছে। কেননা, আল্লাহর রহমত ও করুণা তো ঈমানদার ও আল্লাহভীরুদের জন্য নিশ্চিত। পরবর্তী আয়াতগুলিতে মুসলিমদেরকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চারিত্রিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে।

রবিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৬

জালেম স্বামীর জন্যে কি শাস্তি রয়েছে

যে স্বামী তার স্ত্রীর হক্ক আদায় করেনা, স্ত্রীকে অবহেলা ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, তার হক্ক থেকে বঞ্চিত করে, স্ত্রীকে মারধর ও জুলুম অত্যাচার করে. . .এম জালেম বা অত্যাচারী স্বামীর জন্যে কি শাস্তি রয়েছে?
উত্তরঃ ইসলাম ধর্মে সব ধরণের জুলুম-অত্যাচার কঠোরভাবে হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এটা একটা কবীরাহ গুনাহ বা মহাপাপ।
আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা বলেন, হে আমার বান্দারা! আমি আমার নিজের জন্যে জুলুম করা হারাম করে নিয়েছি এবং তোমাদের পরস্পরের মধ্যেও জুলুম হারাম করেছি। সুতরাং তোমরা একজন আরেকজনের উপর জুলুম করো না। সহিহ মুসলিমঃ ২৫৭৭; জামে তিরমিযি।

শুধু জুলুম নয়, জুলুমে সহযোগিতা করা এবং জালিমদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা ও ঘনিষ্ঠতা রক্ষা করাও হারাম। মানুষের ওপর জুলুম এমন এক ভয়াবহ গোনাহ, যার শাস্তি কোনো না কোনো উপায়ে দুনিয়ার জীবনেই শুরু হয়ে যায়। অহংকার ও গর্বের কারণে জালেমরা মনে করে, তাদেরকে কেউ কখনো পাকড়াও করবেনা। অথচ আল্লাহ তাদেরকে সতর্ক করে বলেছেন, যালেমরা শীঘ্রই জানতে পারবে যে, তাদের গন্তব্যস্থল কেমন? সুরা আশ-শুআরাঃ ২২৭।

সেই গন্তব্যস্থল, শেষ বিচারের দিন জালেমদের কি অবস্থা হবে তার বর্ণনাঃ
(হে নবী!) জালেমদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আপনি কখনো আল্লাহ উদাসীন রয়েছে বলে মনে করবেন না। আল্লাহ তো তাদেরকে শুধু একটা নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত ছাড় দিয়েছেন, যেদিন চক্ষুগুলো বিস্ফোরিত হবে, আর জালেমরা মাথা ঊর্ধ্বমুখী করে উঠিপড়ি করে দৌড়াতে থাকবে। তাদের চোখ তাদের নিজেদের দিকে আর ফিরবে না, এবং তাদের হৃদয়গুলো দিশেহারা হয়ে যাবে। মানুষকে আল্লাহর আজাব চলে আসার দিন সম্পর্ক সাবধান করে দিন, যে দিন তাদের কাছে আজাব চলে আসবে। আর জালেমরা সেদিন বলবে, হে আমাদের রব্ব! আমাদেরকে একটু সময়ের জন্য অবকাশ দিন, তাহলে আমরা আপনার ডাকে সাড়া দেব (অন্যের ওপর জুলুম করব না) এবং রাসুলদের অনুসরণ করব। (আল্লাহ তখন বলবেন) তোমরা কি ইতিপূর্বে কসম খেয়ে বলতে না যে, তোমাদের পতন নেই! যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছে, তোমরা তো তাদের বাসস্থানেই বাস করছ এবং সেসব জালেমের সঙ্গে আমি কেমন আচরণ করেছি, তা তোমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। উপরন্তু আমি তোমাদের জন্য বহু উদাহরণ দিয়েছি। সুরা ইব্রাহীমঃ ৪২-৪৫।

জাহান্নামে জালেমদের অনেক ধরণের কঠিন শাস্তি রয়েছে। তার মাঝে জাহান্নামীদের মধ্যে সবচাইতে কম শাস্তি যাকে দেওয়া হবে, তার শাস্তির ধরণ লক্ষ্য করলেই স্পষ্ট হবে জাহান্নাম কি কঠিন জায়গা।
সাহাবী নুমান বিন বশীর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, কেয়ামতের দিন জাহান্নামীদের মাঝে সবচে সহজ ও হালকা শাস্তি দেওয়া হবে যে ব্যক্তির, সে হল তার পায়ের তলাতে দুটো জ্বলন্ত অঙ্গার থাকবে যার কারণে তার মাথার মগজ ছোট মুখ বিশিষ্ট হাড়ির ন্যায় উথলাতে থাকবে। সহীহ বুখারীঃ ৬৫৬২, সহীহ মুসলিমঃ ২১৩।
আর সেখানে চিন্তা করুন জালেমদের শাস্তি কত কঠিন হবে যেখানে স্বয়ং আল্লাহ পূর্বেই তাঁর বান্দাদেরকে এই বলে সতর্ক করে দিয়েছেনঃ নিশ্চয় যারা জালেম, তাদের জন্যে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। সুরা ইব্রাহীমঃ ২২।


আল্লাহ আমাদেরকে কারো উপর জুলুম অত্যাচার করা এবং জুলুম অত্যাচারের শিকার হওয় থেকে রক্ষা করুন, আমাদেরকে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি থেকে রক্ষা করুন, আমিন।