মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০১৫

“শোপিস”

শোপিস নামে মানুষ বা কোন প্রাণীর ছবি বা মূর্তি, স্ট্যাচু, এন্টিক...ঘরে থাকলে সেটা বের করে দিতে হবে। ছেলে-মেয়ের ছবি অথবা কুকুর, বিড়ালের মূর্তি, যাই হোক না, যতই দামী হোক না কেনো, এই সমস্ত বেহুদা জিনিসকে ঘরে জায়গা দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। এইগুলো ঘরে থাকলে আল্লাহর রহমতের ফেরেশতারা ঘরে প্রবেশ করেন না। হারাম জিনিসের প্রতি ভালোবাসা বা দুর্বলতা বোধ করা ঈমানের দুর্বলতার লক্ষণ। আর আল্লাহ যা হারাম বা নিষিদ্ধ করেছেন, সেইগুলোর প্রতি অন্তর থেকে ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করা শক্তিশালী ঈমানের লক্ষণ। 

সোমবার, ২৯ জুন, ২০১৫

“আহলুল হাদীস” এর সাথে দুশমনি??

প্রসংগঃ আহলে হাদীস
- আনসারুস সুন্নাহ
__________________________
(আমার সেই সমস্ত বান্দাদের জন্যে সুসংবাদ), যারা মনোযোগ সহকারে কথা শুনে, অতঃপর তারা মাঝে যা উত্তম, তার অনুসরণ করে। আল্লাহ তাদেরকেই সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই হচ্ছে সত্যিকারের বুদ্ধিমান।
[সুরা আয-যুমারঃ ১৭-১৮]
__________________________
আহলুল হাদীস এর সাথে দুশমনি??
১. ইমাম আহমদ বিন সানান আল-ওয়াসিতি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, দুনিয়ায় এমন কোনো বিদআতী নেই যে, আহলে হাদীসদের প্রতি বিদ্বেষ রাখেনা।
 [মাআরিফাতু উলুম আল-হাদীস, ইমাম হাকীম, পৃঃ ৪, সনদ সহীহ]
২. আল-হাফিয, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ, মৃত্যুঃ ৭৫১ হিঃ) তাঁর বিখ্যাত কাসিদা নু-নিয়াহ্‌ তে বলেছেন, ওহে তোমরা যারা (আহলুল হাদীসদেরকে) ঘৃণা কর এবং আহলুল হাদীসদের গালি-গালাজ কর, তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর যে শয়তানের সাথে তোমাদের দোস্তি হয়েছে।
[আল-কাফিয়া আশ-শাফিয়া, পৃষ্ঠা-১৯৯]
৩. শায়খ আব্দুল কাদের জীলানী (রাহিমাহুল্লাহ, মৃত্যুঃ ৫৬১ হিঃ) নাজী ফের্কা হিসাবে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের বর্ণনা দেওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে বিদআতীদের ক্রোধ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, বিদআতীদের লক্ষণ হচ্ছে আহলে হাদীসদের গালি দেওয়া এবং তাদেরকে বিভিন্ন খারাপ নামে সম্বোধন করা। এগুলি সুন্নাতপন্থীদের বিরুদ্ধে তাদের দলীয় বিদ্বেষ ও অন্তঃর্জ্বালার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের অন্য কোন নাম নেই, একটি নাম ছাড়া। আর সেটি হচ্ছে আসহাবুল হাদীছ বা আহলে হাদীস।
[গুনিয়া-তুত্তালিবিনঃ ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা-৯০] 
__________________________
আহলুল হাদীস কথাটি দিয়ে কি শুধুমাত্র মুহাদ্দিস বা হাদীসের আলেমদেরকেই বুঝায়??
১. আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত এর অনেক ইমাম ও আলেম বলেন,
নাযাতপ্রাপ্ত একমাত্র দল হচ্ছে আহলুল হাদীস।
যেই সমস্ত ইমামরা এ ব্যপারে একমত হয়েছেন,
ক. ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ, আল-হুজ্জাহ ফী বয়ান আল-মুহাজ্জাঃ ১/২৪৬।
খ. ইমাম আহমদ বিন হাম্বাল রাহিমাহুল্লাহ, ফাতহুল বারী লি ইবনে হাজারঃ ১৩/২৫০।
গ. ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ এর উস্তাদ, ইমাম আলি ইবনে আল-মাদীনি রাহিমাহুল্লাহ ও একই কথা বলেছেন, দেখুন সুনানু আত-তিরমিযীঃ ২১৯২। 
নোটঃ এখন আহলুল হাদীস বলতে যদি শুধুমাত্র মুহাদ্দীসগণকে বুঝানো হয়, তাহলে কি শুধুমাত্র মুহাদ্দীসগণই জান্নাতে যাবে, আর সাধারণ লোক জান্নাতে যেতে পারবে না?
২. ইমাম আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত, আহমদ বিন হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমাদের নিকট, আহলুল হাদীস ঐ ব্যক্তি যিনি হাদীসের উপর আমল করেন।
[মানাক্কিব আল-ইমাম আহমদ লি ইবনে জওযী, ২০৮ পৃষ্ঠা, সহীহ সনদ সহকারে]
__________________________
হাদীস সহীহ সহীহ ও জয়ীফ সম্পর্কে আলেম না হলেও একজন আহলে হাদিসঃ
১. ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) এর ছেলে আব্দুল্লাহ (যিনি ইমাম আহমদ এর অনেক ফতোয়া লিপিবদ্ধ করেছেন) তিনি বলেন,
আমি আমার পিতা আহমাদ বিন হাম্বালকে এক ব্যক্তির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম, যে তার দ্বীন সংক্রান্ত বিষয়- তালাক্ব ও অন্যান্য বিষয়ের ক্বসম এর ব্যাপারে সওয়াল করতে চায় যে ব্যাপারে সে কিনা ফেতনার সম্মুখীন হয়েছে। সেখানে আসহাবুল রায় এর একটি দল এবং"আসহাবুল হাদীস এর এমন একটি দল রয়েছে যারা হাদীস মুখস্ত করেনা এবং হাদীসের সনদ কোনটা দুর্বল আর কোনটা শক্তিশালী তা চেনেনা। এই দুই গ্রুপের উপস্থিতিতে সে কার কাছে ফতওয়া জিজ্ঞেস করবে? আহলুল রায়কে নাকি আহলুল হাদীস এর ওই দলকে, যদিও তাদের হাদীসের ব্যাপারে জ্ঞান কম? তিনি (ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল) বললেনঃ আসহাবুল হাদীস বা আহলে হাদীসকে, (যদিও ওই আহলে হাদীস হাদীস কম জানে তবুও তাদেরকেই) জিজ্ঞেস করবে, কেননা যঈফ হাদীস ও আবু হানীফাহর রায় (ফতোয়া) অপেক্ষা উত্তম।
কিতাবুস সুন্নাহ, আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন হাম্বল, ১ম খন্ড ১৮০ পৃষ্ঠা, আমার পিতা ও অন্য মাশায়েখদের কাছ থেকে আবূ হানীফাহর ব্যাপারে কী স্মরণ রেখেছি অধ্যায়।
নোটঃ ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) এর নিকট আহলে হাদীস কারা, এবং তাদের কি মর্যাদা সে ব্যপারে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।
২. আবু মানসুর আব্দুল কাহিব বিন তাহির আল বাগদাদী (রাহিমাহুল্লাহ) শামের সীমান্তবর্তী এলাকায় বাসকারী অধিবাসীগণ সম্পর্কে বলেন, তাদের সকলেই মাযহাবের দিক দিয়ে ছিলেন আহলুল হাদীস, আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভূক্ত।
[উসূল আদ-দীন, পৃষ্ঠা ৩১৭]
নোটঃ এখন একথা বিশ্বাস করার কোন মানে নাই কোন এলাকার সকল অধিবাসীগণই মুহাদ্দীস হবেন, সুতরাং খতীব বাগদাদী এখানে সাধারণ লোকদেরকেই আহলুল হাদীস বুঝিয়েছেন যাদের ইমাম হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
__________________________

[সমাপ্ত]  [সমাপ্ত]  [সমাপ্ত]

রবিবার, ২৮ জুন, ২০১৫

৬৭তম অধ্যায়ঃ মানুষ আল্লাহ তাআলার পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা নিরুপনে অক্ষম

আল্লাহ তাআলার মর্যাদা সম্পর্কে ক্বুরানের একটি আয়াতের তাফসীর
৬৭তম অধ্যায়ঃ মানুষ আল্লাহ তাআলার পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা নিরুপনে অক্ষম
মূল গ্রন্থঃ কিতাবুত তাওহীদ
- শায়খুল ইসলাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওহহাব (রহঃ)
_________________________________
১. আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন,

وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ (الزمر: ৬৮)

তারা আল্লাহর যথার্থ মর্যাদা নিরুপন করতে পারেনি। কেয়ামতের দিন সমগ্র পৃথিবী তাঁর হাতের মুঠোতে থাকবে। (জুমারঃ ৬৭)

২. ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একজন ইহুদী পন্ডিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বললো, হে মুহাম্মদ, আমরা [তাওরাত কিতাবে] দেখতে পাই যে, আল্লাহ তাআলা সমস্ত আকাশ মন্ডলীকে এক আঙ্গুলে, সমস্ত যমীনকে এক আঙ্গুলে, বৃক্ষরাজিকে এক আঙ্গুলে, পানি এক আঙ্গুলে ভূতলের সমস্ত জিনিসকে এক আঙ্গুলে এবং সমস্ত সৃষ্টি জগতকে এক আঙ্গুলে রেখে বলবেন, আমিই সম্রাট।

এ কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদী পন্ডিতের কথার সমর্থনে এমন ভাবে হেসে দিলেন যে তাঁর দাঁত মোবারক দেখা যাচ্ছিল। অতপর তিনি এ আয়াতটুকু পড়লেন।
তারা আল্লাহর যথার্থ মর্যাদা নিরুপন করতে পারেনি। কেয়ামতের দিন সমগ্র পৃথিবী তাঁর হাতের মুঠোতে থাকবে। (জুমারঃ ৬৭)
সহীহ মুসলিমের হাদীসে বর্ণিত আছে, পাহাড়- পর্বত এবং বৃক্ষরাজি এক হাতে থাকবে তারপর এগুলোকে ঝাকুনি দিয়ে তিনি বলবেন, আমি রাজাধিরাজ, আমিই আল্লাহ।

সহীহ বুখারীর এক বর্ণনায় আছে, সমস্ত আকাশ মন্ডলীকে এক আঙ্গুলে রাখবেন। পানি এবং ভূতলে যা কিছু আছে তা এক আঙ্গুলে রাখবেন। আরেক আঙ্গুলে রাখবেন সমস্ত সৃষ্টি। (বুখারী ও মুসলিম)

ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত মারফু হাদীসে আছে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা সমস্ত আকাশমন্ডলীকে ভাঁজ করবেন। অতঃপর সাত তবক যমীনকে ভাঁজ করবেন এবং এগুলোকে বাম হাতে নিবেন। তারপর বলবেন, আমি হচ্ছি রাজাধিরাজ। অত্যাচারীরা কোথায়? অংহকারীরা কোথায়? (মুসলিম)

৩. ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, সাত তবক আসমান ও যমীন আল্লাহ তাআলার হাতের তালুতে ঠিক যেন তোমাদের কারো হাতে এটা সরিষার দানার মত।

৪. ইবনে যায়েদ বলেন, আমার পিতা আমাকে বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,
কুরসীর মধ্যে সপ্তাকাশের অবস্থান ঠিক যেন, একটি ঢালের মধ্যে নিক্ষিপ্ত সাতটি দিরহামের [মুদ্রার] মত। তিনি বলেন, আবুযর রা. বলেছেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামকে এ কথা বলতে শুনেছি,
আরশের মধ্যে কুরসীর অবস্থান হচ্ছে ঠিক ভূপৃষ্ঠের কোন উন্মুক্ত স্থানে পড়ে থাকা একটি আংটির মত।

৫. ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, দুনিয়ার আকাশ এবং এর পরবর্তী আকামের মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ বছরের পথ। আর এক আকাশ থেকে অন্য আকাশের দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ বছরের। এমনিভাবে সপ্তমাকাশের মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ বছরের পথ। একই ভাবে কুরসী এবং পানির মাঝখানে দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ বছরের। আরশ হচ্ছে পানির উপরে। আর আল্লাহ তাআলা সমাসীন রয়েছেন আরশের উপর। তোমাদের আমলের কোন কিছুই তাঁর কাছে গোপন নেই। (ইবনে মাহদী হাম্মাদ বিন সালামা হতে তিনি আসেম হতে, তিনি যিরর হতে, এবং যিরর আবদুল¬াহ হতে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

(অনুরূপ হাদীস মাসউদী আসেম হতে তিনি আবি ওয়ায়েল হতে, এবং তিনি আবদুলহ হতে বর্ণনা করেছেন।)

 ৬. আব্বাস বিন আবদুল মোত্তালিব রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,
তোমরা কি জানো, আসমান ও যমীনের মধ্যে দূরত্ব কত? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই সবচেয়ে ভাল জানেন। তিনি বললেন, আসমান ও যমীনের মাঝে দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ বছরের পথ। এক আকাশ থেকে অন্য আকাশের দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ বছরের পথ। প্রতিটি আকাশের ঘনত্বও (পুরু ও মোটা) পাঁচশ বছরের পথ। সপ্তমাকাশ ও আরশের মধ্যখানে রয়েছে একটি সাগর। যার উপরিভাগ ও তলদেশের মাঝে দূরত্ব হচ্ছে আকাশ ও যমীনের মধ্যকার দূরত্বের সমান। আল্লাহ তাআলা এর উপরে সমাসীন রয়েছেন। আদম সন্তানের কোন কর্মকাণ্ডই তাঁর অজানা নয়। (আবু দাউদ)

এ অধ্যায় থেকে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জানা যায় .

১. والارض جميعا قبضته
কেয়ামতের দিন সমগ্র পৃথিবী তাঁর হাতের মুঠোতে থাকবে।
এর তাফসীর।

২. এ অধ্যায়ে আলোচিত জ্ঞান ও এতদসংশিষ্ট জ্ঞানের চর্চা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল¬াম এর যুগের ইহুদীদের মধ্যেও বিদ্যমান ছিলো। তারা এ জ্ঞানকে অস্বীকার ও করতোনা।

৩. ইহুদী পন্ডিত ব্যক্তি যখন কেয়ামতের দিনে আল্লাহর ক্ষমতা সংক্রান্ত কথা বললো, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কথাকে সত্যায়িত করলেন এবং এর সমর্থনে কোরআনের আয়াতও নাযিল হলো।

৪. ইহুদী পন্ডিত কর্তৃক আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কিত মহাজ্ঞানের কথা উল্লেখ করা হলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাসির উদ্রেক হওয়ার রহস্য।

৫। আল্লাহ তাআলার দুই হাত মোবারকের সুস্পষ্ট উল্লেখিত হয়েছে। আকাশ মন্ডলী তাঁর ডান হাতে, আর সমগ্র যমীন তাঁর অপর হাতে নিবদ্ধ থাকবে।

৬. অপর হাতকে বাম হাত বলে নাম করণ করার সুস্পষ্ট ঘোষণা।

৭. কেয়ামতের দিন অত্যাচারী এবং অহংকারীদের প্রতি আল্লাহর শাস্তির উল্লেখ।

৮. আকাশের তুলনায় আরশের বিশালতার উল্লেখ।

৯. তোমাদের কারো হাতে একটা সরিষা দানার মত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লম এর এ কথার তাৎপর্য।

১০. কুরসীর তুলনায় আরশের বিশালতার উল্লেখ।

১১. কুরসী এবং পানি থেকে আরশ সম্পূর্ণ আলাদা।

১২. প্রতিটি আকাশের মধ্যে দূরত্ব ও ব্যবধানের উল্লেখ।

১৩. সপ্তমাকাশ ও কুরসীর মধ্যে ব্যবধান।

১৪. কুরসী এবং পানির মধ্যে দূরত্ব।

১৫. আরশের অবস্থান পানির উপর।

১৬. আল্লাহ তাআলা আরশের উপরে সমাসীন।

১৭. আকাশ ও যমীনের দূরত্বের উল্লেখ।

১৮. প্রতিটি আকাশের ঘনত্ব (পুরো) পাঁচশ বছরের পথ।

১৯. আকাশ মন্ডলীর উপরে যে সমুদ্র রয়েছে তার উর্ধ্ব দেশ ও তলদেশের মধ্যে দূরত্ব হচ্ছে পাঁচশ বছরের পথ।


والحمد لله رب العلمين وصلى الله على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين.

বদর যুদ্ধ - “রমযান মাসের ৩০ আসর”

বদর যুদ্ধ
গ্রন্থঃ “রমযান মাসের ৩০ আসর”
- শায়খ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসাইমিন (রহঃ)
_____________________________________
সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি শক্তিশালী সুদৃঢ়, পদানতকারী বিজয়ী কর্তৃত্বশীল, প্রকাশ্য সত্য, মৃদু কান্নার শব্দও যার শ্রবণ থেকে গোপন থাকে না, যার মহত্বের কাছে ক্ষমতাধর নরপতিরা হীন হয়ে গেছে। তিনি তাঁর প্রজ্ঞা অনুযায়ী ফয়সালা করেন, আর তিনি মহাবিচারক।
আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই, তিনি পূর্বের ও পরের সবার ইলাহ। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল, যাঁকে তিনি সকল সৃষ্টিকুল থেকে বেঁছে নিয়েছেন, বদর প্রান্তরে ফেরেশতা দিয়ে সাহায্য করেছেন।
আল্লাহ তাঁর উপর সালাত পেশ করুন, অনুরূপ তার পরিবার-পরিজন, সকল সাহাবী এবং কিয়ামত পর্যন্ত সুন্দরভাবে তাদের অনুসারীদের সবার উপর। আর তিনি তাদের উপর যথাযথ সালামও প্রদান করুন।
o সম্মানিত ভাইয়েরা! এ পবিত্র মাসেই আল্লাহ তা‘আলা মহান বদর যুদ্ধে মুসলিমদেরকে তাদের শত্রু মুশরিকদের বিরুদ্ধে বিজয় দান করেছেন। এ কারণেই আল্লাহ তা‘আলা এ দিবসকে ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ তথা সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নিরূপণের দিন বলে নাম রেখেছেন; কেননা আল্লাহ তা‘আলা সেদিন তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুমিনদের বিজয়ী এবং কাফির ও মুশরিকদের পরাজিত করার মাধ্যমে হক্ব ও বাতিলের পার্থক্য সূচিত করেছেন।
o এ মহা বিজয়ের ঘটনাটি ঘটেছিল দ্বিতীয় হিজরীর রমযান মাসে।
o এ যুদ্ধের কারণ ছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ মর্মে সংবাদ পেলেন যে, আবূ সুফিয়ান কুরাইশ কাফিরদের একটি বানিজ্য দল নিয়ে সিরিয়া থেকে মক্কা ফিরছে। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে কুরাইশদের বানিজ্য কাফেলার গতিরোধের জন্য বের হওয়ার আহ্বান জানালেন। কেননা কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তাদের মাঝে কোনো প্রকার চুক্তি ছিল না। আর কাফির কুরাইশরা মুসলিমদেরকে তাদের ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পদ হতে বের করে দিয়েছিল এবং ইসলামের সত্যবাণীর দাওয়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ বানিজ্য কাফেলার সাথে যা করার ইচ্ছা করেছিলেন তা ছিল যথার্থ।
o অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৩১০ এর বেশি কিছু সাহাবীকে নিয়ে বদর অভিমুখে রওয়ানা হন। তাদের ছিল কেবলমাত্র দুটি ঘোড়া ও সত্তরটি উট; যাতে তারা পালাক্রমে চড়ছিলেন। এ যুদ্ধে ৭০ জন মুহাজির এবং অন্যরা আনসার মুজাহিদ ছিলেন। তারা বানিজ্য কাফেলা ধরতে চেয়েছিলেন, যুদ্ধ করতে চান নি। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা অনির্ধারিত সময়ে তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য মুসলিম ও শত্রুদের মাঝে মুখোমুখি দাঁড় করালেন।
আবূ সুফিয়ান মুসলিমদের অবস্থা জানতে পেরে কুরাইশদের কাছে এ মর্মে একজন চিৎকারকারী সংবাদবাহক পাঠায় যেন কুরাইশরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে তার সাহায্যে এগিয়ে আসে। তাই আবূ সুফিয়ান রাস্তা পরিবর্তন করে সমুদ্র উপকূল ধরে রওয়ানা দিল এবং নিরাপদে পৌঁছে গেল।
o কিন্তু কুরাইশ সম্প্রদায়; তাদের কাছে চিৎকারকারীর মাধ্যমে সংবাদ পৌঁছা মাত্রই তাদের নেতৃস্থানীয় একহাজার লোক সদলবলে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। তাদের ছিল ১০০টি অশ্ব ও ৭০০ উষ্ট্র। তারা বের হয়েছিল
‘অহঙ্কার ও লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে এবং আল্লাহর রাস্তা থেকে বাধা প্রদান করতে, আর তারা যা করছিল, আল্লাহ তা পরিবেষ্টনকারী।’ {সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৪৭}
তাদের সঙ্গে ছিলো নর্তকী দল, যারা মুসলিমদের বদনামি ও বিদ্রূপ করে গান গাইছিলো। আবূ সুফিয়ান যখন কুরাইশদের যাত্রার কথা জানতে পারল, তখন সে নিজের নিরাপদে ফিরে আসার সংবাদ জানিয়ে কুরাইশদের যুদ্ধ ছাড়াই ফিরে যেতে অনুরোধ করল। কিন্তু কুরাইশ বাহিনী যুদ্ধ ছাড়া পিছু ফিরে যেতে অস্বীকার করল।
আবূ জেহেল বলল, “আল্লাহর শপথ, আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত বদর প্রান্তরে না পৌঁছব ততক্ষণ ফিরে যাব না। আমরা বদর প্রান্তরে তিনদিন অবস্থান করব। তথায় উট জবাই করব, খাদ্য খাব, মদ পান করব আর তাতে আরব জাতি আমাদের গৌবরগাথা শুনে সর্বদা ভয় পাবে”।
o অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কুরাইশদের বের হবার খবর জানতে পারলেন, সাহাবীদের একত্র করে পরামর্শে বসলেন। তাদের উদ্দেশে তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা আমার সঙ্গে ওয়াদা করেছেন দু’টি দলের একটি (মুসলিমদের মাধ্যমে পদানত হবে) হয়তো ব্যবসায়ী কাফেলা অথবা অন্যটি সৈন্যবাহিনী।’
* অতঃপর মুহাজির সাহাবী মিকদাদ ইবনুল আসওয়াদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনাকে যে ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন তা বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত হোন। আল্লাহর শপথ! আমরা আপনাকে এমন কথা বলব না, যেমন মুসা (‘আলাইহিস সালাম) কে তাঁর জাতি বনী ইসরাইল বলেছিল:
‘হে মুসা! তুমি ও তোমার রব যাও এবং যুদ্ধে অবতীর্ণ হও। আমরা এখানে বসে থাকলাম।’ {সূরা আল-মায়িদাহ্‌, আয়াত: ২৪} বরং আমরা আপনার ডানে, বামে, সামনে এবং পিছনে যুদ্ধ করব।
* এ কথা শুনে আউস গোত্রের নেতা সা‘দ ইবন মু‘আয আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সম্ভবত আপনি আনসারদের ব্যাপারে এ আশংকা করছেন যে, তাদের অধিকার আছে তাদের বাড়ী-ঘর থেকে দূরে আপনাকে সাহায্য না করার। তাই আমি আনসারদের পক্ষ থেকে বলছি এবং তাদের পক্ষ থেকে জবাব দিচ্ছি, যে দিকে আপনি চলুন, যার সঙ্গে ইচ্ছা আপনি সম্পর্ক গড়ে তুলুন, যার থেকে ইচ্ছা সম্পর্ক কর্তন করুন, আমাদের সম্পদ হতে যা ইচ্ছা গ্রহণ করুন, তন্মধ্য হতে যা ইচ্ছা আমাদের দান করুন, আপনি যা আমাদের জন্য ছেড়ে যাবেন তার চেয়ে যা আমাদের থেকে গ্রহণ করবেন তা-ই আমাদের নিকট অধিক প্রিয়। আপনি আমাদের যা নির্দেশ দেবেন আমাদের নির্দেশ সেখানে আপনার নির্দেশের অনুগামী হবে। আল্লাহর শপথ! আপনি যদি আমাদের নিয়ে গামদান হতে বুরাক পর্যন্ত চলেন, তাহলে অবশ্যই আমরা আপনার সঙ্গে চলব। আর যদি আপনি আমাদের এ সাগরে ঝাঁপ দিতে বলেন, আমরা তাই করব। আমরা এটা পছন্দ করি না যে, আপনি আগামী দিন আমাদের নিয়ে শত্রুদের মোকাবিলা করবেন। নিশ্চয় আমরা যুদ্ধে অত্যন্ত ধৈর্যশীল, শত্রুদের মোকাবিলায় সত্যের পক্ষে দৃঢ় অবস্থানকারী। আমরা আশা রাখি আল্লাহ আপনাকে আমাদের পক্ষ থেকে এমন কিছু দেখাবেন যদ্বারা আপনার চক্ষু শীতল হবে।
o রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাজির ও আনসার সাহাবীদের কথা শুনে খুশি হয়ে সুসংবাদ দিয়ে বললেন:
‘তোমরা চলতে থাক আর সুসংবাদ গ্রহণ করো। আল্লাহর শপথ, আমি যেন (মুশরিক) গোষ্ঠীর মৃত দেহ পড়ে থাকার জায়গাগুলো দেখতে পাচ্ছি।’
o রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর সৈন্যদল সাহাবীদের সঙ্গে নিয়ে চললেন এবং বদর কূপসমূহের কাছের পানির কূপের সম্মুখে যাত্রাবিরতি দিলেন। হুবাব ইবনুল মুনযির ইবন ‘আমর ইবনুল জুমুহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটা কি এমন স্থান যেখানে অবস্থানের জন্য আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, যা থেকে আমাদের এদিক-সেদিক যাওয়ার সুযোগ নেই; নাকি এটা যুদ্ধ সংক্রান্ত কর্মকৌশল ও অভিমত?
উত্তরে তিনি বললেন, বরং এটা যুদ্ধ সংক্রান্ত কৌশল ও সিদ্ধান্ত। হুবাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু পুনরায় বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এটা তো ভালো স্থান নয়, তাই আমাদেরকে কুরায়েশের নিকটবর্তী কূপের নিকট নিয়ে চলুন। সেখানে আমরা অবস্থান করব এবং এর পিছনের কূপগুলো নষ্ট করব। অতঃপর সে কূপের কাছে হাওজ বানিয়ে তা পানি দিয়ে পূর্ণ করে রাখব, ফলে আমরা পানি পান করব অথচ তারা পানি পান করতে পারবে না।
এ মতটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পছন্দ করলেন। এরপর তারা সেখান থেকে রওয়ানা হয়ে মদীনার দিক থেকে নিকটবর্তী ‘উদওয়াতুদ দুনিয়া’তে (উপত্যকার নিকটবর্তী অংশে) অবতরণ করলেন, অন্য দিকে কুরাইশরা মক্কার দিক থেকে ‘উদওয়াতুল কুসওয়া’তে (উপত্যকা থেকে দূরের অংশে) অবস্থান করল। ওই রাতেই আল্লাহ তা‘আলা এমন মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করলেন যা কাফিরদের জন্য বিরাট বিপদ ও দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাদের মাটি কাদা ও পিচ্ছিল হয়ে পড়ে। ফলে তারা সম্মুখে অগ্রসর হতে পারেনি। অপরদিকে বৃষ্টি মুসলিমদের জন্য খুব হাল্কা ছিল ফলে তা তাদেরকে পবিত্র করল এবং তাদের যমীনকে চলাচল উপযোগী করে দিল, বালুকে শক্ত করল, অবস্থানকে অনুকুল করল এবং পদসমূহে স্থিরতা প্রদান করল।
o আর মুসলিমরা যুদ্ধের মাঠে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য উঁচু স্থানে একটি তাঁবু বানালেন, যেখান থেকে যুদ্ধের ময়দান দেখা যায়, তিনি সেখানে অবস্থান করেছিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে নামলেন, সাহাবীগণের কাতার সুন্দর করে সাজালেন, যুদ্ধের ময়দানে চলতে থাকলেন এবং মুশরিকদের পতনের স্থল ও হত্যার স্থানসমূহের দিকে ইঙ্গিত করতে থাকলেন, আর তিনি বলছিলেন, “আল্লাহ চাহেত এটা অমুকের পতিত হওয়ার জায়গা, এটা অমুকের মৃত্যুস্থান।” পরবর্তীতে দেখা গেল যে, রাসূলের ইঙ্গিতের জায়গা থেকে ঐ লোকদের মৃত্যু সামান্যও হেরফের হয়নি।  ।
এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবী মুসলিম মুজাহিদ এবং কাফির কুরাইশদের দিকে তাকালেন। আল্লাহর কাছে দু’হাত তুলে দো‘আ করে বললেন, “হে আল্লাহ! এ কাফির কুরাইশ দল অহংকার ও গর্বোদ্ধত হয়ে এখানে এসেছে তাদের যাবতীয় সৈন্য-সামন্ত নিয়ে, আপনার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করছে এবং আপনার রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করছে। হে আল্লাহ! এ কঠিন মুহূর্তে আপনি আমাকে সাহায্য করুন, যার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি আপনি আমাকে দিয়েছেন। হে আল্লাহ! আপনি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা বাস্তাবায়ন করুন। হে আল্লাহ আমি আপনার প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গিকারের বাস্তবায়ণ চাই। হে আল্লাহ, আপনি যদি চান তো আপনার ইবাদত করা হবে না। হে আল্লাহ! যদি এ মুসলিম দলকে আপনি ধ্বংস করে দেন, তাহলে আজ থেকে আপনার ইবাদত করার মত কেউ থাকবে না।”
o মুসলিমগণ স্বীয় রবের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলেন এবং তাঁর কাছে উদ্ধার কামনা করলেন। তখন আল্লাহ তা‘আলা মুসলিমদের ডাকে সাড়া দিলেন।
‘স্মরণ কর, যখন আপনার রব ফেরেশতাদের প্রতি ওহী প্রেরণ করেন যে, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি। সুতরাং যারা ঈমান এনেছে তোমরা তাদেরকে অনড় রাখ। অচিরেই আমি ভীতি ঢেলে দেব তাদের হৃদয়ে যারা কুফরী করেছে। অতএব তোমরা আঘাত কর ঘাড়ের উপরে এবং আঘাত কর তাদের প্রত্যেক আঙুলের অগ্রভাগে। এটি এ কারণে যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করেছে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করবে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর। এটি আযাব, সুতরাং তোমরা তা আস্বাদন কর। আর নিশ্চয় কাফিরদের জন্য রয়েছে আগুনের আযাব।’ {সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ১২-১৪}
অতঃপর দু’টি দল (মুসলিম ও মুশরিক) পরস্পর মুখোমুখি হল এবং যুদ্ধ চলতে থাকল এবং প্রচণ্ড রূপ লাভ করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁবুতে অবস্থান করলেন। তার সঙ্গে ছিলেন আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ও সা‘দ ইবন মু‘আয রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু। তারা দু’জনই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাহারা দিচ্ছিলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় রবের নিকট দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কাতর প্রার্থনা জানালেন, সাহায্য ও বিজয়ের প্রার্থনা করলেন, উদ্ধার চাইলেন। তারপর রাসূল সামান্যতম সময়ের জন্য তন্দ্রাচ্ছন্ন হলেন, তারপর এ অবস্থা থেকে বের হয়ে বললেন, “অবশ্যই কাফিররা পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠদেশ দেখিয়ে পলায়ন করবে।” [সূরা আল-কামার: ৪৫]
o আর তিনি মুসলিম যোদ্ধাদের যুদ্ধের প্রতি উৎসাহ দিয়ে বললেন, “ওই সত্তার শপথ! যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, আজ যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, ধৈর্যধারণ করে সওয়াবের আশায় সামনে অগ্রসর হয়ে পৃষ্ঠদেশ প্রদর্শন না করে যুদ্ধ করে মারা যাবে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।” এ কথা শুনে ‘উমাইর ইবনুল হুমাম আল আনসারী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু দাঁড়ালেন, আর তার হাতে ছিল কিছু খেজুর; যা তিনি খাচ্ছিলেন; তিনি বলতে লাগলেন: হে আল্লাহর রাসূল! জান্নাত কি আকাশ ও জমিন পরিমাণ প্রশস্ত? উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। তখন ‘উমাইর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, বিরাট ব্যাপার, বিরাট ব্যাপার, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মাঝে আর জান্নাতে প্রবেশের মাঝে পার্থক্য এতটুকুই যে, ওই কাফিররা আমাকে হত্যা করবে। আমি যদি এ খেজুরগুলো খাওয়া শেষ করা পরিমান সময় জীবিত থাকি তাহলে তো অনেক লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হবে, এ কথা বলেই তিনি খেজুরগুলো নিক্ষেপ করে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন এবং নিহত হলেন, আল্লাহ তাঁর উপর সন্তুষ্ট হোন।
o আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক মুষ্টি মাটি বা পাথর নিয়ে কাফির দলের প্রতি ছুঁড়ে মারলেন, রাসূলের নিক্ষিপ্ত পাথর তাদের সকলের চোখে বিদ্ধ হল। তাদের সকলের চোখেই সেটা পূর্ণ করে দিল, তারা তাদের চোখের মাটি ছাড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল; যা ছিল আল্লাহর নিদর্শনসমূহের একটি নিদর্শন। ফলে মুশরিক সৈন্যদের পরাজয় হল এবং তারা যুদ্ধের মাঠ ছেড়ে পৃষ্ঠদেশ প্রদর্শন করে পলায়ন করল। আর মুসলিমগণ তাদের পিছু নিয়ে তাদের হত্যা ও বন্দি করা অব্যাহত রাখল। এভাবে তাদের ৭০ জন কাফির নিহত ও ৭০ জন বন্দি হল। নিহতের মধ্যকার ২৪ জন কাফির কুরাইশ নেতৃবৃন্দকে বদরের একটি নর্দমাক্ত কূপে নিক্ষেপ করা হলো। এদের মধ্যে ছিল আবূ জাহল, শায়বা ইবন রবী‘আ ও তার ভাই ‘উতবা এবং তার ছেলে অলীদ ইবন ‘উতবা।
* সহীহ বুখারীতে ‘আবদুল্লাহ ইবন মাস‘ঊদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবলামুখী হয়ে কাফির কুরাইশদের এ চারজনের বিরুদ্ধে বদ দো‘আ করেছিলেন”। ইবন মাস‘উদ বলেন, আমি আল্লাহর সাক্ষ্য দিয়ে বলছি, নিশ্চয়ই আমি এ কাফির কুরাইশ নেতৃবৃন্দকে মৃত দেখতে পেয়েছি; সূর্য তাদের চেহারাগুলোকে পরিবর্তন করে দিয়েছিল। আর সেদিন খুব গরম ছিল।”
* অনুরূপভাবে বুখারীতে আবূ তালহা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদর যুদ্ধের দিন ২৪ জন কুরাইশ নেতৃবৃন্দকে বদরের নিকৃষ্ট কূপের মধ্যে ফেলতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়ম ছিল যে, তিনি কারও উপর বিজয়ী হলে সেখানে তিন দিন অবস্থান করতেন। সে অনুসারে বদরের তৃতীয় দিনে তিনি তাঁর বাহন প্রস্তুতের নির্দেশ দিলেন, তা বাঁধা হলে তিনি চলতে লাগলেন সাহাবীগণ তাঁর পিছু নিলেন। অবশেষে তিনি কূপের পার্শ্বদেশে দাঁড়ালেন এবং প্রত্যেকের নাম ও পিতার নাম ধরে ডাকলেন এবং বলতে লাগলেন, হে অমুকের পুত্র অমুক, হে অমুকের পুত্র অমুক, আজ তোমাদের জন্য কি এটা আন্দদায়ক হত না, যদি তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করতে? আমাদের রব আমাদের বিজয় দান করার ব্যাপারে যে ওয়াদা করেছিলেন, তা আমরা যথার্থ পেয়েছি। তোমরা কি তোমাদের রবের ওয়াদা পেয়েছ? ‘উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এমন লোকদের সঙ্গে কি কথা বলছেন যাদের দেহ আছে কিন্তু আত্মা নেই? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,
ওই সত্তার শপথ! যার হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, আমি তাদের সঙ্গে যা বলছি, তোমরা তা তাদের চেয়ে বেশি শুনতে পাচ্ছ না।”
o আর বন্দীদের ব্যাপার: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ব্যাপারে সাহাবীদের পরামর্শ চাইলেন। সা‘দ ইবন মু‘আয রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর কাছে তাদের বিষয়টি খুবই মারাত্মক ও খারাপ মনে হয়েছে, তাই তিনি বললেন, এটাই সর্বপ্রথম ঘটনা যা আল্লাহ মুশরিকদের উপর ঘটিয়েছেন। আর যুদ্ধে রক্ত প্রবাহিত করে দেওয়া আমার কাছে তাদেরকে জীবিত রাখার চেয়েও বেশি প্রিয়।
* ‘উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, আমি মনে করি, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার অনুমতি থাকলে আমরা কাফিরদের ঘাড়ে আঘাত করে হত্যা করব। অতএব আলীকে (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু) আকীলের ব্যাপারে নির্দেশ দিন, তিনি যেন তাকে হত্যা করেন। আর আমাকে অমুকের (যিনি তার আত্মীয় ছিলেন তার) ব্যাপারে অনুমতি দিন তার ঘাড়ে আমি এখনিই আঘাত হানব। কেননা এরা সকলেই কাফির নেতৃবৃন্দ ও প্রধান ব্যক্তিবর্গ।”
* আর আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, “এরা তো আমাদেরই চাচাতো ভাই, আমাদেরই গোষ্ঠীর লোক। তাই আমি মনে করি, তাদের কাছ থেকে বিনিময় গ্রহণ করা হোক। এতে করে কাফিরদের উপর আমাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, তাছাড়া হতে পারে তাদেরকে আল্লাহ ইসলামের প্রতি হেদায়াত করবেন।”
অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনিময় (মুক্তিপণ) গ্রহণ করলেন। তাদের সর্বোচ্চ বিনিময়ের পরিমাণ ছিল ৪০০০ দিরহাম থেকে শুরু করে ১০০০ দিরহাম পর্যন্ত।
- আর তাদের কেউ কেউ মদীনায় ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের পড়া-লেখা করানোর মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করল।
- কেউ মুক্তি পেল কুরাইশের কাছে বন্দি মুসলিমের মুক্তির বিনিময়ে।
- আবার কাউকে মুসলিমদের প্রতি কঠিন কষ্টদায়ক আচরনের কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হত্যা করলেন।
- আবার কাউকে তিনি বিশেষ স্বার্থের কারণে দয়া করে বিনা বিনিময়েই মুক্ত করে দিলেন।
এ হচ্ছে বদর যুদ্ধ। যে যুদ্ধে অল্প সংখ্যক সৈন্যবাহিনী বেশি সংখ্যক সৈন্যবাহিনীর ওপর বিজয় অর্জন করেছিল।
‘একটি দল লড়াই করছিল আল্লাহর পথে এবং অপর দলটি কাফির। {সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩}
অল্প সংখ্যক লোকের দলটি বিজয় অর্জন করেছিল। কেননা তারা আল্লাহর দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তারা আল্লাহর দ্বীনের কালেমা বুলন্দ করার জন্য ও আল্লাহর দ্বীনের পক্ষে প্রতিরোধ করার জন্য যুদ্ধ করেছিল। ফলে মহান আল্লাহ তাদের বিজয় দান করেছিলেন। অতএব হে মুসলিম ভাইসব! আপনারা দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকুন; যাতে আপনাদের শত্রুদের ওপর বিজয়ী হতে পারেন এবং ধৈর্য ধারণ করুন, অপরকে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিন, স্থির থাকুন এবং আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করুন। আশা করা যায় আপনারা সফল হবেন।
হে আল্লাহ! আমাদের ইসলাম দিয়ে আমাদেরকে বিজয় দান করুন, আমাদেরকে আপনার দ্বীনের সাহায্যকারী এবং আপনার দ্বীনের দা‘ঈ হিসেবে কবুল করুন আর আপনার সাক্ষাতের সময় পর্যন্ত আপনি আমাদেরকে এ দ্বীনের ওপর অটল রাখুন।
আর আল্লাহ সালাত ও সালাম পেশ করুন আমাদের নবী মুহাম্মাদ ও তার পরিবার-পরিজন ও সকল সাহাবীর উপর।

শনিবার, ২৭ জুন, ২০১৫

ইসলামের দৃষ্টিতে সমকামীতা...


ইসলামের দৃষ্টিতে সমকামীতা...
- আনসারুস সুন্নাহ
_________________________
মানব জাতির দ্বারা সংঘটিত সবচাইতে ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট একটা পাপ কাজ হচ্ছে সমকামীতা বা নারীর সাথে নারী অথবা পুরুষের সাথে পুরুষের যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া। ইতিহাসে সাইয়্যিদিনা লুত আলাইহিস সালাম এর জাতির লোকেরা সর্বপ্রথম সমকামীতায় লিপ্ত হয়েছিল। এই নিকৃষ্ট কর্মে লিপ্ত হওয়ার কারণে তাদের উপর আল্লাহ তাআলার গযব হিসেবে পুরো জাতিকেই প্রচন্ড শব্দ ও আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করে জবর থেকে জেরের মতো করে গোটা এলাকাটেই উল্টিয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
_________________________
কুরআনুল কারীমে লুত আলাইহিস সালাম এর জাতির কাহিনী বর্ণনাঃ
উযু বিল্লাহিমিনাশ-শাইতানির রাযীম।
৮০. এবং আমি লূতকে প্রেরণ করেছি। যখন সে স্বীয় সম্প্রদায়কে বললঃ তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের পূর্বে সারা বিশ্বের কেউ করেনি?
৮১. তোমরা তো নারীদেরকে বাদ দিয়ে কামবশতঃ পুরুষদের কাছেই গমন কর। বরং, তোমরা সীমা অতিক্রম করেছ।
৮২. তাঁর সম্প্রদায় এ ছাড়া কোন উত্তর দিল না যে, বের করে দাও এদেরকে শহর থেকে। এরা খুব সাধু থাকতে চায়।
৮৩. অতঃপর আমি তাকে ও তাঁর পরিবার পরিজনকে বাঁচিয়ে দিলাম, কিন্তু তার স্ত্রী ছাড়া। সে তাদের মধ্যেই রয়ে গেল, যারা রয়ে গিয়েছিল। আমি তাদের উপর প্রস্তর বৃষ্টি বর্ষণ করলাম।
৮৪. অতএব, দেখ গোনাহগারদের পরিণতি কেমন হয়েছিল।
সুরা আল-আরাফঃ ৮০-৮৪।
_________________________
আ'উযু বিল্লাহিমিনাশ-শাইতানির রাযীম।
৬১. অতঃপর যখন প্রেরিত (ফেরেশতারা) লুতের ঘরে পৌছাল।
৬২. তিনি (লুত আঃ) বললেনঃ তোমরা তো অপরিচিত লোক।
৬৩. তারা বললঃ না বরং, আমরা আপনার কাছে ঐ বস্তু নিয়ে এসেছি, যে সম্পর্কে তারা (লুত আঃ এর জাতি) বিবাদ করত।
৬৪. এবং আমরা আপনার কাছে সত্য বিষয় নিয়ে এসেছি এবং আমরা সত্যবাদী।
৬৫. অতএব আপনি শেষরাত্রে পরিবারের সকলকে নিয়ে চলে যান এবং আপনি তাদের পশ্চাদনুসরণ করবেন না এবং আপনাদের মধ্যে কেউ যেন পিছন ফিরে না তাকায়। আপনারা যেখানে আদেশ প্রাপ্ত হচ্ছেন সেখানে যান।
৬৬. আমি লুতকে এ বিষয় জানিয়ে দেই যে, সকাল হলেই তাদেরকে সমূলে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
৬৭. (এর পর) শহরবাসীরা আনন্দ-উল্লাস করতে করতে (লুত আঃ এর ঘরে) আসল।
৬৮. লুত বললেনঃ তারা (ফেরেশতা, যারা মানুষের রূপে এসেছিলেন) আমার মেহমান। অতএব (মেহমানদের বেইজ্জত করে, কারণ তারা পুরুষদের সাথেও যৌন কর্ম করতো আমাকে লাঞ্ছিত করো না।
৬৯. তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার ইযযত নষ্ট করো না।
৭০. তারা (লুত আঃ এর জাতি) বললঃ আমরা কি আপনাকে জগৎদ্বাসীর সমর্থন করতে নিষেধ করিনি।
৭১. তিনি বললেনঃ যদি তোমরা একান্ত কিছু করতেই চাও, তবে আমার কন্যারা উপস্থিত আছে (সুতরাং, তাদেরকে বিয়ে করতে পার)।
৭২. আপনার প্রাণের কসম, তারা আপন নেশায় মত্ত ছিল।
৭৩. অতঃপর সুর্যোদয়ের সময় তাদেরকে প্রচন্ড একটি শব্দ এসে পাকড়াও করল।
৭৪. অতঃপর আমি জনপদটিকে উল্টে দিলাম এবং তাদের উপর কঙ্করের প্রস্থর বর্ষণ করলাম।
৭৫. নিশ্চয় এতে চিন্তাশীলদের জন্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে।
৭৬. (ধ্বংসপ্রাপ্ত) জনপদটি (এখন পর্যন্ত) সোজা পথের উপরেই অবস্থিত রয়েছে (যাতে করে সকলেই দেখতে পারে, পাপাচারী জাতির পরিণাম কেমন হয়)।
৭৭. নিশ্চয় এতে ঈমানদারদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে।
সুরা আল-হিজরঃ ৬১-৭৭।
_________________________
বর্তমানে যদি কাউকে সমকামীতার পাপে লিপ্ত হতে দেখা যায় তাহলে ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী তাদের শাস্তি কি?
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
তোমরা যাকে লুত সম্প্রদায়ের কর্ম (সমকামীতা) করতে দেখবে তাকে কতল (হত্যা) কর এবং যার সাথে ঐ কর্ম করা হয়েছে তাকেও (হত্যা কর)।
সুনানে আত-তিরমিজি, হাদ্দ বা দণ্ডবিধি অধ্যায়, হাদিস নং-১৪৫৬, শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
_________________________
কুরআন ও সহীহ হাদীসের স্পষ্ট দলীলের উপর ভিত্তি করে ইমাম মালিক, ইমাম শাফিঈ, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল ও ইমাম ইসহাক রাহিমাহুমুল্লাহু আজমাইনদের ফাতওয়া হলোঃ
সমকামী পুরুষ কিংবা নারী, সে বিবাহিত হোক কিংবা অবিবাহিত হোক, উভয় অবস্থাতেই তাদের উপর রজম করার শাস্তি প্রযোজ্য্ হবে। (অর্থাত, তাদেরকে অর্ধেক মাটিতে পুঁতে পাথর ছুঁড়ে হত্যা করে ফেলতে হবে)।
সুনানে তিরমিযী, হাদ্দ বা দণ্ডবিধি অধ্যায়, হাদিস নং- ১৪৫৬ এর ফুটনোট।
_________________________
যারা সমকামীদের সমর্থন করবে, তাদের অধিকার দেওয়ার জন্য কাজ করবেঃ
সমকামীতা এতো মারাত্মক ও অভিশপ্ত একটা গুনাহ যে, সাইয়্যিদিনা লুত আলাইহিস সালাম এর স্ত্রী যদিও এই কুকর্মে লিপ্ত ছিলোনা, কিন্তু তিনি লুত আলাইহিস সালাম এর অবাধ্য হয়ে জঘন্য কাজে লিপ্ত লোকগুলোর সাথে ঐ এলাকাতে থেকে যান, এর শাস্তিস্বরূপ সমকামীদের সাথে সাথে তাকেও আল্লাহ তাআলা ধ্বংস দেন। একজন সম্মানিত নবীর স্ত্রী হয়েও তিনি কোনো মুক্তি পান নি। সুতরাং, এথেকে এই কথাই প্রমানিত হয় যেঃ
নিঃসন্দেহে যারা সমকামীদের সমর্থন করবে; প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে, তাদের অধিকারের জন্য কাজ করবে, তাদের সাহায্য সহযোগিতা করবে, তারা সরাসরি ক্বুরআন ও সুন্নাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলো। জেনে শুনে ক্বুরআন ও সুন্নাহকে অস্বীকার করা ও এর বিরোধীতা করা বড় কুফুরী কাজ, যা একজন মানুষকে দ্বীন থেকে বের করে দিয়ে তাকে কাফেরমুর্তাদ বানিয়ে দেয়।
সমকামীতা সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে আপনারা ইমাম আয-যাহাবীর রাহিমাহুল্লাহর কবীরা গুনাহ বইটা ও এই ফাতওয়াটা দেখতে পারেনঃ
http://islamqa.info/en/38622

কাফের-মুশরেকদের স্বভাবঃ তাক্বলীদে আবা

কাফের-মুশরেকদের স্বভাব, #তাক্বলীদে_আবা

যুগে যুগে নবী-রাসুলরা যখন তাদের জাতিকে মূর্তিপূজা, তাগুত ও শিরক পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর দিকে, তাওহীদের দাওয়াত দিতো তখন কাফের-মুশরেকদের হক্ক না মানার প্রধান একটা কারণ হচ্ছে - তাকলীদে আবা। তাকলীদ মানে অন্ধভাবে কোনকিছুর অনুকরণ বা অনুকরণ করা, সেটা সঠিক আর ভুল যাই হোক না কেনো। তাকলীদে আবা অর্থ বাপ-দাদা বা পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ করা। নবী রাসুলদের তাওহীদের দাওয়াতের বিরোধীতা করে তারা বলতো, তাহলে কি আমাদের বাপ-দাদারা এতোদিন ভুল করে এসেছে, যদিও তাদের বাপ-দাদারা সঠিক পথের উপরে ছিলোনা। অথবা, কোন কথা নতুন মনে হলে তারা বলতো, আমাদের আগের ধর্মে এমন কোন কথাতো শুনি নাই!

যাইহোক, এই রকম তাকলীদ বা অন্ধভাবে অনুসরণ করার স্বভাব বর্তমান যুগের মুসলমানদের মাঝেও ঢুকে গেছে। শিরক বেদাতের বিরুদ্ধে তাদেরকে সতর্ক করলে তারা বলে, আমাদের বাপ-দাদারা কি এতোদিন ভুল করেছে নাকি? এতো বড় বুজুর্গ বলেছে ভুল হতেই পারেনা, আমাদের এতো এতো আলেম-বুজুর্গ তারা কি বুঝেনা নাকি?


ক্বুরান-হাদীসের বিপরীতে সারা দুনিয়ার মানুষও যদি বিরোধীতা করে, তাহলেও সারা দুনিয়ার মানুষই ভুল।

“জাহান্নামের কুকুর” খারেজীদের সর্বশেষ কুকীর্তি

জাহান্নামের কুকুর খারেজীদের সর্বশেষ কুকীর্তিঃ (২৭শে জুন, ২০১৫)
ইরাকের খারেজী, যারা নিজেদেরকে দাইয়িশ বা #আইসিস বলে পরিচয় দেয়, রমযান উপলক্ষ্যে তারা আত্মঘাতী বোমা হামলা বাড়িয়ে দিয়েছে। এই খারেজীরা শয়তানগুলো এতোটাই নিকৃষ্ট যে, গতকাল কুয়েতের একটি মসজিদে জুমুয়াহর নামায চলাকালীন সময়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অনেক শিয়াদেরকে নির্মনভাবে হত্যা করেছে। মসজিদে নামায পড়া মানুষদেরকে তো দূরের কথা, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গির্জাতে উপাসনারত খ্রীস্টানদেরকেও হত্যা করা নিষিদ্ধ করেছেন! এছাড়া জুমুয়াহ উপলক্ষ্যে(!) তাদের মতোই আরো কিছু সন্ত্রাসী দল যারা নিজেদেরকে মুসলমান দাবী করে,  একইভাবে কয়েকটি মুসলমান দেশে আক্রমন করে অনেক মানুষ হত্যা করেছে। তারা শান্তিপূর্ণ মুসলমান দেশগুলোকে মুসলমানদের জন্য বসবাসের জন্য কঠিন করে তোলার পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের দাবার গুটি হিসেবে কাজ করছে।
_________________________
শায়খ রামাযান আল-হাজিরি হাফিজাহুল্লাহর একটা কথা খুব মনে পড়ে,
আইসিস হচ্ছে রক্তপিপাসু খুনির দল।
_________________________
খারেজীদের কর্ম-কান্ডঃ একগুচ্ছ ফাসাদ ও ভ্রষ্টতার নাম
১. নিরপরাধ সাধারণ মানুষ, শিশু এবং মহিলাদেরকে হত্যা করা।
২. মিথ্যা।
৩. খেয়ানত করা।
৪. আত্মহত্যা।
৫. মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা।
৬. মসজিদ ও ইবাদতের স্থানকে ধ্বংস করা।
৭. সন্ধি ও চুক্তিতে আবদ্ধদেরকে হত্যা করা।
৮. ফেতনা সৃষ্টি করা।
৯. মতভেদের বীজ বপন করা এবং মতভেদের কারণ সৃষ্টি করা।
১০. ইসলামের সুন্দর ছবিকে কলংকিত করা।
১১. ইসলাম শত্রুদের খুশী করার সুযোগ করে দেওয়া।
১২. ইসলামী রাষ্ট্রকে দুর্বল করা।
১৩. বিদআতীদের দলে যোগ দেওয়া।
১৪. মুসলিম শাসকের বিরোধিতা করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করা।
১৫. আনুগত্যের হাত টেনে নেওয়া।
১৬. মুসলিমদের কাফের মনে করা।
১৭. মৃতদেরকে মুছলা করা। (মৃতের হাত, কান, নাক, গলা কেটে ফেলা)।
১৮. মুসলিমদের যাকাত ও সাদাকা চুরি করা।
১৯. জীবন্ত মানুষকে আগুন দ্বারা শাস্তি দেওয়া।
২০. জ্ঞানীদের বিপক্ষে অবস্থান করে জাহালত তথা অজ্ঞতা প্রচার করা।
২১. পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া।
২২. আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতকে অপবাদ দেওয়া।
২৩. মহিলাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা।
২৪. জালিয়াতি করা।
২৫. প্রতারিত করা।
২৬. মুসলিম দেশে গোপনে অবৈধভাবে প্রবেশ করা।
২৭. হারামাইন শরীফাইন (মক্কা ও মদীনার) দেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলির চরম বিরোধিতা করতঃ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা।
২৮. মুসলিম শত্রুদের মুসলিম দেশগুলিতে যুদ্ধ করার রাস্তা তৈরি করে দেওয়া।
এই রকম প্রত্যেকটা পয়েন্টের গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে, তবে এসবই যে শরিয়াহ বিরোধী তা দলীল-প্রমাণে সাব্যস্ত।
মূলঃ ড. খালেদ বিন যাহভী আয-যুফায়রী।
অনুবাদঃ শায়খ আব্দুর রাকীব মাদানী।