শুক্রবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

কুরবানী বিষয়ক সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো ১

কুরবানী বিষয়ক সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো

১.যিনি কুরবানী দিবেন, কেবল তিনি যিল হজের চাদ উঠার পর হতে কুরবানী সম্পন্ন করা পর্যন্ত নিজের চুল, গোঁফ, নখ কাটবেন না।
মিশকাত, হা/ ১৪৫৯।
পরিবারের সবাইকে চুল, নখ কাটা হতে বিরত থাকতে হবে-- এমন ধারণা ভুল।

২. ছাগল তথা খাসী কুরবানী করা উত্তম।
মিশকাত, হা/ ১৪৬১; সুবুলুস সালাম, ৪/ ১৮৫।

৩. চার ধরণের পশু কুরবানী করা নাজায়েজ।
ক. স্পষ্ট খোঁড়া।
খ. স্পষ্ট কানা।
গ. স্পষ্ট রোগী,জীর্ণ শরীর।
ঘ. অর্ধেক কান কাটা কিংবা ছিদ্র এবং অর্ধেক শিং ভাংগা।
মিশকাত, হা/ ১৪৬৫।

৪. কেনার পরে খুঁত পাওয়া গেলে উক্ত পশু কুরবানী করা বৈধ।

উৎসঃ ইমাম উবাইদুল্লাহ মুবারকপুরী, মিরআতুল মাফাতিহঃ ২/ ৩৬৩।

(চলমান, ইন শা আল্লাহ)

যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের ফযীলত ও করণীয়

যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের ফযীলত ও করণীয়

الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله. أما بعد

আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ যে, তিনি নেক বান্দাদেরকে এমন কিছু মৌসুম দিয়েছেন যেগুলোতে
তারা বেশি বেশি নেকীর কাজ করতে পারে। এই মৌসুমগুলোর অন্যতম হল, যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন। এ দিনগুলোর ফযীলতের ব্যাপারে কুরআন-সুন্নায় অনেক দলীল রয়েছে:

১. আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَالْفَجْرِ وَلَيَالٍ عَشْرٍ
শপথ ফজরের। শপথ দশ রাতের। সূরা ফজর: ১ ও ২।
ইমাম ইবনে কাসীর রাহ. বলেছেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন।
এই মত ব্যক্ত করেন ইবনে আব্বাস, ইবনুয যুবাইর, মুজাহিদ প্রমুখ। সহীহ বুখারী।

২. আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যিলহজ্জের প্রথম দশকের চেয়ে উত্তম এমন কোন দিন নেই, যে দিনগুলোর সৎ আমল আল্লাহ্‌র নিকট অধিক পছন্দনীয়।
সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন: আল্লাহ্‌র পথে জিহাদও নয় হে রাসূলুল্লাহ্‌?
তিনি বললেন, আল্লাহ্‌র পথে জিহাদও নয়। অবশ্য সেই মুজাহিদের কথা ভিন্ন, যে জান-মাল নিয়ে জিহাদে বেরিয়ে পড়ে, কিন্তু আর কোন কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না (অর্থাৎ আল্লাহর পথে শহীদ হয়ে যায়)।
সহীহ বুখারী।

৩. আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَعْلُومَاتٍ
তারা যেন নির্দিষ্ট দিন সমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করে। সূরা হজ্জ: ২৮।
ইবনে আব্বাস রা. বলেছেন, (নির্দিষ্ট দিন সমূহ হল) যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিন।
তাফসীর ইবনে কাসীর।

৪. ইবনে ওমর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এ দশ দিনের তুলনায় অন্য কোন সময় আল্লাহর নিকট এতটা মর্যাদা পূর্ণ নয় বা তাতে আমল করা এতটা পছন্দনীয় নয়। সুতরাং এ দিনগুলোতে তোমরা অধিক পরিমাণ তাহলীল (লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ), তাকবীর (আল্লাহু আকবার) ও তাহমীদ (আল হামদুলিল্লাহ) পাঠ কর।
মুসনাদ আহমদ।

৫. সাঈদ ইবনে জুবাইর (যিনি পূর্বোক্ত ইবনে আব্বাস রা. এর হাদীস বর্ণনাকারী) জিলহজ্জের দশ দিন শুরু হলে ইবাদত-বন্দেগীতে এত বেশী পরিশ্রম করতেন যে, অন্য কারো জন্য এত ইবাদত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যেত।
দারেমী।

৬. ইবনে হাজার রহ. বুখারীর ব্যখ্যার কিতাব 'ফাতহুল বারী'তে বলেছেন, এই দশ দিন বিশেষ বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত হওয়ার কারণ হিসেবে আমার নিকট এটাই প্রতিভাত হচ্ছে যে, এ দিনগুলোতে সালাত, সিয়াম, দান-সদকা, হজ্জ ইত্যাদি মৌলিক ইবাদতগুলোর সমাবেশ ঘটেছে। এ ছাড়া অন্য কখনো এগুলো একসাথে পাওয়া যায় না।

যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের দিনগুলোতে যেসব আমল করা মুস্তাহাবঃ
১. সালাত:
ফরয সালাতগুলো যথাসময়ে সম্পাদন করার পাশাপাশি প্রচুর নফল সালাত আদায় করা। কারণ, সালাতই হল আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়। সাওবান রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তুমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে অধিক পরিমাণ সেজদা কর (নফল সালাত আদায় কর), কারণ যখনই তুমি সেজদা কর বিনিময় আল্লাহ তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করেন এবং গুনাহ মোচন করেন।
সহীহ মুসলিম।
এটি কেবল যিলহজ্জ মাস নয় বরং অন্য সকল সময়ের জন্য প্রযোজ্য।

২. সিয়াম:
রোজা রাখা অন্যতম একটি নেক কাজ। তাই এ দিনগুলোতে নফল রোজা রাখা খুবই ফযীলতের। হুনাইদা বিন খালেদ তার স্ত্রী থেকে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জনৈক স্ত্রী থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ্জ মাসের নয় তারিখ, আশুরার দিন ও প্রত্যেক মাসের তিন দিন রোজা পালন করতেন।
আহমদ, আবু দাউদ ও নাসায়ী।

ইমাম নববী যিলহজ্জ মাসের শেষ দশ দিনে রোযা রাখার ব্যাপারে বলেছেন, "এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ মুস্তাহাব"।

৩. তাকবীর, তাহলীল ও তাহমীদ:
পূর্বে ইবনে ওমর রা. এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তাতে রয়েছে, তোমরা বেশি বেশি তাকবীর (আল্লা-হু আকবার), তাহলীল (লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ), ও তাহমীদ (আল হামদুলিল্লা-হ) পড়। ইমাম বুখারী রহ. বলেছেন, ইবনে ওমর রা. এবং আবু হুরায়রা রা. এ দশ দিন তাকবীর বলতে বলতে বাজারে বের হতেন, আর মানুষরাও তাদের দেখে তাকবীর বলত। তিনি আরও বলেছেন, ইবনে উমর রা, মিনায় তাঁর তাঁবুতে তাকবীর বলতেন, তা শুনে মসজিদের লোকেরা তাকবীর বলত এবং বাজারের লোকেরাও তাকবীর বলত। এক পর্যায়ে পুরো মিনা তাকবীর ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠত।
ইবনে উমর রা. মিনায় অবস্থানের দিনগুলোতে, পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পরে, তাঁবুতে, বিছানায়, বসার স্থানে, চলার পথে সর্বত্র তাকবীর পাঠ করতেন। এ তাকবীরগুলো উচ্চ আওয়াজে পাঠ করা মুস্তাহাব। কারণ, সাহাবী উমর রা., তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা., আবু হুরায়রা রা. তা উচ্চ আওয়াজে পাঠ করতেন। মুসলমানদের উচিত এ সুন্নতটি পুনর্জীবিত করা, যা বর্তমান যুগে প্রায় হারিয়ে গেছে এবং দু:খ জনক হলেও সত্য, সাধারণ মানুষের পাশাপাশি নেককার লোকেরাও এটি প্রায় ভুলতে বসেছে। অথচ আমাদের পূর্বপুরুষগণ ছিলেন এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।

তাকবীর বলার নিয়ম: নিন্মোক্ত যে কোন পদ্ধতিতে তাকবীর পাঠ করা যায়:
ক) আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার কাবীরা।
খ) আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লাইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
গ) আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লাইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।

৪. আরাফার দিন রোজা:
আরাফার দিন রোজা রাখা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত, তিনি আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে বলেছেন, আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, এটি পূর্ববর্তী এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হবে।
সহীহ মুসলিম।
তবে আরাফায় অবস্থানকারী হাজীদের জন্য রোযা রাখা মুস্তাহাব নয়। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরাফায় অবস্থান করেছিলেন রোজা বিহীন অবস্থায়।

৫. কুরবানীর দিন (দশম যিলহজ্জ) এর মর্যাদা:
এই মহান দিনটির মর্যাদার ব্যাপারে অনেক মুসলমানই অসচেতন। কতিপয় বিদ্বান এ মত ব্যক্ত করেছেন যে, সাধারণভাবে সারা বছরের মধ্যে-এমনকি আরাফার দিনের চেয়েও নহর তথা কুরবানীর দিন উত্তম।
ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেছেন, আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম দিন নহরের দিন। এটিই হল, হজ্জে আকবর (বড় হজ্জ) এর দিন। যেমন সুনানে আবু দাউদে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আল্লাহর নিকট সর্বাধিক মহিমান্বিত দিন হল নহর তথা কুরবানীর দিন। অতঃপর কুরবানীর পরের দিন (অর্থাৎ যিলহজ্জের এগারতম দিন যে দিন হাজীগণ কুরবানী করার পর মিনায় অবস্থান করেন)।
অবশ্য কেউ কেউ বলেছেন, নহরের দিনের চেয়ে আরাফার দিন উত্তম। কারণ, সে দিনের সিয়াম দুই বছরের গুনাহের কাফফারা। তাছাড়া আল্লাহ তায়ালা আরাফার দিন যে পরিমাণ লোক জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন, তা অন্য কোন দিন করেন না। আরও এ জন্যও যে, আল্লাহ তায়ালা সে দিন বান্দার নিকটবর্তী হন এবং আরাফায় অবস্থানকারীদের নিয়ে ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করেন। তবে প্রথম বক্তব্যই সঠিক। কারণ, হাদীস তারই প্রমাণ বহন করে। এর বিরোধী কিছু নেই। যাহোক, সর্বোত্তম দিন চাই কুরবানীর দিন হোক অথবা আরাফার দিন হোক যারা হজ্জে গমণ করেছেন বা যারা করেন নি সবার জন্য উচিৎ হল, সে দিনের ফযীলত অর্জনের চেষ্টা করা এবং এই সুযোগকে কাজে লাগানো।

ইবাদতের মৌসুমগুলো আমরা কিভাবে গ্রহণ করব?
১) প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য ইবাদতের মৌসুমগুলোতে খাঁটি ভাবে তওবা করা এবং পাপাচার ও আল্লাহর নাফরমানী থেকে বিরত থাকা। কারণ, পাপাচার মানুষকে আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে শুধু বঞ্চিতই রাখে না বরং আল্লাহ ও তার অন্তরের মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে দেয়।
২) আরও কর্তব্য হল, আল্লাহ তায়ালাকে খুশি করে এমন কাজগুলোকে গনিমত মনে করে সেগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। যে আল্লাহর কথাকে বিশ্বাস করবে আল্লাহ তার ব্যাপারে তাঁর ওয়াদাকে বাস্তবায়ন করবেন। তিনি ওয়াদা করেছেন:
وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا
যারা আমার ব্যাপারে চেষ্টা ও সাধনা করবে আমি অবশ্যই তাকে আমার রাস্তাগুলো দেখাবো।
সূরা আনকাবূত: ৬৯।

প্রিয় মুসলিম ভাই, এই সকল অমূল্য সুযোগগুলো ফুরিয়ে যাওয়ার পূর্বেই তা গ্রহণ করুন। কারণ, সময় পার হয়ে গেলে তখন আফসোস করে লাভ হবে না। মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করি, তিনি যেন আমাকে ও আপনাকে এই কল্যাণের মৌসুমগুলোকে অমূল্য সম্পদ হিসেবে গ্রহণ করার তাওফীক দান করেন এবং তাতে ভালোভাবে তাঁর ইবাদত-বন্দেগী সম্পাদনে সাহায্য করেন।

লেখক: শায়খ আব্দুল মালেক আল-কাসেম
সম্পাদনায়: শায়খ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল জিবরীন
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার

abuafnan12@gmail.com

বৃহস্পতিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

আনোয়ার আল-আওলাকির লেকচার শোনা যাবে?

প্রশ্নঃ আনোয়ার আল-আওলাকির লেকচার শোনা যাবে?

উত্তরঃ সম্পূর্ণ লেখা না পড়ে কমেন্ট করা নিষিদ্ধ।
ইসলাম সম্পর্কে জানার জন্য, কারো কাছ থেকে ইলম নেওয়ার পূর্বে (অর্থাৎ কারো বক্তব্য শোনা বা বই পড়ার) পূর্বে দেখতে হবে সে কোন আলেমের কাছে পড়াশোনা করেছে? তার আকীদা কি আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের আকীদা নাকি সে অন্ধ মাযহাবের বা কোন ভ্রান্ত মতবাদের অনুসারী, সূফীবাদী, তাকফিরী খারেজী, মুহতাজিল্লা আকীদার লোক কিনা? সে কি সত্যিই অন্যকে ইসলাম শেখানোর পূর্বে নিজে ইসলাম শিক্ষা করেছে, নাকি তোতা পাখির মতো মুখস্থ বলে, যেইখান থেকে পারে কপি-পেস্ট করে ফতোয়াবাজি করছে? সমসাময়িক ওলামারা কি তাঁর প্রশংসা করেছেন নাকি তার কাছ থেকে ইলম নেওয়ার ব্যপারে উম্মতকে সতর্ক করেছেন? আপনারা তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ী ও মুহাদ্দিসিনে একরামদের লেখা বইগুলো ও হাদীসের কিতাবগুলো পড়লে দেখতে পারবেন, তারা এই রকম যাচাই-বাছাই করে কারো কাছে থেকে ইলম নেওয়ার ব্যপারে কতটা সতর্ক ছিলেন। এর কারণ হচ্ছে, আপনি একজনের কাছ থেকে ইসলাম শিখছেন তার মানে আপনার ইসলাম ঠিক তার মতই হবে, সে যেইভাবে ইসলামকে আপনার সামনে তুলে ধরবে ইলমের অভাবে আপনি সেটাকেই হক্ক বলে মনে করবেন।

যাইহোক, সাইয়েদ কুতুবের ভক্ত আনোয়ার আল-আওলাকি তার ধর্মগুরুর মতোই তাকফিরী ছিলেন, যে মুসলিম শাসকদেরকে কাফের/মুনাফেক ফতোয়া দিয়ে সাধারণ মানুষকে তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য উস্কানি দিতো। অথচ মুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা খারেজীদের প্রধান একটা বৈশিষ্ট্য।  

কয়েক বছর পূর্বে সে সৌদি আরবসহ আরব বিশ্বের মুসলিম শাসকদেরকে পাইকারী হারে কাফের, মুনাফেক ফতোয়া দিয়ে সেই সমস্ত মুসলিম দেশের বিরুদ্ধে জিহাদের(!) ফতোয়া দিয়েছিলো এবং তার অন্ধ ভক্তদেরকে সেই ভার্চুয়াল জিহাদে শরীক হওয়ার আহবান জানায়।

মুসলিম শাসকদের দোষ-ত্রুটির কারণে তাদেরকে কাফের, মুর্তাদ ফতোয়া দেওয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা খারেজীদের ধর্ম। এই বিষয়টি এতো ধ্বংসাত্মক যে, আপনি প্রত্যেকটা আকিদার কিতাব খুলে দেখুন মুসলিম শাসকদের অন্যায় বা জুলুম-অত্যাচার সত্ত্বেও সৎ কাজে তাদের প্রতি অনুগত থাকা এবং কোন মতেই বিদ্রোহ না করার জন্য বলা হয়েছে।

ইমাম আবু জাফর আহমাদ আত-ত্বাহাওয়ী (রহঃ), তার বিখ্যাত আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকীদার কিতাবে উল্লেখ করেছেনঃ
আমীর ও শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে আমরা জায়েয মনে করি না, যদিও তারা অত্যাচার করে। আমরা তাদের অভিশাপ দিব না এবং আনুগত্য হতে হাত গুটিয়ে নিব না। তাদের আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্যের সাপেক্ষে ফরয, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর অবাধ্যচরণের আদেশ দেয়। আমরা তাদের মঙ্গল ও কল্যাণের জন্য দোআ করব।
আকীদাহ আত-ত্বাহাবীয়া।

যাই হোক, আনোয়ার আল-আওলাকি (USA), জসীম উদ্দিন রাহমানি (BD), আঞ্জেম চৌধুরী (UK) আবু ওয়ালিদ (UK) এইরকম বোকা শ্রেনীর কিছু তরুণ ফতোয়াবাজ লোকেরা ক্বুরানের আয়াত বা হাদীসের মনগড়া ব্যখ্যা দিয়ে উঠতি বয়সী কিছু কিশোর ও যুবকদের অন্তরকে তাকফিরী পয়জন দিয়ে বিষাক্ত করে রেখে গেছে।  

এরা বিভিন্ন অপব্যখ্যা দিয়ে তাদের অন্ধ ভক্তদের ব্রেইন ওয়াশ করে। তার মাঝে একটা হচ্ছে, শাসক যদি শরিয়াহ আইন দিয়ে বিচার না করে তাহলে তারা মুর্তাদ হয়ে যাবে, তাদের বিরুদ্ধে তখন বিদ্রোহ করা ফরযে আইন হয়ে যাবে!

এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত খারেজীদের আকীদা, যা রাসুল সাঃ এর কথার সরাসরি বিরোধীতা করে। এনিয়ে  হুযাইফা বিন ইয়ামান রাঃ এর বিখ্যাত হাদীস দেখুন, এবং সুন্নাহর সাথে খারেজীদের কথাকে মিলিয়ে দেখুন -

হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ) বলেছেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এক সময় আমরা অকল্যাণ ও মন্দের মধ্যে (কুফরীর মধ্যে) ডুবে ছিলাম। অতঃপর আল্লাহ আমাদেরকে কল্যাণের (ঈমানের) মধ্যে নিয়ে এসেছেন। এখন আমরা সেই কল্যাণের মধ্যে বহাল আছি। তবে এই কল্যাণের পরে কি আবার অকল্যাণের যুগ আসবে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। আমি আবার বললাম, সেই অকল্যানের যুগের পর কি পুনরায় কল্যানের যুগ আসবে? তিনি বললেনঃ হাঁ, আসবে। আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, সেই কল্যানের পর কি আবার অকল্যানের যুগ আসবে? তিনি বললেনঃ আসবে। আমি জিজ্ঞেস করলামঃ তা কিভাবে? তিনি বললেনঃ আমার পরে এমন কিছু ইমামের (শাসক) আগমন ঘটবে, তারা আমার প্রদর্শিত পথে চলবে না এবং আমার সুন্নাত (জীবন বিধান) গ্রহন করবে না। (অর্থাৎ তারা নিজেদের খোয়াল-খুশী মত চলার পথ আবিষ্কার করে নেবে)। অচিরেই তাদের মধ্যে এমন কিছু লোক সমাজের নেতৃত্ব নিয়ে দাঁড়াবে যাদের মানব দেহে থাকবে শয়তানের অন্তর
আমি (হুজাইফা রাঃ) জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি সেই যুগে উপনীত হই তাহলে আমি কি করব?
তিনি (সাঃ) বললেনঃ তুমি আমীরের নির্দেশ শোন এবং তার আনুগত্য কর। যদিও সে তোমার পিঠে আঘাত (নির্যাতন) করে এবং তোমার ধন-সম্পদ ছিনিয়ে নেয় তবুও তার কথা শোন এবং তার আনুগত্য কর
সহীহ মুসলিমঃ কিতাবুল ইমারাহ (প্রশাসন ও নেতৃত্ব) অধ্যায়, হাদীস নং- ৪৫৫৪।

এই হাদিসে রাসুল সাঃ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেনঃ
১. মুসলিমদের উপর ভবিষতে কিছু শাসক আসবে যারা ক্বুরান ও সুন্নাহ অনুযায়ী চলবেনা। উল্লেখ্য বর্তমানে বিভিন্ন মুসলিম দেশে এইরকম জালেম শাসক দেখা যাচ্ছে।
২. তাদের কাজকর্ম এতো জঘন্য হবে যে, রাসুল সাঃ তাদেরকে মানুষের ভেতরে শয়তানের অন্তর বলেছেন। আমার মনে হয়না অন্য কোন ভাষায় কোন মানুষকে এর চাইতে খারাপ বলে বর্ণনা করা যেতে পারে।  
৩. সেই সময়ে আমরা কেউ যদি পৌঁছে যাই তাহলে আমরা যেন সেই শাসকের আনুগত্য করি, এমনকি সে যদি আমাদেরকে মারধর করে এবং আমাদের সম্পদ ছিনিয়ে নেয়।

এখন বলতে পারেন বিদ্রোহ না করে কেন রাসুল সাঃ আমাদেরকে শাসকরা জালেম হলেও তবুও তাদের আনুগত্য করতে নির্দেশ দিয়েছেন? এর কারণ হচ্ছে, বিদ্রোহ করলে যেই ক্ষতি হয় তাঁর তুলনায় যুলুম সহ্য করা অনেক কম ক্ষতিকর, যা যুগে যুগে খারেজীদের কার্যকলাপ দ্বারা বারবার প্রমানিত হয়েছে। আপনারা বর্তমান লিবিয়া, তিউনিয়সিয়া, মিশর, সিরিয়া ইত্যাদি দেশে বিদ্রোহের দিকে লক্ষ্য করে দেখুন বিদ্রোহের পূর্বের শাসকদের জুলুম অত্যাচার ও পরে দেশে বিশৃংখলা ও ফেতনা-ফাসাদ দেখলে বুঝতে পারবেন, কেনো বিদ্রোহের ব্যপারে ইসলাম এতো সতর্কতা অবলম্বন করেছে।

যাইহোক, অজ্ঞ মুফতিরা ক্বুরান ও সুন্নাহ আয়ত্ত্ব না করে বড় বড় লেকচার দিতে গিয়ে আবেগের বশে জালেম শাসক বা মুসলিম শাসকদের দোষ-ত্রুটি দেখে তাদেরকে কাফের ফতোয়া দেয় এবং খারেজীদের মতো তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে মানুষকে উস্কানি দেয়। এদেরকে ওলামারা ক্বাদিয়্যা বা সিটিং খারেজী বলেন, এরা নিজেরা কোনদিন জিহাদ করেনা কিন্তু শাসকদের বিরুদ্ধে অজ্ঞ লোকদেরকে জিহাদ করার জন্য উত্তেজিত করে। যেমনটা ফতোয়া দিয়েছিলেন তথাকথিত ইমাম(!) আনোয়ার আওলাকির মতো অন্যান্যরা।

আপনারা লক্ষ্য করে দেখুন অনেক দোষ-ত্রুটি সত্ত্বেও সৌদি আরবে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামি শরিয়াহ চালু আছে, আদালত পরিচালিত হচ্ছে ক্বুরান সুন্নাহ দিয়ে, রাষ্ট্রীয়ভাবে সালাত কায়েম আছে, মানুষকে সৎ কাজে আদেশ ও নিষেধ আজ পর্যন্ত চালু আছে। এমন একটা দেশে দূরের কথা, যেই দেশে শাসক মুসলিম কিন্তু দেশ পরিচালিত হয় মানব রচিত আইন দিয়ে এমন শাসকের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ করা ওলামারা হারাম বলে ফতোয়া দিয়েছেন। ইখোয়ানুল মুসলিমিনের নেতা ডা মুহাম্মদ মুরসি ক্ষমতায় থাকার সময় ক্বুরান সুন্নাহ দিয়ে দেশ পরিচালনা করেন নি, বরং শরিয়াহ নিয়ে বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা বলেছেন যা কুফরের পর্যায়ে পড়ে। তবুও আহলে সুন্নাহর কোন আলেম তাকে কাফের বলেন নি, বরং মুসলিম শাসক হিসেবে তাঁর জন্য দুয়া করেছেন। অনুরূপ বর্তমান তুরস্কের শাসক এরদোগানকেও কোন ওলামা কাফের বলেন না, যদিও তিনি ভ্রান্ত গণতন্ত্র দিয়ে দেশ পরিচালনা করেন। কিন্তু অল্প বয়ষ্ক কিছু যুবক না আছে বিদ্যা, না বুদ্ধি, জসীম উদ্দিন, আওলাকি এমন লোকদের কথা শুনে সমস্ত শাসকদের পাইকারি হারে কাফের ফতোয়া দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়া দিচ্ছে। যদিও তারা নিজেরা এই জিহাদ করেনা (অবশ্য হুটহাট ২-৪টা বোমা ফাটিয়ে নিরিহ মানুষ মারা ছাড়া), কিন্তু অন্যেরা কেনো এই জিহাদকে সমর্থন করছেনা দেখে তাদেরকে গালিগালাজ করছে।


আপনারা এমন বক্তাদের কাছ থেকে সাবধান থাকবেন। আওলাকি, জসীম উদ্দিনের ভক্তদের দিকে লক্ষ্য করুন ওলামাদেরকে কাফের ফতোয়া দিয়ে নোংরা ভাষায় গালাগালি করা হচ্ছে তাদের ধর্ম। অথচ ওলামাদের সাথে শত্রুতা পোষণ করা মুনাফেকীর লক্ষণ। আর যারা তাদেরকে চেনেন তারা সকলেই জানেন, ভাষার দিক থেকে এরা সবচাইতে জঘন্য। এইরকম স্বঘোষিত মুফতি মুহাদ্দিসদের বিভ্রান্তিকর ওয়াজ-লেকচার বাদ দিয়ে আহলে সুন্নাহর আলেমদের থেকে ইসলাম নেবেন, যাতে করে ফেতনা থেকে নিজেকে বাচাতে পারেন।    

বুধবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

আপনারা আলেমদের নামে গীবত করেন কেনো?

প্রশ্নঃ আপনারা আলেমদের নামে গীবত করেন কেনো?

উত্তরঃ দুঃখিত, আপনি যাদেরকে আলেম বলছেন তাদেরকে আমি আলেম বলে গ্রহণ করছিনা। শিরক বেদাত প্রচার করে, ক্বুরান-হাদীসের অপব্যখ্যা করে যারা মানুষকে ইসলাম থেকে বিভ্রান্ত করে, বিনিময়ে নিজের পকেট ভারী করে, জনপ্রিয়তা, ভোট বা নিজের দলের পাল্লা ভারী করতে চায়, এরা কোনদিন আলেম হতে পারেনা। এদের ব্যপারেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেনঃ

(ফিতনার যুগে) কিছু লোক এমন হবে, যারা জাহান্নামের দরজার দিকে মানুষকে দাওয়াত দিবে (অর্থাৎ তাদের দাওয়াত এমন ভ্রষ্টতাপূর্ণ হবে, যা জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে); যারা তাদের ডাকে সাড়া দিবে তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে
সহীহ বুখারীঃ হাদীস নং-৩৩৩৬, ৬৬৭৯।

এইরকম যারা শিরক বেদাত যারা প্রচার করে সাধারণ মানুষের ঈমান নষ্ট করে তাদের সমালোচনা করা জায়েজ, এটা গীবত হবেনা। পথভ্রষ্ট দ্বায়ীদের সমালোচনা করা, গীবত করা শুধু জায়েজই নয়, নেক উদ্দেশ্য নিয়ে করলে তার জন্য সওয়াব আছে। অনেকের কাছে কথাগুলো খারাপ লাগতে পারে, অন্য একজন দ্বায়ীর নামে খারাপ কথা বলছি তাদের জন্য দ্বীনের কিছু উসুল (মূলনীতি, principle) বর্ণনা করছি ওলামারা কুরান ও হাদীসের দলীল থেকে এমন কিছু ক্ষেত্র বের করেছেন যেইসব ক্ষেত্রে গীবত করা জায়েজ

এ সম্পর্কে কুরান ও হাদীসের প্রখ্যাত সংকলন রিয়াদুস সালেহীন এর গ্রন্থকার ইমাম আন-নববী (রহঃ) বলেন - 

"যেসব ক্ষেত্রে গীবত করা বৈধঃ
. অত্যাচারীর অত্যাচার প্রকাশ করার জন্য
. সমাজ থেকে অন্যায় দূর করা এবং পাপীকে সঠিকপথে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সাহায্য করার জন্য
. হাদীছের সনদ যাচাই করা ও ফতওয়া জানার জন্য
. মুসলিমদেরকে মন্দ থেকে সতর্ক করা ও তাদের মঙ্গল কামনার ক্ষেত্রে
. পাপাচার ও বিদআতে লিপ্ত হলে তা প্রকাশ করার ক্ষেত্রে
. প্রসিদ্ধ নাম ধরে পরিচয় দেওয়ার ক্ষেত্রে
ইমাম আন-নববী, রিয়াদুস-সালেহীন, ২৫৬ অনুচ্ছেদ, পৃঃ ৫৭৫

আহলুল হাওয়া ও বিদআতি ব্যক্তি ও দলগুলোর প্রচার করা শিরক, বেদাত ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্যগুলোর সমালোচনা করা এবং এইগুলো থেকে মানুষকে  বর্ণনা করার গুরুত্বঃ

শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, বিদআতি নেতাদের মতোই ক্বুরআন ও হাদীসের বিরোধীতাকারীদের ও ভুল আমলকারীদের অবস্থা (পথভ্রষ্টতা ও ভুলগুলো) মানুষের কাছে তুলে ধরা ও তাদের থেকে উম্মতকে সতর্ক করা সর্বসম্মতক্রমে ওয়াজিব।

ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞাস করা হয়েছিলো, এক ব্যক্তি (নফল) নামায পড়ে, রোয রাখে, ইতেকাফে বসে ইত্যাদি। এই ব্যক্তির আমলগুলো আপনার কাছে বেশি প্রিয় নাকি এটা আপনার কাছে বেশি প্রিয় যে, সে ব্যক্তি বিদআতিদের সম্পর্কে কথা বলবে ও তাদের ব্যপারে মানুষকে সতর্ক করবে? উত্তরে ইমাম আহমাদ রহিমাহুল্লাহকে বলেছিলেন, যদি সে নামায, রোযা, ইতেকাফ ইত্যাদি ইবাদত-বন্দেগী করে তবে সেটা শুধুমাত্র তার একার জন্যই কল্যানকর হবে। কিন্তু সে যদি বিদআতির বিরুদ্ধে কথা বলে তাহলে সেটা সমস্ত মুসলমানদের জন্য কল্যানকর হবে। সুতরাং, এটাই তার জন্য উত্তম।

মাজমাউল ফাতওয়াঃ ২৮/২২১।   

মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

একটি দুয়া ও একটি সুন্নাহ...


একটি দুয়া ও একটি সুন্নাহ...

আমরা সবাই দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত। আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন আমাদের বেশিরভাগ দুয়াই ঘুরেফিরে দুনিয়া কেন্দ্রিক। দুনিয়াবি কোনকিছু চাওয়া নিষেধ বা অপছন্দের কিছু না, বরং দুনিয়া আখেরাতের ছোট-বড় প্রতিটা বিষয়ের জন্যই আল্লাহর কাছে দুয়া করলে আল্লাহ খুশি হন। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, আল্লাহ যেই ঈমানদারদের প্রশংসা করেছেন, তারা শুধু দুনিয়ার জন্যই দুয়া করতোনা তাদের দুয়া হচ্ছে রাব্বানা আ-তিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও-ওয়াফিল আ-খিরাতি হাসানাতাও ওয়া-ক্বিনা আযাবান্নার অর্থাৎ, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে দুনিয়ার জীবনে কল্যাণ দাও এবং পরকালে জীবনেও কল্যাণ দান করো। আর আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচাও। (সুরা বাক্বারাহ)।

অর্থাৎ, তারা দুনিয়ার জন্য দুয়া করতো কিন্তু সাথে সাথে পরকালের কল্যানের জন্যও দুয়া করতো।  তবে পরকালের জন্য দুনিয়াবী কল্যানের চাইতে দুই গুণ বেশি দুয়া করে, কারণ দুনিয়ার জীবন পরকালের তুলনায় অতি নগণ্য।

যাই হোক, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্দর এই দুয়াটা মুখস্থ করে আপনারা সহজেই নামাযে বা নামাযের বাইরে দুনিয়া ও আখেরাতের উভয় জাহানের কল্যানের জন্য দুয়া করতে পারবেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দুয়া করতেন, 

اللهم أصلح لي ديني الذي هو عصمة أمري، وأصلح لي دنياي التي فيها معاشي، وأصلح لي آخرتي التي فيها معادي، واجعل الحياة زيادة لي في كل خير، واجعل الموت راحة لي من كل شر‏

উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা আসলিহ-লি দ্বিনিয়াল্লাযি হুয়া ইসমাতু আমরি, ওয়া আসলিহ-লি দুনিয়া-য়্যাল্লাতি ফীহা মাআ-শী, ওয়া আসলিহ-লি আ-খিরাতায়াল্লাতী ফীহা মাআ-দী। ওয়াজ আলিল হায়া-তা যিয়া-দাতাল লী ফি কুল্লি খাইরি ওয়াজ আলিল মাউতা রা-হাতাল লী মিন কুল্লি শাররি।

অর্থঃ হে আল্লাহ্! তুমি আমার দ্বীনকে আমার জন্য সঠিক করে দাও, যা আমার সকল বিষয়ের প্রতিরক্ষা। তুমি আমার দুনিয়াকে আমার জন্য সংশোধন করে দাও, যার মধ্যে রয়েছে আমার জীবন-জীবিকা। তুমি আমার আখেরাতকে আমার জন্য সুন্দর করে দাও, যেখানে আমাকে ফিরে যেতে হবে। তুমি আমার প্রত্যেক পুণ্য কাজে আমার জীবনকে বৃদ্ধি করে দাও এবং প্রত্যেক মন্দ কাজ হতে মৃত্যুকে আমার জন্য শান্তির কারণে পরিণত কর।"
রিয়াদুস সালেহীনঃ ১৪৭২, সহীহ মুসলিমঃ ২৭২০।

বাজারে প্রবেশের সুন্নাহঃ
বাজারে প্রবেশের সময় এই দুয়া পড়বেন,

لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ، وَلَهُ الْحَمْدُ، يُحْيِي وَيُمِيتُ، وَهُوَ حَيٌّ لاِ يَمُوتُ، بِيَدِهِ الْخَيْرُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

উচ্চারণঃ লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ্দাহু লা শারীকালাহু, লাহুল-মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ইয়ুহঈ ওয়াইয়ুমীতু, ওয়াহুয়া হায়্যুন লা ইয়ামূতু, বিয়াদিহিল খাইরু ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাইইন ক্বাদীর।
অর্থঃ একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই, তাঁর কোনো শরিক নেই, রাজত্ব তাঁরই, প্রশংসা মাত্রই তাঁর। তিনিই জীবন দান করেন এবং তিনিই মৃত্যু দান করেন। আর তিনি চিরঞ্জীব, কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না। সকল প্রকার কল্যাণ তাঁর হাতে নিহিত। তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।

এর ফযীলত হচ্ছে,
যে ব্যক্তি বাজারে প্রবেশের সময় এই দুয়া পড়বে তার আমলনামায়
-              ১০০০ নেকী লিখে দেওয়া হবে
-              ১০০০ গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে
-              ১০০০ মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেয়া হবে
তিরমিযীঃ ৩৪২৮, ইবন মাজাহঃ ৩৮৬০; হাকেম ১/৫৩৮।
শাইখ আলবানী হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন।

বাজার সম্পর্কে সতর্কতাঃ

আল্লাহর কাছে সবচাইতে পছন্দের জায়গা হচ্ছে মসজিদ, আর সবচাইতে নিকৃষ্ট জায়গা হচ্ছে বাজার। কারণ মসজিদে সবচাইতে বেশি আল্লাহকে স্বরণ করা হয় আর বাজার হচ্ছে পাপের সেন্টার, যেখানে শয়তান মানুষকে সবচাইতে বেশি পথভ্রষ্ট করে। কত মানুষ ফালতু আড্ডা, মদ, জুয়ার আসর বসায়, দোকানদার ও ক্রেতারা জেতার জন্য মিথ্যা বলার প্রতিযোগিতা শুরু করেন। চরিত্রহীন বখাটে ছেলেরা বড় বড় মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, অর্ধনগ্ন মেয়েদেরকে লাইভ দেখার জন্য, নারীদেরকে উত্যক্ত করার জন্য। বেদ্বীন, বেপর্দা মেয়েরা মার্কেটে ঘুরে বেড়ায় তাবাররুজ করে পুরুষদেরকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য, যিনাকারী নারী-পুরুষ, প্রেমিক-প্রেমিকাদের দেখা করার পছন্দের জায়গা এই বাজার। তাই দ্বীনদার ভাই ও বোনদের উচিত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এই সমস্ত জায়গায় না যাওয়া। যদি যেতেই হয় পুরুষেরা দৃষ্টি ও কানের হেফাজত করবেন, নারীরা পূর্ণাংগ হিজাব-পর্দা করে যাবেন। আর যত দ্রুত সম্ভব এই সমস্ত পাপের জায়গা ত্যাগ করার চেষ্টা করবেন।

ট্যাক্স নেওয়া কি জায়েজ? সরকারী রাজস্ব বা ট্যাক্স বিভাগে চাকরী করা যাবে?

প্রশ্নঃ ট্যাক্স নেওয়া কি জায়েজ? সরকারী রাজস্ব বা ট্যাক্স বিভাগে চাকরী করা যাবে?

উত্তরঃ মুসলমানদের জন্য আল্লাহ দিয়েছেন বাধ্যতামূলক যাকাত, আর ঐচ্ছিক হিসেবে দান-সাদাকাহ। এর বাইরে সরকারে পক্ষ থেকে ট্যাক্স নেওয়া সম্পূর্ণ হারাম। এটা অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ আত্মসাতের মাঝে পড়ে, যা মারাত্মক একটা জুলুম। ক্ষমতায় বসে মানুষের উপর ট্যাক্স আরোপ করা একটা কবীরা গুনাহ, এমনকি সহীহ হাদীসে এমনও বর্ণনাও পাওয়া যে, ট্যাক্স আরোপ করা জিনা থেকেও বড় গুনাহ (নাউযুবিল্লাহ)!

যে মানুষের কাছ থেকে ট্যাক্স (শুল্ক) সংগ্রহ করবে তার সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ
যে মানুষের কাছ থেকে ট্যাক্স সংগ্রহ করে সে জান্নাতে প্রবেশ করবেনা।
আহমাদ, আবু-দাউদ, আল-হাকিম।
যে মানুষের কাছ থেকে ট্যাক্স সংগ্রহ করে সে জাহান্নামী।
মুসনাদে আহমাদ।

তবে জরুরী প্রয়োজনে (যেমন দুর্ভিক্ষ, মহামারী) ধনীদের কাছে থেকে সাময়িকভাবে যাকাতের অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া যাবে, শর্ত হলো কারো প্রতি জুলুম করা যাবেনা এবং সম্পদ ন্যায্যভাবে বন্টন করতে হবে।

অনেকে প্রশ্ন করেন, ট্যাক্স না দিলে সরকার কিভাবে চলবে? এর উত্তর হচ্ছে কে কিভাবে চলবে সেটা নির্ধারণ করে দিয়েছেন আল্লাহ তাআলা, তাই সেটা নিয়ে আপনার আমার চিন্তা না করলেও হবে বান্দা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে - আল্লাহর আইন-কানুন জানা এবং বিনা প্রশ্ন বা আপত্তিতে মেনে নেওয়া ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারের আয়ের উতস হচ্ছে মুসলিমদের কাছ থেকে যাকাত, দান-সাদাকাহ, লিল্লাহ, ওয়াকফ, ফি সাবিলিল্লাহ বা যুদ্ধে প্রাপ্ত গনীমতের সম্পদ, দেশে বসবাসরত কিংবা নিরাপত্তার চুক্তিতে আবদ্ধ অমুসলিমদের কাছ থেকে প্রাপ্ত জিযিয়া ইত্যাদি এর বাইরে অনেক নামধারী মুসলিম দেশের সরকার অন্যায়ভাবে ১০%-২০% ট্যাক্স চাপিয়ে দিচ্ছে সাধারণ মানুষের উপরে যেখানে ধনী-গরীব কোন পার্থক্য করা হচ্ছেনা সেই তুলনায় চিন্তা করে দেখুন যাকাত হচ্ছে মাত্র .%, যা নেওয়া হয় শুধুমাত্র ধনীদের কাছ থেকে, আর বন্টন করা হয় গরীবদের মাঝে কিন্তু আল্লাহর আইন অস্বীকার কিংবা অমান্যকারী সরকারেরা নিজেদের বাপ মায়ের হারাম নাজায়েজ ছবি-মূর্তি বানানোর জন্য, শিরকী শহীদ মিনার দিয়ে জনগণকে শিরকি কাজ করানোর জন্য, বাপ ভাইয়ের নামে মাযার কমপ্লেক্স বানানোর জন্য, সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের নামে পতিতা, চরিত্রহীন, নষ্ট নারী-পুরুষ ও নাস্তিকদের  পোষার জন্য জনগণের কাছ থেকে তাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে ছিনিয়ে নিচ্ছে! এই সমস্ত হারাম ট্যাক্স সংগ্রহকারী লোকেরা জিনা থেকেও বড় পাপে লিপ্ত তার হাদীস দেখুনঃ

গামেদী গোত্রের এক মহিলা (রাসুল সাঃ এর নিকট) আগমন করলো এবং বলল, হে আল্লার রাসুল! আমি ব্যভিচার করেছি সুতরাং আপনি আমাকে (রজমের শাস্তি দিয়ে জিনার পাপ থেকে) পবিত্র করুন তখন তিনি তাঁকে ফিরিয়ে দিলেন পরবর্তী দিন আবার মহিলা আগমন করলো এবং বলল, হে আল্লাহর রাসূল  (সাঃ)!. আপনি কেন আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন? আপনি কি আমাকে ঐভাবে ফিরিয়ে দিতে চান, যেমন ভাবে আপনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন মায়াযকে? আল্লাহর কসম করে বলছি, নিশ্চয়ই আমি গর্ভবতী তখন তিনি বললেনঃ তুমি যদি ফিরে যেতে না চাও, তবে আপাততঃ এখনকার মত চলে যাও এবং প্রসবকাল সময় পর্যন্ত অপেক্ষা কর রাবী বলেনঃ এরপর যখন সে সন্তান প্রসব করল তখন তিনি সন্তানকে এক টূকরা কাপড়ের মধ্যে নিয়ে তাঁর কাছে আগমন করলেন এবং বললেনঃ এই সন্তান আমি প্রসব করেছি তখন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেনঃ যাও তাকে (সন্তানকে) দুধ পান করাও গিয়ে দুধপান করানোর সময় উত্তীর্ণ হলে পরে এসো এরপর যখন তার দুধপান করানোর সময় শেষ হল তখন মহিলা শিশু সন্তানটিকে নিয়ে তার কাছে আগমন করলো এমন অবস্হায় যে, শিশুটির হাতে এক টূকরা রুটি ছিল এরপর বললো, হে আল্লাহর নবী! এইতো সেই শিশু যাকে আমি দুধপান করানোর কাজ শেষ করেছি সে এখন খাদ্য খায় তখন শিশু সন্তানটিকে তিনি কোন একজন মুসলমানকে প্রদান করলেন এরপর তার প্রতি (ব্যভিচারের শাস্তি) প্রদানের নির্দেশ দিলেন মহিলার বুক পর্যন্ত গর্ত খনন করানো হল এরপর জনগণকে (তার প্রতি পাথর নিক্ষেপের) নির্দেশ দিলেন তারা তখন তাকে পাথর মারতে শুরু করল খালিদ ইবন ওয়ালীদ (রাঃ) একটি পাথর নিয়ে অগ্রসর হলেন এবং মহিলার মাথায় নিক্ষেপ করলেন, তাতে রক্ত ছিটকে খালিদ (রাঃ) এর মুখমণ্ডলে এসে পড়লো তখন তিনি (খালিদ রাঃ বিরক্ত হয়ে) মহিলাকে গালি দিলেন নবী (সাঃ) সেই গালি শুনতে পেলেন তিনি সাঃ বললেনঃ হে খালিদ সাবধান! সেই মহান আল্লাহর মসম, যার হাতে আমার জীবন, জেনে রেখো! নিশ্চয়ই সে এমন তাওবা করেছে, যদি কোন অন্যায় ট্যাক্স আরোপকারী ব্যক্তিও এমন তাওবা করতো, তবে তারও ক্ষমা হয়ে যেতো এরপর তার জানাযার সালাত আদায়ের নির্দেশ দিলেন তিনি সাঃ তার জানাযায় সালাত আদায় করলেন এরপর তাকে দাফন করা হলো
সহিহ মুসলিমঃ অপরাধের (নির্ধারিত) শাস্তি অধ্যায়ঃ ৪২০৬

বিস্তারিত জানতে দেখুন

যেহেতু ট্যাক্স নেওয়া হারাম সুতরাং এই হারাম কাজে সাহায্য করাও হারাম। ক্বুরানের এই আয়াত দ্বারা আল্লাহ হারাম কাজে সাহায্য-সহযোগিতা করা হারাম করে দিয়েছেন।
সৎকর্ম ও তাক্বওয়ায় তোমরা একজন আরেকজনকে সাহায্য কর, কিন্তু পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সাহায্য করো না। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কঠোর শাস্তিদাতা।

সুরা আল-মায়েদাহঃ ২।