প্রশাসন, নেতৃত্ব ও মুসলিম শাসক নিয়ে কয়েকটি
প্রশ্নের উত্তর
- আনসারুস সুন্নাহ
______________________
১-নং প্রশ্নঃ মুসলিম ‘আমীর’ বা শাসক কে?
উত্তরঃ মুসলিম শাসক হচ্ছে –
ক. যিনি কোন মুসলিম ভূখন্ডের শাসন কর্তৃত্ব দখল
করে আছেন,
খ. যিনি নিজে মুসলিম এবং সালাত পড়েন,
গ. প্রকাশ্য বড় শিরক, কুফুরী অথবা ইসলাম ভংগকারী
কোন কাজে লিপ্ত হয়না,
ঘ. দেশবাসীকে সালাত পড়তে বা দ্বীন ইসলামের মূল
বিধি-বিধান মানতে বাঁধা দেন না,
ঙ. দেশবাসীকে প্রকাশ্য বড় শিরক ও কুফুরী করতে
বাধ্য করেন না,
চ. যিনি ‘আহলুল হাল ওয়াল আক্বদ’ কর্তৃক স্বীকৃত বা মনোনীত। ‘আহলুল হাল ওয়াল আক্বদ’ হচ্ছেন
শীর্ষস্থানীয় আলেম সমাজ, বিভন্ন মুসলিম গোত্রের প্রধান, মুসলিম সামাজের নেতা, এমন নেতৃস্থানীয়
সম্মানিত লোকেরা।
এই গুণগুলো কোন শাসকে মাঝে বিদ্যমান থাকলে তিনি
একজন মুসলিম শাসক। এখন ব্যক্তি জীবনে সেই শাসক নেককার কিংবা অত্যাচারী পাপীষ্ঠ বা জালেম
যাই হয়ে থাকুন না কেনো, যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় থাকবেন ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি মুসলিম
‘আমীর’ বা শাসক বলে বিবেচিত হবেন।
২-নং প্রশ্নঃ মুসলিম ‘আমীর’ বা শাসকের আমাদের উপর কি অধিকার রয়েছে?
উত্তরঃ মুসলিম ‘আমীর’ বা শাসক একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, যার
উপরে মুসলিমদের জাতীয় ও সামাজিক দায়িত্বগুলো ন্যস্ত। সেইজন্যে আমাদের উপরে তার কিছু
অধিকার রয়েছে, তাদের উপরেও আমাদের অধিকার রয়েছে। মুসলিম ‘আমীর’ বা শাসকের অধিকার হচ্ছে,
খুশির সময়ে কিংবা ক্রোধের সময়ে সকল সময়ে তাদের আনুগত্য করা এবং তাদের মেনে চলা।
এমনকি কোন নাক কাটা হাবশি গোলামও (অর্থাৎ, নিচু স্তরের কোন ব্যক্তি) যদি শাসক হয়
তবুও তার আনুগত্য করতে হবে। তারা যদি আমাদের কারো উপর জুলুম অত্যাচার করে, তবুও
তাদের আনুগত্য থেকে বের হওয়া হারাম।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
বলেছেন, “সুখে-দুঃখে, খুশী কিংবা অখুশী উভয় অবস্থাতে,
এবং তোমার ওপর অন্য কাউকে প্রাধান্য দিয়েও যদি আমীর করা নিযুক্ত হয়, তবুও সর্বাবস্থায়
আমীরের নির্দেশ শোনা এবং তার আনুগত্য করা তোমার জন্য বাধ্যতামূলক।”
সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৩৬।
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
আরো বলেছেন, “কোন ব্যক্তি তার আমীরের কোন কাজ অপছন্দ করলে
সে যেন ধৈর্য্য ধারণ করে। কেননা যে ব্যক্তি সরকারের আনুগত্য থেকে এক বিঘত পরিমাণও দূরে
সরে যায় এবং এই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে সে যেন জাহেলী মৃত্যুবরণ করল”।
সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭০৫৩, মুসলিম, হাদীস নং
১৮৪৯।
এনিয়ে আরো অনেক হাদীস রয়েছে। তবে এই আনুগত্য
অবশ্যই জায়েজ কাজে, হারাম কিংবা নাজায়েজ কাজে কোন আনুগত্য নেই। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলেছেন,
“নাফরমানীমূলক কাজে কারো আনুগত্য করা জায়েয নেই।
প্রকৃতপক্ষে আনুগত্য তো কেবল ন্যায় এবং সৎ কাজেই।”
সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৪০।
এনিয়ে বিস্তারিত জানার জন্যে আমাদের এই পোস্ট
দেখুন –
প্রসংগঃ মুসলিম আমীর বা শাসকদের অধিকার
https://www.facebook.com/Back.to.Allah.bangla/posts/1448331918532884:0
______________________
৩-নং প্রশ্নঃ মুসলিম ‘আমীর’ বা শাসকের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ
বা যুদ্ধ ঘোষণা করে তার হুকুম কি?
উত্তরঃ ‘আহলে সুন্নত ওয়াল জামআত’ এর আক্বীদাহ হচ্ছে, মুসলিম ‘আমীর’ বা শাসকের অন্যায়, পাপ বা দ্বীনের ব্যপারে ত্রুটির
কারণে যে ব্যক্তি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে কিংবা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, সে
ব্যক্তি একজন খারেজী। এ ব্যপারে ইমাম আল-বারবাহারি রাহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ৩২৯ হিজরী)
তার লিখিত বিখ্যাত আক্বীদাহর কিতাবে উল্লেখ করেছেন,
“যে ব্যক্তি কোন মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ
(যুদ্ধ) করে সে
১. খারেজীদের অন্তর্ভুক্ত একজন,
২. সে মুসলিমদের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করলো,
৩. সে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীসের বিরোধীতা করলো
এবং
৪. তার মৃত্যু যেন ‘জাহেলী’ যুগের মৃত্যুর মতো।
শরাহুস সুন্নাহঃ পৃষ্ঠা ৪২।
এনিয়ে বিস্তারিত জানার জন্যে আমাদের এই পোস্ট
দেখুন –
“বিদ্রোহ করা আহলে সুন্নতের মূলনীতি বিরোধী”
https://www.facebook.com/Back.to.Allah.bangla/posts/1411518355547574
______________________
৪-নং প্রশ্নঃ উত্তরঃ রাজতন্ত্রের মাধ্যমে ‘মুসলিম শাসক’ নির্বাচন করা কি জায়েজ?
উত্তরঃ মুসলিমদের জন্যে আদর্শ হচ্ছে
নেতৃস্থানীয় শূরা সদস্যরা পারস্পরিক সমঝোতা ও পরামর্শের ভিত্তিতে মুসলিম শাসক নির্বাচন করবেন। যেমনটা আল্লাহ তাআ’লা আদেশ করেছেন, “(মুমিনরা যেন) পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে
কাজ করে।”
সুরা শুরাঃ ৩৮।
শুরা সদস্যের মাধ্যমে শাসক নির্বাচন করা
হচ্ছে সর্বোত্তম। তবে মুসলিমদের ইতিহাসে এর পাশাপাশি, শুরা বিহীন পূর্ববর্তী শাসক
কর্তৃক একার সিদ্ধান্তে পরবর্তী শাসক নিয়োগের অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। যেমন,
আল্লাহ তাআ’লা
সুলাইমান (আঃ) এর বংশধরদেরকে রাজতন্ত্র দিয়ে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিলেন।
অনেক নবীর আমীরে মুয়াবিয়া (রাঃ) নিজ ছেলে
ইয়াজীদকে পরবর্তী শাসক নিয়োগ করে যান যা তখনকার অধিকাংশ সাহাবী তাকে মেনে নেন,
যদিও অনেকেই তাকে সবচাইতে যোগ্য ব্যক্তি মনে করতেন না। কিন্তু শাসক যদি কাউকে
ক্ষমতার অধিকারী দিয়ে যান, তাকে মেনে নেওয়া সাহাবীদের আদর্শ।
রাজন্ত্র সম্পর্কে সংক্ষেপে বলা যায়, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
এর সহীহ হাদীস অনুযায়ী তাঁর মৃত্যুর মাত্র ৩০ বছর পরেই খলিফাহর পরিবর্তে রাজতন্ত্রের
আদর্শে মুসলিম নেতা নিয়োগ করা শুরু হয়। এবং তার পর থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত তুর্কী খেলাফতের
প্রায় পুরোটাই রাজতন্ত্র অনুযায়ী নেতা নির্বাচিত হয়ে আসছে। এই পুরো সময় জুড়ে হাজার
হাজার সাহাবী, তাবেয়ী, চার মাযহাবের ৪ ইমাম, ইমাম আবু হানীফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী
ও ইমাম আহমাদ, হাদীস গ্রন্থগুলোর সংকলনকারী ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিযী,
ইমাম নাসায়ী সহ অন্যান্যরা, পরবর্তী যুগের অন্যান্য মুজতাহিদ ইমামরা যেমন ইবনে তাইমিয়্যা,
ইবনে হাজার আসকালানী, ইমাম নববী, আল্লাহ তাদের সকলের প্রতি রহম করুন, তাদের কেউই এই
ফতোয়া দেন নি যে, “রাজার
ছেলে রাজা হবে, ইসলামী শরিয়াতে এই বিধান হারাম বা কুফুরী।”
সাহাবা, তাবেয়ী কিংবা আমাদের পূর্ববর্তী কোন
আলেম রাজতন্ত্রকে হারাম বলে ফতোয়া দেন নি, সুতরাং আমরা কেউই তাদের আগ বেড়ে
রাজতন্ত্রকে হারাম বলে ফতোয়াবাজি করবোনা। আর এনিয়ে মাওলানা মওদুদী, সাইয়েদ কুতুব,
জামাতে ইসলামী, ইখোয়ানুল মুসলিমিন, হিজবুত তাহরীর, আল-কায়েদাহ, আইসিস, আধুনিক
যুগের পথভ্রষ্ট ব্যক্তি বা দলের মনগড়া ফতোয়ার দিকে লক্ষ্য করবোনা।
এনিয়ে বিস্তারিত জানার জন্যে আমাদের এই পোস্ট
দেখুন –
প্রসংগঃ রাজতন্ত্র কি ইসলামে জায়েজ?
https://www.facebook.com/Back.to.Allah.bangla/posts/804396302926452
______________________