বৃহস্পতিবার, ১ জুন, ২০১৭

দাস-দাসীদের নিয়ে প্রশ্নের উত্তর

দাস-দাসীদের নিয়ে প্রশ্নের উত্তরঃ
দীর্ঘদিন ধরে আমাদের পেইজের অনেক দ্বীন ভাই ও বোনদের প্রশ্ন ও অনুরোধের প্রেক্ষিতে আজকে দাসপ্রথা সম্পর্কে কিছু কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।
কোন জিহাদে বিজয় লাভের ফলে কাফের পুরুষ বা নারী যদি যুদ্ধবন্দী হিসেবে মুসলমানদের হাতে ধরা পড়ে, তাহলে মুসলমানদের খলিফা বা বৈধ নেতা সেই কাফেরদের ব্যপারে নীচের যেকোন একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারেনঃ
(ক) প্রাপ্ত বয়ষ্ক কাফের পুরুষদের কৃত অপরাধের কারণে তাদেরকে হত্যা করতে পারেন।
(খ) কোন শর্ত ছাড়াই তাদেরকে সাধারণ ক্ষমা করে তাদেরকে মুক্তি দিতে পারেন।
(গ) মুক্তিপণের বিনিময়ে তাদেরকে মুক্ত করে দিতে পারেন।
(ঘ) কাফেরদের হাতে ধৃত মুসলমান বন্দীর বিনিময়ে তাদেরকে মুক্তি দিতে পারেন।
(ঙ) তাদেরকে দাস ও দাসী হিসেবে বন্দী করে রাখতে পারেন।
উপরোক্ত পঞ্চম পদ্ধতিতে কোন কাফের যদি মুসলমানদের হাতে ধরা পড়ে, তাহলে তাকে দাস/দাসী বানানো হবে। মুসলমানদের খলিফা বা বৈধ নেতা মুজাহিদ বা মুসলমান যোদ্ধাদের মাঝে গনীমত এর সম্পদ বন্টনের ইসলামী নিয়ম অনুযায়ী দাস-দাসী ভাগ করে দেবেন। এই হচ্ছে ইসলামে দাস বা দাসীর বিধান। উল্লেখ্য, যুদ্ধে লব্ধ দাস-দাসী কোন মুজাহিদ নিজে রাখতে পারেন, কিংবা তার প্রয়োজনে অন্য কারো কাছে বিক্রি করতে পারেন। এইভাবে কেনা-বেচা বৈধ। সেই দাসী-দাসীকে যতদিন পর্যন্ত না তার মালিক মুক্ত করে দিচ্ছে, তারা মালিকের কাছে বন্দী হিসেবে থাকবে।
.
অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, কেনো তাদেরকে দাস-দাসী বানানো হবে? মানুষ হিসেবে তাদের কি স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার নেই।
উত্তর হচ্ছে,
(১) তারা তাদের কৃত অপরাধ যেমন কুফুরী, শিরক, ইসলাম গ্রহণ না করা, মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কারণে আল্লাহর নাযিলকৃত শরিয়ত অনুযায়ী স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার হারিয়েছে।
(২) ইসলামের বিরুদ্ধে কঠোর, যুদ্ধে আটক এমন শত্রুদেরকে যদি মুক্ত করে দেওয়া হয়, তাহলে তারা ভবিষ্যতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ করবে, মুসলমানদের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। 
(৩) নিজের জীবন ও সম্পদকে ঝুঁকিতে ফেলে আল্লাহ তাআলার মহান দ্বীনকে সমুন্নত করার জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য অন্যান্য গনীমতের সম্পদের সাথে দাস-দাসী হচ্ছে মুজাহিদ ভাইদের জন্য উপহার স্বরূপ।
(৪) দাস-দাসীদেরকে কাজে লাগিয়ে মুসলিমরা উপকৃত হবে।
(৫) দাসীর গর্ভ সঞ্চার দ্বারা মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।
উল্লেখিত কারণ সমূহের জন্য তাদেরকে হত্যা না করে তাদেরকে বন্দী করে দাস-দাসী বানানো হবে, মুসলমানেরা তাদের দ্বারা উপকৃত হবে। কোন কাফেরকে হত্যা না করে যদি তাকে দাস/দাসী বানানো হয়, তাহলে মূলত তার উপর অনেক বড় রহম করা হয়। কেননা, যুদ্ধে ধরা পড়ার পর যদি তাকে কাফের অবস্থায় সরাসরি হত্যা করা হয়, এমতাবস্থায় সে চির জাহান্নামী হবে। আর যদি তাকে দাস/দাসী বানিয়ে রাখা হয়, তাহলে আশা করে যেতে পারে যে, মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে সে ইসলাম ধর্ম কবুল করে পরকালে মহা ভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে।
কোন কাফের মহিলা, যে মুসলমানদের হাতে ধরা পড়েছে এবং কোন মুসলমানের অধীনে দাসী হিসেবে রয়েছে, ঐ দাসীর মালিকের জন্য সেই দাসীকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে অথবা, বিয়ে ব্যতীত দাসীর মালিক হিসেবে তার সাথে যৌন সম্পর্ক করতে পারে। ইসলাম এর অনুমতি দিয়েছে। দলীলঃ
(১) মহান আল্লাহ তাআলা মুমিনদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে ক্বুরআনুল কারীমে উল্লেখ করেছেনঃ
উযুবিল্লা-হিমিনাশ শায়তানীর রাজীম। যারা নিজেদের যৌন অঙ্গকে সংযত রাখে। নিজেদের পত্নী অথবা অধিকারভুক্ত দাসী ব্যতীত; এতে তারা নিন্দনীয় হবে না সুরা মুমিনুনঃ আয়াত ৫-৬।
(২) আওতাস এর যুদ্ধে মুসলমানদের হাতে ধৃত কাফের যুদ্ধ বন্দীদের সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, তোমরা গর্ভবতী নারীর সাথে সঙ্গম করো না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে সন্তান প্রসব করে এবং যে নারী গর্ভবতী নয়, তার সাথে (সঙ্গম) করো না যতক্ষণ পর্যন্ত না তার একটি ঋতুচক্র সম্পন্ন হয় আবু দাউদঃ ২১৫৭, হাদীসটি সহীহ, শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ।
(৩) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুনাইনর যুদ্ধের দিন বলেছিলেন, আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী ব্যক্তির জন্য বৈধ নয় অন্যের ফসলে পানি দেওয়া (অর্থাৎ কোন গর্ভবতী নারীর সাথে সঙ্গম করা)। এবং আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী ব্যক্তির জন্য বৈধ নয়, কোন যুদ্ধবন্দিনী নারীর সাথে সঙ্গম করা, যতক্ষণ পর্যন্ত না এটা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, সে গর্ভবতী নয়। এবং আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী ব্যক্তির জন্য বৈধ নয়, বণ্টন হবার পূর্বে গনীমতের কোন সম্পদ বিক্রয় করা। আবু দাউদঃ ২১৫৮, হাদীসটি হাসান, শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ।
উপরের ক্বুরআনের আয়াত এবং সহীহ হাদীস দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমানিত হয় যে, মুসলমান পুরুষদের জন্য তার অধিকারভুক্ত দাসীর সাথে যৌন সম্পর্ক করা জায়েজ।
দাস-দাসী নিয়ে কতগুলো প্রায়ই জিজ্ঞাস করা হয় এমন কতগুলো প্রশ্নের উত্তরঃ
(১) একজন ব্যক্তি স্ত্রীর পাশাপাশি তার ইচ্ছা, সামর্থ্য ও চাহিদা অনুযায়ী বৈধ উপায়ে প্রাপ্ত এক বা একাধিক দাসী রাখতে পারে। এতে তার স্ত্রীর অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই।  
(২) একজন ব্যক্তির বৈধ উপায়ে প্রাপ্ত দাসীর সাথে বিবাহ ছাড়া যৌন সম্পর্ক জায়েজ আছে, এটা জিনা বা ব্যভিচার নয়। আল্লাহ তাআলা এর অনুমতি দিয়েছেন। এই নিয়ম কারো ভালো লাগুক, বা খারাপ লাগুক, তাতে কিছু যায় আসেনা। আল্লাহ তাআলা যা বলেন, সেটাই চূড়ান্ত। আল্লাহর কোন বিধানের ব্যপারে প্রশ্ন তোলা, তার সমালোচনা করা কুফুরী কাজ। যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানকে ঘৃণা করে, তার সমালোচনা করে কিংবা অস্বীকার করে, তাহলে সেই ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে। যদিও সে নামায, পড়ে, যদিও সে রোযা করে এবং নিজেকে মুসলমান বলে দাবী করে। কিন্তু অন্তরে কুফুরী রাখার কারণে সে কাফের, চির জাহান্নামী হয়ে যাবে। আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন, আমিন।
(৩) মুসলমানেরা দুর্বল হয়ে যাওয়ায় এবং কাফেরদের সাথে নিয়মিত জিহাদ চালু না থাকায় বর্তমান যুগে বিশ্বের কোথাও কোন দাস/দাসী নেই। তবে ভবিষ্যতে যদি মুসলমানেরা শক্তিশালী হয় এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে, তাহলে কোন যুদ্ধবন্দী ধরা পড়লে মুসলমানদের ইমাম প্রথমে উল্লেখিত পাঁচটির যেকোন একটি পদ্ধতি অবলম্বন করবেন। আর সে হিসাবে তখন মুসলমানদের হাতে পুনরায় দাস/দাসী আসতে পারে। 
(৪) বর্তমানে যেই সমস্ত পুরুষ ও নারীরা বাসা-বাড়িতে কাজ করে এরা মোটেও দাস-দাসী নয়, এরা হচ্ছে কর্মচারী বা শ্রমিক। দাস-দাসী এবং কর্মচারী/শ্রমিক সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস।
(৫) কোন পুরুষ যদি বাসা-বাড়িতে কাজের মহিলাদের সাথে যৌন সম্পর্ক করে এবং ইসলামী আদালাতে তা প্রমানিত হয়, তাহলে তাকে ইসলামী দন্ড বিধি অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হবে। সে অবিবাহিত হলে তাকে ১০০-টা দোররা মারা হবে। আর সে যদি বিবাহিত হয়, তাহলে তাকে রজম করে হত্যা করা হবে।
(৬) দাস-দাসীর বিধান মানসুখ বা রহিত হয়ে যায়নি। যারা বলে দাসীর বিধান বর্তমানে রহিত হয়ে গেছে তার মনগড়া, ভুল কথা বলে। হক্ক কথা হচ্ছে, দাস-দাসী বিদ্যমান না থাকায় এ সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীসগুলো বর্তমানে আমল করা হচ্ছেনা। তবে ভবিষ্যত যদি দাস-দাসী আসে, তখন এ সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীসের বিধানগুলো পুনরায় চালু হবে।
(৭) ইসলামী শরিয়াত অনুযায়ী কোন দাসী তার মনিবের সাথে যৌন সম্পর্ককে অস্বীকৃতি জানাতে পারেনা, যেমন কোন স্বাধীন মহিলা তার স্বামীকে না করতে পারেনা। মোহর দ্বারা বিয়ে করার বিনিময়ে যেমন স্ত্রীর লজ্জাস্থানকে হালাল করে নেওয়া হয়, ঠিক তেমনি কোন দাসীর উপর তার মনিবের ঠিক তেমনি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
(৮) হে মুসলমান ভাই ও বোনেরা সাবধান! কাফেরদেরকে দাস দাসী বানানো সম্পর্কিত জ্ঞানের অভাবে অনেক মুসলিম ইসলামের এই বিধানকে সমালোচনা করে বা ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখে, নিজের মনগড়া অপব্যখ্যা দাঁড় করায়। একজন ইউটিউব বক্তা যে কিনা খৃস্টান থেকে মুসলমান হয়েছিলো, কিন্তু ইসলামে দাসের বিধান পড়ে সে ২০১৬ সালে মুরতাদ হয়ে যায়। অথচ ইসলাম গ্রহণের পর থেকে সে দীর্ঘদিন ধরে ইউটিউবে ইসলামের উপর লেকচার দিত এবং কাফের মুশরেকদের বিরুদ্ধে ইসলামের পক্ষে কথা বলতো। অজ্ঞতা মানুষে বড় দুশমন, আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন, আমিন।  

(৯) দাস-দাসী সম্পর্কিত ইসলামের বিধি-বিধান অনেক দীর্ঘ ও ব্যখ্যাসাপেক্ষ। এ সম্পর্কিত সামান্য কিছু কথা এখানে তুলে ধরা হলো। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর দ্বীনকে সঠিকভাবে জানার ও মানার তোওফিক দান করুন, আমিন। 

বৃহস্পতিবার, ২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭

মানুষের বিপদ ও দুর্ভাগ্যের কারণ

মানুষের বিপদ ও দুর্ভাগ্যের কারণঃ
(১) আল্লাহর প্রতি প্রকৃত ভয় ও যথার্থ ভালোবাসা না থাকা
(২) নামায না পড়া, নামাযে অবহেলা করা।   
(৩) পিতা-মাতাকে অসম্মান করা, তাদের অবাধ্য হওয়া 
(৪) দুনিয়াকে অত্যাধিক ভালোবাসা ও আখেরাতের চাইতে দুনিয়াকে প্রধান্য দেওয়া
(৫) পরনারী / পরপুরুষের প্রতি অন্তর লালায়িত থাকা  
(৬) নিজেকে নিজে বড় মনে করা ও অন্তরে অহংকার লালন করা  
(৭) অন্তরে হিংসা, ক্রোধ বা প্রতিশোধ পরায়ন মনোভাব রাখা 
(৮) জনপ্রিয়তা, সুনাম ও মানুষের মাঝে নিজেকে প্রকাশ করার প্রতি মোহ  
(৯) স্বামীর অবাধ্য হওয়া 
(১০) স্ত্রীর হক্ক নষ্ট করা  
(১১) ক্বুরআন না পড়া, ক্বুরআন থেকে দূরে থাকা  
(১২) প্রকৃত আলেমদেরকে চিনতে না পারা, তাদের সম্মান ও মূল্য বুঝতে ব্যর্থ হওয়া
(১৩) পথভ্রষ্ট, বিদআতী, জাহেল লোকদেরকে আলেম মনে করে প্রতারণার শিকার হওয়া
(১৪) সন্তানদেরকে দ্বীন শিক্ষা না দেওয়া, দ্বীনি পরিবেশ থেকে দূরে রাখা, তাদেরকে পাপাচারে ছেড়ে দেওয়া
(১৫) টিভি বা রেডিওতে হারাম অনুষ্ঠান দেখা বা শোনা  
(১৬) বাজে কিংবা বেহুদা কথা ও কাজের দ্বারা ফেইসবুক, ইন্টারনেটে সময় নষ্ট করা
(১৭) মানুষের সাথে তর্ক কিংবা বিবাদে লিপ্ত হওয়া  
(১৮) বেশি কথা বলা, পানাহার বেশি করা ও অধিক ঘুমে অভ্যস্ত হওয়া 
(১৯) গায়ের মাহরাম নারী/পুরুষের সাথে পর্দাহীন মিলা-মিশা করা, বন্ধুত্ব, নির্জনে একাকী দেখা-সাক্ষাত ও অবস্থান করা, প্রাইভেটে কথা বলা  
(২০) কাফির জাতি ও তাদের সংস্কৃতি-সভ্যতা, ফ্যাশানের অনুকরণ করা, সেইগুলোকে উত্তম বলে ধারণা করা
(২১) তোওবা না করে ক্রমাগত পাপ কাজে লিপ্ত থাকা  
(২২) যিনা-ব্যভিচার, পরকীয়ায় লিপ্ত থাকা, স্বামী/স্ত্রীকে ধোঁকা দেওয়া, হস্ত-মৈথুন, পর্নোগ্রাফী, ঋতু অবস্থায় বা পায়ুপথে স্ত্রীর সাথে সহবাস করা, এমন যেকোন অশ্লীল কাজে লিপ্ত থাকা
(২৩) কঠোর প্রকৃতির, বদ মেজাজী ও দুশ্চরিত্রের অধিকারী হওয়া 
(২৪) শুদ্ধ উচ্চারণে ক্বুরআন পড়তে না পারা 
(২৫) পাপাচারে লিপ্ত থাকা কিংবা বিদআতী দলের অন্তর্ভুক্ত থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা
(২৬) আল্লাহ সম্পর্কে, দ্বীনের ব্যপারে ওয়াসওয়াসা (সন্দেহের) মাঝে পড়া 
(২৭) কু-প্রবৃত্তির অনুসরণ করা
(২৮) হারাম উপার্জনের উপর খুশি থাকা
(২৯) নিজেকে আল্লাহওয়ালা, জ্ঞানী লোক বলে আত্মতৃপ্তি বোধ করা 
(৩০) মৃত্যু, কবরের আযাব ও আখেরাতকে ভুলে থাকা

সোমবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০১৭

লজ্জা ছাড়া, তাক্বওয়া ছাড়া মিলবে কি সেই সফলতা?

টিভি, ফেইসবুক, ইন্টারনেট, ইউটিউব সহ আধুনিক যুগের বিভিন্ন মিডিয়াগুলোতে থেকে জনপ্রিয়তা পাওয়া অল্প ইলম সম্পন্ন, সেলেব্রিটি বক্তা ও লিখকদের কাছ থেকে যারা দ্বীন শিখে থাকেন, তাদের অনেকে আলেমদের মর্যাদা ও গুরুত্বকে অস্বীকার করেন, কথায় কথায় আলেমদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন। তাদের অনেকের স্লোগান হচ্ছেঃ
(ক) আমি শুধু কুরআন ও হাদীস মানি, কোন আলেমের তাকলীদ করিনা।
(খ) শুধু কুরআন ও হাদীসই যথেষ্ঠ, শরিয়ত মানার জন্য কোন আলেম লাগে না।
(গ) আলেমদেরকে মানা হারাম।
যদিও তারা নিজেরা কুরআন ও হাদীস বুঝে না, বুঝার মতো যোগ্যতা তাদের নেই, কিন্তু দুই-চারজন বক্তার টুটা-ফাটা কিছু বক্তব্য গ্রহণ করে তোতা পাখির মতো বুলি আওড়ান। এইভাবে তারা মনে করছেন, তারা কুরআন-হাদীস মানছেন, অথচ প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে তারা আসলে তাদের বক্তা সাহেবের অন্ধ অনুকরণ করছেন। অনেকে আবার অল্প ইলমের উপর সওয়ার হয়ে নিজে নিজে ফতোয়া বিলি করে বেড়ান, এইভাবে নিজেরা পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত হচ্ছেন, অন্যদের জন্য ফিতনা সৃষ্টি করছেন। এমন ব্যক্তিদের বক্তব্যের অসারতা তুলে ধরে শায়খ মুজাম্মেল হক্ক হাফিজাহুল্লাহ লিখেছেনঃ
লজ্জা ছাড়া, তাক্বওয়া ছাড়া মিলবে কি সেই সফলতা?
আলেমের মুল্য সকল সৃষ্টির উপরে মুসলমান হয়ে তা অস্বীকার করার উপায় নাই আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন
(১) সে আমার উম্মতের কেউনা, যে বড়দের সম্মান করেনা, ছোটদের স্নেহ করেনা এবং আলেমদের অধিকার বুঝেনা সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম
(২) আলেমের সম্মান আবেদের তুলনায় এমন, যেমন নাকি আমার সম্মান তোমাদের মধ্যে অতি সাধারন একটি মানুষের উপর সুনানে তিরমিযী।
(৩) আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতারা, আসমান ও জমিনের সকল বাসিন্দা, এমনকি গর্তের একটি পিঁপড়া এবং পানির নীচের মাছগুলিও সেই আলেমের জন্যে দুয়া করে, যিনি মানুষকে উত্তম শিক্ষা দান করেন সুনানে তিরমিযী।
(৪) আল্লাহ আলেমদেরকে তার তাওহীদ (একত্ববাদের) পক্ষে সাক্ষী বানিয়েছেন, ফেরেশতাদের পরেই স্থান দিয়েছেন। মহান আল্লাহ তাআআল বলেন, আল্লাহ সাক্ষ্য দেন, তিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নেই ফেরেশতা এবং আলেমগন ইনসাফের ভিত্তিতে উক্ত সাক্ষ্য প্রদান করেন সুরা আলে-ইমরানঃ ১৮
(৫) (যেসব উপমা দেওয়া হলো, তা) আলেমগন ছাড়া কেউ বুঝবেনা সুরা আনকাবুতঃ ৪৩
(৬) সকল বান্দাদের মধ্যে আলেমগনের আল্লাহ ভীতিই হচ্ছে প্রকৃত ভীতি সুরা ফাতিরঃ ২৮
(৭) যে জানে, আর যে জানেনা, তারা কি কখনো সমান হতে পারে?
(৮) যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় অনেক উঁচু করবেন সুরা মুজাদালাঃ ১১
বর্তমান যুগে অনেকের মনোভাব এমন রয়েছে, মনে হয় যেন আলেমের মানহানি করতে, মূল্য হ্রাস করতে, আলেমদেরকে একঘরে করতে শয়তানের সম্মিলিত বাহিনী আদা-জল খেয়ে লেগেছে! ঝাঁক ঝাঁক মুন্সি সাহেব (ইলম বিহীন নকলকারী ব্যক্তি) কোত্থেকে উড়ে এসে আলেম-উলামার স্থানে জুড়ে বসছেন (মুন্সি সাহেবরা) খুতবাহ দিচ্ছেন, আর আলেম-ফকীহ তাদের কথা শুনতে বাধ্য হচ্ছেন মুন্সিরা নামায পড়ান, আর আলেম মুক্তাদী হয়ে পিছনে দাঁড়ান মুন্সিরা মজলিসের রওনাক, আর ELOQUENT (বাক্যবাগীশ) আলেম ও বক্তা তাদের কথাগুলো গলাধঃকরন করার চেষ্টা করেন তাদের কেউ দুই-একদিন টোপলা নিয়ে ঘুরেছেন কেউ কয় ক্লাস স্কুল-কলেজে সাইয়েন্স, অংক, ইতিহাস পড়ে ফকীহ হয়েছেন! তারা কুরআনের তাফসীরও করেন, উম্মতকে দিক-নির্দেশনা দেন, ইসলামী দর্শনের জন্ম দেন তারা আলেমদেরকে কোন কাজের যোগ্য মনে করেন না, এমন কি দ্বীনের কাজেও না আলেমরা দ্বীন বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন, অনেকে এমনটি বলেও থাকেন তারা আলেম উলামার দাঁত দেখেন, সাইজ মাপেন আলেমদেরকে নিয়ে যেমন ইচ্ছে তেমন ব্যংগ-বিদ্রুপ করেন 
এমন মুন্সি সাহেবরা যেমন আলেমদের স্থান দখল করে নিজদেরকে আলেমদের থেকে দূরে রাখছেন, তেমনি জনগণকেও আলেম থেকে সরিয়ে রাখছেন এটাই প্রকৃত সাদ্দুন আন সাবিলিল্লাহ বা আল্লাহর রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা, যা আল্লাহর কিতাবে বলা হয়েছে
প্রশ্ন জাগে, এমন ব্যক্তিদের আদৌ কোন লজ্জাবোধ আছে কি? আদৌ তাঁরা আল্লাহকে ভয় করেন কি? তাক্বওয়া ও লজ্জাবোধ ছাড়া মুত্তাক্বী হওয়ার কোন বিকল্প রাস্তা আছে কি? মুত্তাক্বী না হতে পারলে, কেয়ামতে সফলতা লাভের কোন চোরা-গলি আছে কি?

এমনই যদি চলতে থাকে, তাহলে আল্লাহর গজব থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে কি? দ্বীনের ব্যপারে এমন প্রতিবন্ধকতা যারা সৃষ্টি করে, আর যারা তাদের ব্যপারে নীরবতা অবলম্বন করে, সকলেই কি সমান দায়ী নয়?

দ্বীনি জ্ঞানের পরীক্ষা (পর্ব-১)

দ্বীনি জ্ঞানের পরীক্ষা (পর্ব-১)
পূর্ণ নম্বরঃ ৩০, সময় ৩০ মিনিট। আপনারা প্রথমে উত্তর না দেখে নিজেরা একটা খাতায় উত্তর লিখার চেষ্টা করুন। এরপরে প্রদত্ত উত্তরের সাথে মিলিয়ে আপনাদের প্রাপ্ত নম্বর বের করুন।
এক কথায় উত্তর দিনঃ
প্রতিটি প্রশ্নের জন্যে এক নম্বর করে, মোট ১৫*১=১৫ নম্বর 
(১) কুআনের কোন সুরাটিকে উম্মুল কিতাব বলা হয়?
(২) হাদীসে কুদসী কি?
(৩) কোন আয়াতে সুদকে হারাম করা হয়েছে?
(৪) হুদাইবিয়ার সন্ধি কত হিজরীতে সংঘটিত হয়েছিলো?
(৫) মুসলিমদের প্রথম লিখিত সংবিধান কোনটি?
(৬) কোন সুরাতে বিসমিল্লাহ-হির রাহমানির রাহীম দুইবার রয়েছে?
(৭) ইয়াসরিব কি?
(৮) মুজাদ্দিদ কে? ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মুজাদ্দিদ কাকে বলা হয়?
(৯) কাকে যিন-নুরাইন বলা হয়?
(১০) বনী ঈসরাইলীদের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত খাবারের নাম কি ছিলো?
(১১) তাজবীদ কি?
(১২) রুহুল্লাহ বলা হয় কোন নবীকে?
(১৩) সিহাহ সিত্তাহ এবং সহীহাইন কি?
(১৪) রিদ্দা বা মুর্তাদদের যুদ্ধ কোন খলিফার সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো?
(১৫) কুনে মোট কতটি সুরা এবং কতগুলো আয়াত রয়েছে?
রচনামূলক অংশঃ
(১৬) আল্লাহর গুণবাচক নাম সমূহের অর্থ কি? ৫*০.৫ = ২.৫
(ক) আর-রাহীম, (খ) আল-ওয়াদুদ, (গ), (৪) আস-সামী (৫) আল-বাসীর
নিচের প্রশ্নগুলোর উপর সংক্ষিপ্ত নোট লিখুনঃ প্রতিটি প্রশ্নের জন্যে ২.৫ করে, মোট ৫*২.৫= ১২.৫
(১৭) তায়াম্মুম কখন, কিভাবে করতে হয়?
(১৮) ঈমানে মুফাসসাল এর বিষয়গুলো কি কি?
(১৯) ঈমান ও ইসলাম বলতে কি বোঝায় এবং তাদের পার্থক্য কি?
(২০) শরিয়তের মূল উৎস কয়টি ও কি কি?
(২১) ফিরকায়ে নাজিয়াহ কি? ফিরকায়ে নাজিয়াহ এর নাম কি?
____________________________
প্রশ্নগুলোর উত্তরঃ
() সুরা ফাতিহামর্যাদা এবং গুরুত্বের দিক থেকে সবচাইতে বড় ও মহান সুরা হচ্ছে সুরা ফাতিহা। একারণে এই সুরাটিকে উম্মুল কিতাব বলা হয় 
() আল্লাহর যেই ওয়াহী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজ জবানে হাদীস হিসেবে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলোকে হাদীসে ক্বুদসী বলা হয়হাদীসে ক্বুদসীর কথাগুলো আল্লাহর, কিন্তু তা কুরআনের অংশ নয়।
() কয়েকটি আয়াতে সুদকে হারাম করা হয়েছে, যার মাঝে সুরা বাক্বারার ২৭৮ নাম্বার আয়াত উল্লেখযোগ্য
() ষষ্ঠ হিজরীতে
() মদীনা সনদ
() সুরা নমল-এ। এই সুরার প্রথমে ও মাঝখানে বিসমিল্লাহ-হির রাহমানির রাহীম দুইবার রয়েছে।  
() মদীনাতুর-রাসুল বা সংক্ষেপে মদীনাহ শহরের পূর্ববর্তী নাম ছিলো ইয়াসরিব 
() মুজাদ্দিদ অর্থ সংস্কারক বা পুনঃপ্রবর্তনকারী যখন সমাজে ইসলামের বিধি-বিধান ব্যপকভাবে লংঘন করা হয় তখন কোন খলিফা, আমীর বা আলেম রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মাধ্যমে কিংবা দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে ব্যপকভাবে সমাজ সংস্কার ও লোকদের ইসলাহ বা সংশোধনের কাজ করলে তাকে মুজাদ্দিদ বলা ইসলামের ইতিহাসে তাবেয়ীদের যুগে খলিফা উমার ইবনে আব্দুল আজীজ রাহিমাহুল্লাকে প্রথম মুজাদ্দিদ ধরা হয় (খুলাফায়ে রাশেদীনের উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু নয়)
() খুলাফায়ে রাশেদীনে তৃতীয় খলিফাহ, উসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহুকেরাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দুই কন্যাকে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুসাথে বিয়ে দিয়েছিলেন, একারণে তাঁকে যিন-নুরাইন বলা হত, অর্থ দুইটি নূর বা আলোর অধিকারী 
(১০) মান্না ও সালওয়া
(১১) কুরআন শুদ্ধ করে পাঠ করার পদ্ধতিকে তাজবীদ বলা হয়
(১২) ঈসা আলাইহিস সালামকে
(১৩) সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, আবু দাদ, তিরমিযী, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ এই ছয়টি হাদীসের কিতাবকে একত্রে সিহাহ সিত্তাহ বলা হয়সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম এই দুইটি সহীহ হাদীসের গ্রন্থকে একত্রে সহীহাইন বলা হয় 
(১৪) খুলাফায়ের রাশেদীনের প্রথম খলিফাহ আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতের সময়রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর কিছু মানুষ ঈমান, নামায, রোযাকে মেনে নেয়, কিন্তু তারা যাকাত দিতে অস্বীকার করেছিলো। যাকাত দিতে অস্বীকার করার কারণে আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে মুর্তাদ ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন একে রিদ্দার যুদ্ধ বলা হয় 
(১৫) ১১৪-টি সুরা, ৬২৩৬-টি আয়াত। যারা বিশ্বাস করবেন না, তারা নিজেরা বাসায় কুরআনুল কারীম খুলে সবগুলো সুরার আয়াত সংখ্যা যোগ করে দেখুন।  
(১৬) (ক) আর-রাহীম = অসীম দয়ালু, (খ) আল-ওয়াদুদ = যিনি স্নেহ বা ভালোবাসাময়, (গ) আল-হাইয়্যু = চিরঞ্জীব, (ঘ) আস-সামী = যিনি সবকিছু শুনেন/সর্বশ্রোতা, (ঙ) আল-বাসীর = যিনি সবকিছু দেখেন/সর্বদ্রষ্টা 
(১৭) তায়ম্মুম কখন করতে হয়ঃ পানি না পাওয়া গেলে কিংবা, পানি ব্যবহার করলে অসুস্থতা বৃদ্ধি পাবে, এমন আশংকা থাকলে পানি দিয়ে ওযু বা গোসলের পরিবর্তে তায়াম্মুম বা মাটি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা যায়
তায়ম্মুম কিভাবে করতে হয়ঃ (ক) তায়ামুম বা মাটি দ্বারা পবিত্রতা অর্জনের জন্য নিয়ত করতে হবে (খ) প্রথমে দুই হাত মাটিতে স্পর্শ করতে হবে, ফুঁ দিয়ে ধূলা-বালি ফেলে দিতে হবে (গ) দুই হাত দ্বারা মুখমন্ডল মাসাহ করতে হবে (ঘ) এক হাত দিয়ে অন্য হাতের কবজি পর্যন্ত মাসাহ করতে হবে, প্রথমে ডান হাত পরে বাম হাত 
(১৮) আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, ফেরেশতাদের প্রতি বিশ্বাস, আসমানী কিতাব সমূহের প্রতি বিশ্বাস, নবী-রাসুলদের প্রতি বিশ্বাস, তাক্বদীরের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস, মৃত্যুর পরের জীবন বা আখেরাতের প্রতি বিশ্বাস, কিয়ামত বা বিচার দিবসের প্রতি বিশ্বাস 
(১৯) এটার বিস্তারিত পরে লিখবো ইন শা আল্লাহ
(২০) সঠিক হচ্ছে শরিয়তের মূল উৎস দুইটিঃ কুন ও হাদীস তবে আমাদের দেশে পড়ানো হয় চারটি কু, হাদীস, ইজমা ও কিয়াস। প্রকৃতপক্ষে ইজমা ও কিয়াস শরীয়তের মূল উৎস হয়, কারণ ইজমা ও কিয়াসের উৎস হচ্ছে কুন ও সুন্নাহ এছাড়া ইজমা ও কিয়াস এদুটি কুন ও সুন্নাহর উপর নির্ভরশীল 

(২১) মুসলিমদের মাঝে মোট ৭৩-টি দলের মাঝে একটিমাত্র নাজাতপ্রাপ্ত দলকে ফিরকায়ে নাজিয়া বা মুক্তিপ্রাপ্ত দল বলা হয় প্রাচীনকাল থেকে মুসলিমদের মাঝে নাজাতপ্রাপ্ত দলটি আহলুস-সুন্নাহ, কখনোবা আহলুল-হাদীস নামে পরিচিত হয়ে আসছে।